৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

নীরব ঘাতক ‘ট্রাইগ্লিসারাইড’! হার্ট অ্যাটাক থেকে প্যানক্রিয়াটাইটিস, সতর্ক না হলে বিপদ

রক্তে চুপিসারে বাড়ছে এক বিপজ্জনক উপাদান—ট্রাইগ্লিসারাইড। বাইরে থেকে তেমন লক্ষণ না থাকলেও শরীরের ভিতরে তৈরি করছে মারাত্মক ঝুঁকি। নিয়ন্ত্রণে না রাখলে এই স্নেহ পদার্থই ডেকে আনতে পারে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এমনকি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিল রোগ।

ট্রাইগ্লিসারাইড কী?
ট্রাইগ্লিসারাইড হল এক ধরনের ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ, যা আমরা খাবারের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করি, তা থেকে যকৃত তৈরি করে। পরে তা শরীরের ফ্যাট কোষে জমা থাকে এবং প্রয়োজনে শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখা ও হরমোনের কাজে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কোথা থেকে বাড়ছে ঝুঁকি?
পরিশোধিত চাল, গম, অতিরিক্ত ঘি-মাখন, তেলেভাজা খাবার এবং মদ্যপানের অভ্যাস ট্রাইগ্লিসারাইড দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। আধুনিক জীবনযাত্রার অনিয়ম—কম শারীরিক পরিশ্রম, বেশি জাঙ্ক ফুড—এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

কতটা হলে বিপজ্জনক?
রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের স্বাভাবিক মাত্রা ১৫০ mg/dl-এর নিচে। কিন্তু তা যদি ২০০-৩০০ mg/dl বা তার বেশি হয়, তখনই তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

কী কী সমস্যা হতে পারে?
উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইডের কারণে—হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে ৷ স্ট্রোকের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়৷ এছাড়াও অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (প্যানক্রিয়াটাইটিস) হতে পারে৷

উপসর্গ কী?
প্রথম দিকে তেমন স্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও—পেট ব্যথা বা অল্পে পেট ভরে যাওয়া, বুকে চাপ লাগা, হঠাৎ ডায়াবেটিস ধরা পড়া, থাইরয়েডের সমস্যা৷ এসবই হতে পারে সতর্কবার্তা।

কী করবেন না?
অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, তেলেভাজা, পরিশোধিত শস্য এবং মদ্যপান যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।

কী করবেন?
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ খেতে হবে৷ সবুজ শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, বাদাম রাখুন খাদ্যতালিকায়৷ নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম অত্যন্ত জরুরি৷ রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার উপকারী ৷
এছাড়া নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও সচেতন জীবনযাত্রাই পারে এই ‘নীরব ঘাতক’-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এখন থেকেই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে বড় বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।

ভোট মিটতেই ‘পাওয়ার প্লে’ আকাশের! রাজনীতিকে টেক্কা দিয়ে বাংলায় কালবৈশাখীর দাপট

কলকাতা: ভোটের ময়দান এখনও গরম। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে— তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক উত্তাপকে যেন এক লহমায় ঠান্ডা করে দিল আকাশের মেজাজ! দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হতেই বাংলার শিরোনামে এখন একটাই নাম, আবহাওয়া।

বুধবার ভোটপর্ব মিটতেই রাজ্যের আকাশে নাটকীয় পালাবদল। তপ্ত গরমের দাপটকে সরিয়ে মঞ্চ দখল করেছে কালবৈশাখী। ঝড়, বৃষ্টি আর বিদ্যুতের ঝলকে একেবারে অন্য রূপ নিয়েছে বাংলা। যেন প্রকৃতি নিজেই ঘোষণা করেছে, “জেতা-হারা পরে, খেলা এখন আমার!”

হাওয়া অফিসের পূর্বাভাসও সেই ছবিকেই আরও স্পষ্ট করছে। আপাতত গরমের তীব্রতা অনেকটাই কমেছে। তার বদলে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে শুরু হয়েছে ঝড়-বৃষ্টির দাপট। বৃহস্পতিবার থেকেই একাধিক জেলায় বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়ার পূর্বাভাস। বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে, সঙ্গে বজ্রবিদ্যুতের ঝলকানি।

এছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান— এই বিস্তীর্ণ এলাকাতেও ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না আবহাওয়াবিদরা। ফলে ভোট-পরবর্তী আলোচনা চললেও, সাধারণ মানুষের নজর এখন আকাশের দিকেই।

শুক্রবার থেকে রবিবার— টানা তিন দিন পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হতে পারে। নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুরে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। দমকা হাওয়ার গতি থাকতে পারে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। ফলে বাইরে বেরোলে ছাতা সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

উত্তরবঙ্গের ছবিটা আরও তীব্র। আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। কোথাও কোথাও ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে বলে অনুমান। দার্জিলিং, কালিম্পং ও কোচবিহারেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

শুক্র ও শনিবারেও একই চিত্র বজায় থাকতে পারে বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া দফতর। রবিবারেও পুরোপুরি স্বস্তি মিলবে না— বিক্ষিপ্ত ঝড়-বৃষ্টি চলার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিকেলের আকাশও যেন ভোটের আবহকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে— কখনও গম্ভীর মেঘলা, কখনও খানিকটা পরিষ্কার। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, এই বৃষ্টির দৌলতে গরমের হাত থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছে মানুষ। যদিও বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

রাজনীতির ময়দানে লড়াই চলছেই। কিন্তু আপাতত বাংলার ‘হাই ভোল্টেজ ম্যাচ’-এর আসল নিয়ন্ত্রক যেন প্রকৃতিই। ভোটের ফলাফল যাই হোক, এই মুহূর্তে বাংলার আকাশেই চলছে টানটান লড়াই— যেখানে প্রতিপক্ষ একটাই, আর সে হল প্রকৃতি!

সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় ভারতের বড় পতন: পাকিস্তানের থেকেও থেকেও নিচে নামল র‍্যাঙ্কিং!

বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্রমাবনতি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর বাড়তে থাকা আইনি চাপের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এল ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’ বা বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে। আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ‘রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্স’ (আরএসএফ) বৃহস্পতিবার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান আরও নিচে নেমে ১৫৭তম স্থানে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ভারত ছিল ১৫১তম অবস্থানে।

আরএসএফ-এর প্রতিবেদনে ভারতকে রাখা হয়েছে ‘অত্যন্ত আশঙ্কাজনক’ বা ‘ভেরি সিরিয়াস’ শ্রেণিতে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও সংবাদমাধ্যমকে স্তব্ধ করে দিতে আইনি কাঠামোকে ক্রমবর্ধমানভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর বিচারবিভাগীয় হয়রানি তীব্রতর হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানহানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো ফৌজদারি আইনগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ সালে যখন এই সূচক প্রথম শুরু হয়, তখন মাত্র ১৩.৭ শতাংশ দেশ এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ এখন ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত আশঙ্কাজনক’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। ১৮০টি দেশের গড় স্কোর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সংস্থাটির মতে, জাতীয় নিরাপত্তা নীতির দোহাই দিয়ে এমন সব বিধিনিষেধমূলক আইন তৈরি করা হচ্ছে যা মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। বিশেষ করে আইনি সূচকের পতন বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এক বিপজ্জনক প্রবণতাকে ইঙ্গিত করে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ভারতের অবস্থান বেশ হতাশাজনক। তালিকায় নেপাল (৮৭), মালদ্বীপ (১০৮), শ্রীলঙ্কা (১৩৪), ভুটান (১৫০), বাংলাদেশ (১৫২) এবং পাকিস্তান (১৫৩) ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ভারতের চেয়ে নিচে রয়েছে কেবল মিয়ানমার (১৬৬), আফগানিস্তান (১৭৫) এবং চীন (১৭৮)।

এই সূচকের শীর্ষ তিনটি স্থানে রয়েছে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস এবং এস্তোনিয়া। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাত ধাপ পিছিয়ে ৬৪তম স্থানে নেমে এসেছে। সামগ্রিকভাবে, ভারতসহ বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিবেশ গত এক বছরে আরও খারাপ হয়েছে বলে আরএসএফ সতর্ক করেছে।

ডলারের দাপটে দিশেহারা টাকা: ভারতীয় মুদ্রার ঐতিহাসিক পতন ও এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের অশনিসংকেত

ভারত-ইরান সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের পকেটে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় টাকার রেকর্ড পতন আমাদের অর্থনীতির এক কঙ্কালসার চেহারা সামনে এনে দিয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার দাম ৯১.০১ থেকে কমে ৯৪.৮৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এটি কেবল তেলের দাম বাড়ার ফল, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক গভীরতর সংকট।

ভারত তার প্রয়োজনের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস আমদানি করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের কারণে সেই পথ রুদ্ধ হওয়ায় জোগান কমেছে এবং আমদানির খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে মুদ্রার এই পতনের পেছনে কেবল বাণিজ্যের ঘাটতি নয়, কাজ করছে বিশ্ববাজারের ফাটকাবাজদের ‘মানসিকতা’। অদ্ভুত বিষয় হল, আমেরিকার আগ্রাসনে যুদ্ধ শুরু হলেও বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তার খোঁজে সেই ডলারের দিকেই ছুটছেন। ফলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো দুই দিক দিয়ে মার খাচ্ছে—একদিকে ডলারের নিরিখে তেলের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমায় সেই তেল কিনতে আরও বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এই ‘ইনফ্লেশন মাল্টিপ্লায়ার’ বা মুদ্রাস্ফীতির গুণিতক প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়ছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর, কারণ আমদানি করা পণ্যের বাড়তি দাম শেষমেশ ক্রেতাকেই মেটাতে হয়।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেও টাকার এই পতন রুখতে পারছে না। আমাদের হাতে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার থাকলেও তা কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। কারণ, যখন ফটকা কারবারিরা টাকা তুলে নিতে শুরু করে, তখন রিজার্ভ খরচ করলে তাদের মনে আরও ভয় দানা বাঁধে যে মুদ্রার মান আরও পড়বে। এর ওপর রয়েছে ‘চড়া সুদে ধার করে সস্তায় ঋণ দেওয়ার’ মতো নীতি। আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ৭-৮ শতাংশ রিটার্ন দিচ্ছি, অথচ সেই টাকা রিজার্ভে রেখে আয় করছি মাত্র ১.৫ শতাংশ।

এই নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো ভারতকে আজ আন্তর্জাতিক পুঁজিপতিদের মর্জির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বিশ্ববাণিজ্যকে ওলটপালট করে দিচ্ছে, তখন ভারতের উচিত ছিল ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য করা। কিন্তু মোদী সরকার সেই পথে না হেঁটে একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করে চলেছে, যা কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে উল্টো আমাদের অর্থনীতিকে বিদেশি লগ্নিকারীদের গোলামে পরিণত করছে। টাকার এই ঐতিহাসিক পতন আসলে একটি ভুল অর্থনৈতিক দর্শনেরই খতিয়ান।

শেষ বাঁশি বাজেনি! সংখ্যার খেলায় টানটান লড়াই, কার হাতে যাবে বাংলা?

কলকাতা: ভোটগ্রহণ পর্ব মিটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপ একটুও কমেনি। বরং এখন আরও তীব্র হয়েছে ‘সংখ্যার খেলা’ ঘিরে জল্পনা। সমীক্ষার অঙ্ক সামনে আসতেই পরিষ্কার—এবারের লড়াই একেবারেই একপেশে নয়। কোথাও তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে, কোথাও বিজেপির শক্তিশালী উত্থান—সব মিলিয়ে বাংলা দাঁড়িয়ে অনিশ্চয়তার দোরগোড়ায়।

বিভিন্ন এক্সিট পোল বা ভোট-পরবর্তী সমীক্ষা বলছে, স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও পক্ষের ঝুলিতে যাবে কি না, তা এখনও ধোঁয়াশায়। একাধিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আসন সংখ্যার ব্যবধান খুবই কম। ফলে ‘হাড্ডাহাড্ডি’ শব্দটাই এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অনেকেই মনে করছেন, শেষ মুহূর্তের ভোট-সুইংই নির্ধারণ করবে ক্ষমতার সমীকরণ।

কী সমীকরণ

এই অনিশ্চয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে শহর ও গ্রামের ভিন্ন ভোট-প্রবণতা। কলকাতা ও আশপাশের শহুরে এলাকায় তৃণমূলের সংগঠন এখনও মজবুত বলেই ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় বিজেপি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এবং আক্রমণাত্মক লড়াই দিয়েছে। ফলে গোটা রাজ্যের চিত্র একরকম নয়—বরং খণ্ডচিত্রের যোগফলই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফল।

এবারের নির্বাচনে ইস্যুও ছিল একাধিক। একদিকে রাজ্যের উন্নয়ন, সামাজিক প্রকল্প এবং কল্যাণমূলক স্কিমকে সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছে তৃণমূল। অন্যদিকে দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলে আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। এই দ্বিমুখী প্রচারের মাঝে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকেছেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ভোটের হার বৃদ্ধি এবারের সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। বেশি সংখ্যক ভোটার বুথমুখী হওয়ায় ‘নীরব ভোটার’-দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁদের রায়ই শেষ পর্যন্ত ফলাফলকে চমকে দিতে পারে বলেও মত অনেকের।

বিভিন্ন সংস্থার করা এক্সিট পোল। ফাইল ছবি।

তুঙ্গে বিশ্বাস

এই আবহে শুরু হয়েছে দাবির লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসী সুরে জানাচ্ছে, উন্নয়ন ও জনমুখী প্রকল্পের উপর ভর করেই তারা ফের ক্ষমতায় ফিরবে। তাদের দাবি, “বাংলার মানুষ স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নকেই বেছে নিয়েছে।”
অন্যদিকে বিজেপিও কোনও অংশে পিছিয়ে নেই আত্মবিশ্বাসে। গেরুয়া শিবিরের নেতাদের বক্তব্য, “পরিবর্তনের হাওয়া বইছে রাজ্যে, এবারের ভোট সেই পরিবর্তনকেই সিলমোহর দেবে।” তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের শাসনে ক্লান্ত মানুষ নতুন বিকল্পের দিকেই ঝুঁকেছেন।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—বাংলার মসনদে কে বসবে? একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, না কি জোট বা ঝুলন্ত বিধানসভা—সব সম্ভাবনাই এখন খোলা।

তবে সমীক্ষা যাই বলুক, চূড়ান্ত কথা বলবে গণনার দিনই। তার আগে পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা যে কমার নয়, তা স্পষ্ট।

এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল ও বিজেপি—দু’পক্ষই একবাক্যে দাবি করছে, সরকার গড়বে তারাই।

অসমাপ্ত আলো, আর একটা সময়ের গল্প: স্মরণে কুণাল মিত্র

আজ জন্মদিন

৯০-এর দশক। মধ্যবিত্তের ঘরে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। পাড়ার ভেতর থেকে ভেসে আসছে – প্রেশার কুকারের শিস, রান্নাঘরে মশলার ফোড়ন, আর দূরে কোথাও টেলিভিশনের আওয়াজ। বসার ঘরে খবরের কাগজের কভারে ঢাকা কাঠের টেবিল আর তার ওপর রাখা সাদা-কালো টিভি।  স্ক্রিন নয়েজ, ফ্লিকার – অতঃপর অ্যান্টেনা ঠিক করতে ছাদে দৌড়। নীচে বসে থাকা একটা পরিবার, একসঙ্গে গল্প দেখার অপেক্ষায়। আর সেই সমস্ত গল্পের ভিতরে অদৃশ্যভাবে ঢুকে পড়তেন – কুণাল মিত্র। দূরদর্শন, কেবল চ্যানেল, টেলিফিল্ম পেরিয়ে ছায়াছবির মধ্যে দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন – একান্ত আপনজন! 

পর্দায় এক আপন মানুষ

৩০শে এপ্রিল, ১৯৬৫ সাল, কলকাতায় জন্ম বাসব মিত্র-এর। পরবর্তীকালে যিনি DD Bangla-য় সম্প্রচারিত ‘এবার জমবে মজা’ ধারাবাহিকের মধ্যে দিয়ে ‘কুণাল মিত্র’ নামে ঢুকে পড়লেন গৃহস্থের অন্দরমহলে। কুণাল’কে আলাদা করে ‘নায়ক’ বলা কঠিন। না, তিনি আলোয় মোড়া কোনো তারকা নন। বরং সেই মানুষ, যাকে দেখে মনে হতো – “এ তো আমাদেরই নিজের কেউ”! কখনো বাড়ির বড় ছেলে, অথবা এক দায়িত্ববান স্বামী, কখনও বা দ্বিধাগ্রস্ত একাকী মানুষ – বাংলা টেলিভিশনের একাধিক ধারাবাহিকে এমনই ছিলো তাঁর উপস্থিতি। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো যেন মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবন জুড়ে খেলা করে –’ছোট দুঃখ, ছোট সুখ, ছোট ছোট হাসিমুখ’!

গল্পের ভেতর বেঁচে থাকা

সেই সময়ে ধারাবাহিকগুলো সেই অর্থে ‘ডেইলি সোপ’ হয়ে ওঠেনি। সাংসারিক কুটকচালি, মুহূর্তে মুহূর্তে আলোর ঝলকানি কিংবা সাউন্ড এফেক্টের তীব্র ব্যবহার ছাড়াই গল্প এগোত ধীর গতিতে। সময় নিয়ে গড়ে উঠতো চরিত্রগুলো। কুণাল ছিলেন ঠিক সেই ছন্দেরই অভিনেতা। মঞ্চের দক্ষ অভিনেতা কুণাল চোখ ও শরীরী ভাষায় সংলাপ মধ্যবর্তী নীরবতায় কথা বলতে জানতেন।

রবিবারের অলস বিকেলে অথবা শুক্রবার রাতে টেলিফিল্ম দেখার যে আবেগ ছিলো – কুণাল সেই স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অল্প সময়ের সেই কাহিনী গুলোয় তাঁর অভিনীত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে একটা আস্ত জীবন ছুঁয়ে যাওয়ার পরিসর ছিলো। যেন এক অদ্ভুত নরম বিষণ্ণতা – শেষ হওয়ার পরেও হৃদয়ের নরম কুঠুরিতে যা চিরতরে থেকে যায়। প্রায় ৩০০-এর বেশি ধারাবাহিক ও টেলিভিশন শো- এ তাঁর অভিনয় এই অনুভুতির-ই সাক্ষ্য বহন করে।

বড় পর্দার ক্ষণিক স্পর্শ

‘যুগান্ত’, ‘বিবর’, ‘সম্প্রদান’, ‘আলো’, ‘লাল রঙের দুনিয়া’, ‘ছ-এ ছুটি’ -এর মতো একাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের ‘আন্ডারস্টেটেড’ স্টাইল ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি তাঁকে করে তুলেছিল আর সকলের থেকে আলাদা। চরিত্র ছোট হোক কিংবা বড় – প্রতিটি উপস্থিতিতেই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত স্বাক্ষর। বাঙালির চির পরিচিত আবেগি হৃদয়ে তিনি ঝরে পড়তেন – ‘শ্রাবণের ধারার মতো’!

থমকে যাওয়া সময় ও ব্যক্তিগত শোক

কমেডি থেকে ট্র্যাজেডি – সমস্ত ক্ষেত্রেই কুণালের ছিলো অবাধ যাতায়াত। কিন্তু  কুণালের জীবন যেন এক অসমাপ্ত চিত্রনাট্য। ২১শে জানুয়ারি, ২০০৯ সাল, ইন্দ্রপুরী স্টুডিও-য় ‘উৎসবের রাত্রি’ ধারাবাহিকে অভিনয় চলাকালীন পরিচালক ‘কাট’ বলার আগেই তাঁর এই জীবনের অভিনয় থমকে যায়। বাংলা বিনোদন জগৎ থেকে হারিয়ে গেলো এক সম্ভাবনাময় শিল্পী আর বাঙালি দর্শক হারালো তাদের পরিবারের একজন প্রিয় সদস্যকে। যেখানে আরও অনেক গল্প, আরও অনেক চরিত্র বাকী রয়ে গেলো। 

যেসব গল্প শেষ হয় না

আমাদের কাছে কুণাল শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, যেন নিজের ভুলে যাওয়া একটা সময়ের  ভালোবাসার সঙ্গী – এক প্রিয়জন। জীবনের এই অসমাপ্ত গল্পে কুণাল আছেন – ঠিক সেই আগের মতোই। হয়তো একটু চুপচাপ, একটু গভীর আর একটু নিজের মতো, নিঃশব্দে… 

রোহিত, বুমরাহর হলটা কী! ক্রিকেটাররা সত্যিই অর্থের পিছনে ছোটেন?

ছন্দে নেই রোহিত ও বুমরা

ভারতের দুই নামী ক্রিকেটার এবার আইপিএলে ছন্দে নেই একেবারেই। রোহিত শর্মা এবং জসপ্রিত বুমরাহ কেউই নিজেদের সার্ভিস দিতে পারছেন না। সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, দেশের সকল ক্রিকেটার কি অর্থের পিছনে ছোটেন?

কঠিন পরীক্ষা আইপিএলে

শরীর দিচ্ছে না, মন খেলার মধ্যে নেই। কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার নূন্যতম সুযোগ নেই। দেশের হয়ে তাও আবেদন করলে তাদের ছুটি দেওয়া যেতে পারে। আইপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেললে সেই সুযোগও থাকে না। তাই রোহিত গত ১২ এপ্রিল বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে খেলার সময় সেই যে পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়েছেন, এখনও সুস্থ হতে পারেননি। টানা চার ম্যাচ মাঠের বাইরে বসে রয়েছেন। কিন্তু এই রোহিত শর্মা জাতীয় ক্রিকেট একাডেমিতে দিনের পর দিন থেকে নিজের ওজন ঝরিয়েছিলেন। তখন রোহিতকে খুব ফিট দেখাচ্ছিল। কিন্তু আইপিএলে এসে তিনি খেলার মতো অবস্থায় নেই। রোহিত যেহেতু সিনিয়র ক্রিকেটার তাই তাঁকে কেউ সরাসরি কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে তাঁকে নিয়ে সবাই বেশ বিরক্ত। কারণ রোহিত এখন জাতীয় দলের হয়ে খেলেন না। তিনি আইপিএলে নিজের সেরাটা দেবেন, সেটা মুম্বই ইন্ডিয়ান্স টিম ম্যানেজমেন্ট আশা করেছিল। দলের অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ডিয়াকে রোহিত খেলবেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে বেশ বিরক্ত দেখিয়েছে।

সময় খারাপ যাচ্ছে মুম্বইয়ের

চলতি আইপিএলে ছন্দে নেই মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। তারা একের পর এক ম্যাচ হারছে। গত হায়দরাবাদ ম্যাচেও ২৪৩ রান করেও হেরেছে। দলের বোলাররা একেবারেই ছন্দে নেই। দলের সিনিয়র বোলার বুমরাহ সাধারণ বোলারদের মতো মার খাচ্ছেন। বুমরাহ চার ওভার বোলিং করে ৫৪ রান দিয়ে কোনও উইকেট পাননি। সবাই বলছেন, বুমরাহ কবে থেকে খেলে চলেছেন। তাই আর ভাল বোলিং করার তাগিদ অনুভব করছেন না। কিন্তু আইপিএলে এসব কথা দলের মালিকরা শুনবেন না। তাঁরা বহু অর্থ খরচ করেছেন, ইচ্ছে না হলেও প্লেয়ারদের খেলতেই হবে।

নির্মম আইপিএল দুনিয়া

কর্পোরেট দুনিয়া খুব কঠিন। এখানে আবেগের কোনও জায়গা নেই। তাই নিজের হিসেবে কাজ না হলে সেই করে ক্রিকেটারকে বাতিল করে দিতে দুবার ভাববেন না মালিকরা। তুমি আগে কী করেছ এখানে তার কোনও দাম নেই। তাই রোহিত, বুমরাহ যাঁরা দেশের হয়ে এতকিছু করেছেন, তাঁরা ব্যর্থ হলেও কথা শুরু হয়ে যায়। অথচ বুমরা এমন বোলার যাঁকে সবাই ভয় পায়। কিন্তু আইপিএলে উইকেট না পেলেই তাঁকে ব্যর্থতার তকমা দিতে কেউ পিছপা হয় না।

স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি শতাংশ ভোট এবার: জ্ঞানেশ কুমার

দু’দফা মিলে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক শতাংশের হিসাব।

ভোট পড়েছে

  • প্রথম দফা- ৯৩.১৬%
  • দ্বিতীয় দফা – ৯১.৬৬%
  • দু’দফা মিলে মোটের হিসেবে – ৯২.৪৭%
  • কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় মহিলা ভোটার ৯২.২৮% এবং পুরুষ ভোটার ৯১.০৭%।
  • প্রথম দফায় মহিলা ভোটার ছিল ৯২.৬৯% এবং পুরুষ ভোটার ছিল ৯০.৯২%।
  • পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ৬.৮১ কোটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৮৪.৭২%।

চিফ ইলেকশন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলেন, ‘স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি শতাংশ ভোট পড়েছে এবার। নির্বাচন কমিশন রাজ্যের ভোটারদের সম্মান জানাচ্ছে।‘

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার কোনও কোনও কেন্দ্রে অপ্রত্যাশিত ফলাফলের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে ৪মে পর্যন্ত।

‘ম্যানগ্রোভের যোদ্ধা’ থেকে ‘ফিরে আসা ছায়া’! বাঘের লড়াইয়ে আশার আলো দেখছে পশ্চিমবঙ্গ

ভারতের বাঘের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ এখনও শীর্ষস্থান দখল করতে পারেনি. কিন্তু তা বলে ‘হালুম’ এর লড়াইও থেমে যায়নি ! বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের অস্তিত্ব আরও দৃঢ় করছে রাজ্যের বাঘেরা! সুন্দরবন-এর নোনা জলের অরণ্য থেকে শুরু করে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প-এর পাহাড়ি জঙ্গল— দুই ভিন্ন পরিবেশেই এখন বাঘ সংরক্ষণের আলাদা গল্প লিখছে পশ্চিমবঙ্গ।

২০২২ সালের ‘All India Tiger Estimation’ রিপোর্ট বলছে, রাজ্যে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় ১৩১ (পরিসীমা ১০০-১৫৩)। তুলনায় মধ্যপ্রদেশ (৭৮৫), কর্ণাটক (৫৬৩) বা উত্তরাখণ্ড (৫৬০)-এর মতো রাজ্যের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলা। তবুও আশার খবর, সংখ্যা কম হলেও বৃদ্ধির হার ইতিবাচক।

এক্ষেত্রে বাংলার সবচেয়ে বড় ভরসা সুন্দরবন। ২০১৮ সালে যেখানে বাঘ ছিল ৮৮টি, ২০২২-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১। বন দফতরের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৪-২৫ নাগাদ এই সংখ্যা অন্তত ১০২ ছুঁয়েছে! পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ অরণ্যে বসবাসকারী এই বাঘেরা শুধু সংখ্যায় নয়, অভিযোজন ক্ষমতায়ও অনন্য। জোয়ার-ভাটা, লোনা জল আর সীমিত শিকার— সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা টিকে আছে, লড়ছে।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। নিজস্ব চিত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব প্রায় ৪.৩— যা এই অঞ্চলের ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’র প্রায় সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। অর্থাৎ, এই অরণ্যে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর জায়গা খুব বেশি নেই। তাই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে সংঘাত কমানো এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষার দিকে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৪,১০০ বর্গ কিমি এলাকায় ১,৪৮৪টি ক্যামেরা বসিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের গল্পটা একেবারেই আলাদা। দীর্ঘদিন বাঘহীন থাকার পর হঠাৎই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে বক্সা। প্রায় ২৮ বছর পর ফের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে পূর্ণবয়স্ক বাঘ। ২০২৪ থেকে ২০২৬— একাধিকবার ছবি মিলেছে। বন দফতরের অনুমান, এই বাঘগুলি আসছে মানস জাতীয় উদ্যান বা ভুটানের জঙ্গল থেকে করিডোর ধরে।

তবে বক্সায় এখনও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়নি বাঘেদের। তাই পরিকল্পনা চলছে পুনর্বাসনের— অসম থেকে অন্তত ১২টি বাঘ এনে এখানে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। তার আগে কোর এলাকার গ্রাম সরানোর কাজ চলছে জোরকদমে। ইতিমধ্যেই একাধিক বনবস্তি চিহ্নিত করা হয়েছে, পরিবার পিছু প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে।

দুই অরণ্যের চ্যালেঞ্জও আলাদা। সুন্দরবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষ-বাঘ সংঘাত। জীবিকার টানে মৎস্যজীবী বা মধু সংগ্রাহকরা অনেক সময় জঙ্গলে ঢুকে পড়েন, আর তখনই ঘটে বিপদ। এই সংঘাত কমাতে বন দফতর নাইলন নেট বসানো থেকে শুরু করে বিকল্প কর্মসংস্থানের চেষ্টা চালাচ্ছে।

বক্সার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা মানুষের উপস্থিতি এবং খাদ্যের অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার পর্যাপ্ত শিকার। তাই সম্বর ও চিত্রা হরিণ এনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে জঙ্গলে, ঘাসজমিও সংস্কার করা হচ্ছে ।

পরিসংখ্যান বলছে, ভারত বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বাঘের আবাসস্থল— মোট সংখ্যা প্রায় ৩,৬৮২। সেই প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের অবদান সংখ্যায় ছোট হলেও গুরুত্বে কম নয়। কারণ, সুন্দরবনের মতো প্রতিকূল পরিবেশে বাঘের টিকে থাকা গোটা বিশ্বের কাছেই এক বিস্ময়।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলার বাঘেরা এখনও সংখ্যায় কম, কিন্তু লড়াইয়ে নয়। একদিকে সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া জঙ্গলে ফিরে আসার চেষ্টা— এই দ্বৈত সংগ্রামই হয়তো ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে বাঘের মানচিত্রে তুলে ধরবে।

রঘু রাই: সময়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি   

“একটি ছবি তোলা মানে কেবল দেখা নয় -তা অনুভব করা, অপেক্ষা করা, আর সঠিক মুহূর্তে সময়কে থামিয়ে দেওয়া।” – রঘু রাই।

একটি শিশুর নিথর মুখ, চারপাশে বিষাক্ত নীরবতা, একটি শহর, যার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে – জীবনের এই বহমানতাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন একজন মানুষ। যিনি প্রতিটি মুহূর্তকে সংরক্ষণ করছেন পরম মমতায়, নীরবে নির্মাণ করে চলেছেন সময়ের দলিল। আসলে “একটি ক্যামেরা যখন দ্রষ্টা হয়ে ওঠে”- তখন জন্ম হয় আলোছায়ার এক কিংবদন্তী জাদুকরের, যার নাম রঘু রাই। স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষ-কে অনুভব করতে চাইলে তাঁর প্রতিটি ফ্রেম হয়ে ওঠে একেকটি আস্ত জানালা, যা আমাদের নিয়ে যায় সময়ের অলিগলির অন্দরমহলে।

যেখানে আলো কথা বলতে শেখে

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই ডিসেম্বর, এক অস্থির সময়ে প্রাক বিভক্ত ভূখণ্ড পাঞ্জাব প্রদেশের ‘ঝং’  (অধুনা পাকিস্তানের) নামের একটি গ্রামে রঘু রাই-এর জন্ম। ১৯৬২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিরস সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি হাতে তুলে নিলেন ক্যামেরা, খুঁজে নিলেন নিজস্ব আলোর ভাষা। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ চিত্র সাংবাদিক হিসেবে রঘু প্রথম কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তাঁর জীবনে ঘটে এক বিস্ময়কর উত্থান। প্যারিসে একটি প্রদর্শনীতে কিংবদন্তি আলোকচিত্রী ও শিক্ষক হেনরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ হন। তাঁর হাত ধরে রঘু রাই পৌঁছে যান ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ, যেখানে শিল্প আর সত্য একই ফ্রেমে বন্দি হয়।

ক্যামেরা যখন সাক্ষী

রঘু রাই-এর ক্যামেরা কখনও নিরপেক্ষ ছিল না, বরং তা সবসময় মানবিক। তাঁর লেন্সে ধরা  পোট্রেটগুলি যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে, সরাসরি কথা বলে। বিসমিল্লা খাঁ, দালাই লামা, ইন্দিরা গান্ধী থেকে মাদার টেরেসা – রঘু রাইয়ের ছবিগুলি যেন একটি গভীর অথচ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। যা লিপিবদ্ধ করে রাখে একটি চরিত্রের অসংখ্য রূপরেখা। ১৯৮৪ সাল, তখন তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’-এর চিত্র সম্পাদক। সেই বছরই ঘটে যাওয়া ‘ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা’-এর ভয়াবহতার পর মৃত্যুর শহরে দাঁড়িয়ে রঘু রাই যে ছবিগুলি তুলেছিলেন, তা কেবল সংবাদ নয় – মানবতার বিরুদ্ধে নীরব অভিযোগ, এক গভীর মানবিক দলিল। এই সময়ের একাধিক ফ্রেম প্রমাণ করে – একটি ক্যামেরা কখনও কখনও কলমের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মানুষ, শহর, আর নীরবতা

রঘু রাই- এর জীবনের উপলব্ধি – “একটি ছবি কখনও মিথ্যা বলতে পারে না”। স্বাভাবিক ভাবেই,   তাঁর ছবিতে শহর শুধু স্থাপত্য নয় – সে যেন শ্বাস নেয়! দিল্লির কোলাহল, বারাণসীর ভোর  কিংবা কলকাতার ভেজা গলি হয়ে ওঠে – এক একটি জীবন্ত চরিত্র। সবখানেই যেন তিনি খুঁজে পান মানুষের নীরব গল্প। সংলাপহীন তাঁর একাধিক ফ্রেম ও কম্পোজিশন  জুড়ে থাকে এক অদ্ভুত মায়াময় শূন্যতা, যেন শব্দহীন কবিতারা।

সময়ের সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি

ক্যামেরা-কে হাতিয়ার করে শহর, বন্দর পেরিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাঁর ছবিতে যে ভারত ধরা পড়ে – তা কোনও একক সত্য নয়, বরং বহুস্তরীয় বাস্তবতা। একদিকে উৎসব, অন্যদিকে বেদনা; একদিকে আভিজাত্য, অন্যদিকে সংগ্রাম – জীবনের এক দ্বান্দিক সমাপতন। টাইমস, লাইফ, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য সানডে টাইমস, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট সহ একাধিক ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক চিত্র-প্রবন্ধ,  রঘু রাই’স দিল্লি, দ্য শিখস, ক্যালকাটা, খাজুরাহো, তাজমহল, টিবেট ইন এক্সাইল, ইন্ডিয়া, মাদার টেরেসা – সহ অসংখ্য গ্রন্থে শব্দ ও ছবির সমন্বয়ে গভীর যত্নের সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন স্মৃতি ও সত্ত্বার নীরব ভাষ্য। ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় চিত্র প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে রঘু রাই – এর মানবিক দর্শন আন্তর্জাতিকতার সীমা অতিক্রম করেছে। ১৯৭৭ সালে ভূষিত হয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মানে। জুরি হিসেবে বিশ্বজুড়ে একাধিক আর্ট ফেস্টিভ্যালে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে তাঁর আসল স্বীকৃতি লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। যেখানে তাঁর ছবি কেবল দৃশ্য নয়, এক অকৃত্রিম বোধের জন্ম দেয়।

যে আলো নিভে যায় না

গত ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ – এর পর ক্যানসারের সাথে তীব্র লড়াইয়ের শেষে তাঁর চোখ ও ক্যামেরার লেন্স এই পৃথিবীর বাস্তবতাকে আর কখনো দেখবে না। কিন্তু জীবন ও মানুষকে অনুভব করার যে আলোমাখা পথ তিনি নির্মাণ করেছেন, যেভাবে সংরক্ষণ করেছেন ইতিহাসের যাবতীয় গলিঘুঁজি – সেটি নিশ্চিত ভাবে আগামীকে বিস্মিত করবে এবং হয়ে উঠবে একটি জরুরী পাঠ। রঘু রাইয়ের ছবিগুলি নীরব সময়গাথা। যা কেবল নান্দনিক কিংবা জ্যামিতিক নয়, তীব্র বাস্তববাদী, অথচ এক নরম নদী। যে নদী সফরে দেশের আত্মার সাথে দেখা মেলে।