৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

সুবর্ণরেখার বুকে সত্যিই কি ভাসে সোনা ?

ঝাড়খণ্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গ, তারপর ওড়িশা— প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সুবর্ণরেখা। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সোনার ইঙ্গিত। কিন্তু সত্যিই কি এই নদীর বালিতে মেলে সোনা? নাকি সবটাই লোককথা? রহস্যের জট আজও পুরোপুরি কাটেনি।

রূপকথার গল্পে সোনার নদীর কথা শোনা যায়। কিন্তু ভারতের বুকে এমন একটি নদী রয়েছে, যার নামের অর্থই ‘সোনার রেখা’। সেই নদীর নাম সুবর্ণরেখা নদী। ঝাড়খণ্ডের রাঁচির কাছে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম ও পূর্ব মেদিনীপুর ছুঁয়ে ওড়িশার বালেশ্বর হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে এই নদী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের দাবি— নদীর বালির মধ্যে পাওয়া যায় সোনার কণা। আর সেই দাবির পক্ষে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও।

নদীর নামেই সোনার ইতিহাস

‘সুবর্ণ’ অর্থ সোনা, আর ‘রেখা’ অর্থ দাগ বা রেখা। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, রাঁচির কাছে পিস্কা অঞ্চলে প্রাচীনকালে সোনা আহরণের প্রমাণ মিলেছিল। সেই কারণেই নদীর এমন নামকরণ। স্থানীয় কিংবদন্তিও বলে, নদীর তলদেশে সোনার কণা দেখতে পেয়েছিলেন মানুষ, সেখান থেকেই ‘সুবর্ণরেখা’।

নদীর বিভিন্ন অংশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বালুচর। ছবি – Google

আজও বালি ধুয়ে খোঁজা হয় সোনা

ঝাড়খণ্ডের কিছু এলাকায় এখনও বহু পরিবার নদীর বালি ধুয়ে ক্ষুদ্র সোনার কণা সংগ্রহ করেন। বর্ষা বাদ দিলে বছরের প্রায় সব সময়ই এই কাজ চলে। এক একটি কণা কখনও চালের দানার মতো, কখনও তারও ছোট। মাসভর পরিশ্রম করে কয়েক ডজন সোনার কণা পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা জুড়ে প্রবাহিত এই নদী। ছবি – Google

রহস্যটা কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই সোনা আসে কোথা থেকে?
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সুবর্ণরেখার অববাহিকা খনিজে সমৃদ্ধ ছোটনাগপুর মালভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত। নদীর উপনদীগুলি সোনাবাহী শিলা ও খনিজস্তর ক্ষয় করে ক্ষুদ্র সোনার কণা নদীতে এনে ফেলতে পারে। দীর্ঘদিনের ক্ষয়প্রক্রিয়ায় সেই কণাগুলি নদীর বালিতে জমা হয়।

তবে সমস্যাও রয়েছে। নদীতে সোনার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা মিললেও, এত দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সোনার কণা পাওয়া যাচ্ছে কেন, তার নির্দিষ্ট উৎস এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। কোনও বড় সোনার খনি বা বিশাল আকরিক ভাণ্ডারের সন্ধান এখনও মেলেনি। ফলে রহস্য রয়েই গিয়েছে।

বিজ্ঞান কী বলছে?

আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, নদীর বালিতে যে সোনা পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় ‘অ্যালুভিয়াল গোল্ড’ বা পলিবাহিত সোনা। পাহাড়ি অঞ্চলের সোনাযুক্ত শিলা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষুদ্র কণা নদীতে এসে জমা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই এমন ঘটনা দেখা যায়। সুবর্ণরেখার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেই প্রক্রিয়াই কাজ করছে।

তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও গবেষণা সামনে আসেনি যা শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলেছে, সোনার মূল উৎস কোথায় এবং কী পরিমাণ সোনা প্রতি বছর নদীতে জমা হচ্ছে।

বাংলার সাহিত্য-সিনেমাতেও সুবর্ণরেখা

এই নদী শুধু ভূতাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়, বাংলার সংস্কৃতিরও অংশ। পরিচালক ঋত্বিক ঘটক তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র সুবর্ণরেখা-র নাম রেখেছিলেন এই নদীর নামেই। সাহিত্যেও বারবার ফিরে এসেছে সুবর্ণরেখার উল্লেখ।

রহস্যের শেষ কোথায়?

নদীর জলে সোনা ভাসে না। কিন্তু নদীর বালিতে সোনার সূক্ষ্ম কণা যে সত্যিই পাওয়া যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তেমন দ্বিমত নেই। তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— সেই সোনা আসছে কোথা থেকে? তার উত্তর আজও অধরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভবত ছোটনাগপুরের পাহাড়, খনিজসমৃদ্ধ শিলা আর হাজার বছরের প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়া মিলেই তৈরি করেছে এই বিস্ময়। কিন্তু সুবর্ণরেখার বুকের সেই ‘সোনার রেখা’ এখনও পুরোপুরি পড়ে ফেলতে পারেননি বিজ্ঞানীরাও। তাই ভারতের অন্যতম রহস্যময় নদী হিসেবে সুবর্ণরেখার আকর্ষণ আজও অমলিন।

বারবার কাঁপছে শহর, বাড়ছে উদ্বেগ! কলকাতা কি সত্যিই নিরাপদ?

কলকাতা: রবিবার (৮ জুন) গভীর রাতে আচমকাই দুলে উঠল শহর কলকাতা। রাত ১১টা ৬ মিনিট নাগাদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে ওঠে মাটি। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৭। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ভুটান। শুধু কলকাতা নয়, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার-সহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়। অনেকের মোবাইলে আগাম গুগল এলার্ট পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুলে ওঠে ঘরবাড়ি। প্রবল বৃষ্টির রাতে আচমকা এই কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। যদিও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি।

আর এই ঘটনাই ফের একবার সামনে এনে দিয়েছে সেই পুরনো প্রশ্ন—কলকাতা কি সত্যিই ভূমিকম্পের দিক থেকে নিরাপদ?

এক ঝটকায় দুলে ওঠে ফ্যান, কেঁপে ওঠে জানলার কাঁচ। কেউ চিৎকার করে ওঠেন—’ভূমিকম্প!’ তারপর আবার সব শান্ত। গত কয়েক মাসে একাধিকবার কেঁপে উঠেছে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের কম্পনই মনে প্রশ্ন তোলে—এই শহর কি সত্যিই নিরাপদ, নাকি নিশ্চিন্ততার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বিপদের ইঙ্গিত?

ঝুঁকির মানচিত্রে কলকাতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা সরাসরি ভয়ঙ্কর ফল্ট লাইনের উপর না থাকলেও পূর্বভারতের ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলগুলির কাছাকাছি অবস্থানের জেরেই এই ঘনঘন কম্পন। তাছাড়া ভূ-প্রাকৃতিক গঠন, আশপাশের সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং ভূগর্ভস্থ কাঠামোর কারণে শহরটি ‘মাঝারি ঝুঁকির’ এলাকাতেই পড়ে। অর্থাৎ বিপদ খুব কাছে না থাকলেও, একেবারে দূরেও নয়।

হিমালয়ের ছায়া দক্ষিণবঙ্গে

অবসরপ্রাপ্ত ভূবিজ্ঞানী অমিতাভ মল্লিকের মতে, উত্তরবঙ্গের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল অত্যন্ত সক্রিয়। সেখানে বড়সড় ভূমিকম্প হলে তার অভিঘাত দক্ষিণবঙ্গেও এসে পৌঁছায়। তাঁর কথায়, “কলকাতায় হয়তো ভয়াবহ মাত্রার ভূমিকম্প না-ও হতে পারে, কিন্তু উত্তরে বড় কম্পন হলে শহর নড়বেই।”

সিসমিক জোনের সীমানায় শহর

আইআইটি খড়গপুরের সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতা সিসমিক জোন ৩ ও ৪-এর মাঝামাঝি অবস্থানে। এই শ্রেণিবিন্যাসই বলে দেয়—ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহরের এক পরিকল্পনাবিদের কথায়, “কলকাতা গ্রেড ৩-এর ভূমিকম্পপ্রবণ শহর—এখানে সতর্কতা অপরিহার্য।”

প্লেটের সংঘর্ষ, নরম মাটির ফাঁদ

কলকাতা রয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেটের উপর, যা প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে টিবেটান প্লেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধাক্কাই ভূমিকম্পের মূল কারণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরের নরম পলিমাটি—হুগলি নদীবাহিত কাদা ও বালির স্তর। ছোট কম্পনে এই মাটি ধাক্কা শোষণ করলেও, বড় কম্পনে সেটাই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ভূগর্ভস্থ ফাটল ও কম্পনের বিস্তার

বিশেষজ্ঞদের দাবি, কলকাতার ভূগর্ভে একটি দীর্ঘ ফাটল রয়েছে, যা পূর্বদিকে মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফাটল বরাবর কম্পনের তরঙ্গ ছড়ালে তার প্রভাব অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। ফলে দূরের ভূমিকম্পও এখানে বাড়তি ধাক্কা নিয়ে পৌঁছতে পারে।

সাম্প্রতিক কম্পনে উদ্বেগ

গত কয়েক বছরে একাধিকবার কলকাতা কেঁপে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫.৫ মাত্রার কম্পন শহরবাসীকে চমকে দেয়। তার আগেও ২০২৫ জুড়ে অসম, বঙ্গোপসাগর বা বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় উৎপন্ন ভূমিকম্পের রেশ এসে পৌঁছেছে কলকাতায়। বড় ক্ষতি না হলেও, আতঙ্কের রেশ বারবার ফিরে এসেছে।

একনজরে কলকাতার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের খতিয়ান

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ আচমকাই জোরাল কম্পনে কেঁপে ওঠে কলকাতা। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫। শুধু শহর নয়, আশপাশের জেলাগুলিতেও এই কম্পন অনুভূত হয়। অনেকেই আতঙ্কে বাড়ি-অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ভোরের দিকে মৃদু কম্পন টের পান শহরবাসী। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল খুলনা সংলগ্ন এলাকা বা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। এই কম্পন অনুভূত হয় সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায়। তবে কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি।

২১ নভেম্বর, ২০২৫: সকাল ১০টা ৮ মিনিট নাগাদ তীব্র কম্পনে কেঁপে ওঠে শহর। উত্তর থেকে দক্ষিণ—সর্বত্রই অনুভূত হয় এই কম্পন। সল্টলেক-এর অফিসপাড়ায় কর্মীরা আতঙ্কে দ্রুত নীচে নেমে আসেন। বহু বহুতল থেকে বাসিন্দারাও রাস্তায় নামেন।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫: বিকেল ৪টে ৪১ মিনিটে ভূমিকম্প হয় অসম-এ। উৎসস্থল ছিল গুয়াহাটি ও তেজপুর-এর মাঝামাঝি ওদালগুরি এলাকা। এর প্রভাব পড়ে কলকাতাতেও, যদিও কম্পন ছিল মৃদু।

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: সকাল ৬টা ১০ মিনিট নাগাদ ভূমিকম্পের উৎস ছিল বঙ্গোপসাগর, প্রায় ৯১ কিলোমিটার গভীরে। কলকাতা-সহ উপকূলীয় দক্ষিণবঙ্গের একাংশ কেঁপে ওঠে।

৭ জানুয়ারি, ২০২৫: সকাল ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ প্রায় এক মিনিট ধরে কম্পন অনুভূত হয়। দিনের শুরুতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

ইতিহাসের শিক্ষা

ইতিহাসও সতর্ক করছে। ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্পে কলকাতার বহু পুরনো ভবনে ফাটল ধরেছিল। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের সময়ও শহর কেঁপে ওঠে। অর্থাৎ বড় বিপর্যয় না হলেও, কলকাতা বারবার ভূমিকম্পের অভিঘাত অনুভব করেছে।

বিপদের আসল উৎস—দুর্বল নির্মাণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার সবচেয়ে বড় বিপদ ভূমিকম্প নয়, বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বহু পুরনো বাড়ি, নিয়ম না মেনে তৈরি বহুতল এবং দুর্বল কাঠামো—এই সবই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ভূমিকম্পের সময় এই সব ভবনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

প্রস্তুতির ঘাটতি কোথায়

যদিও নতুন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তার উপর সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব—ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, সেই প্রাথমিক জ্ঞানও অনেকের নেই।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি

বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা—ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না, কিন্তু ক্ষতি কমানো সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর বিল্ডিং নিয়ম এবং জনসচেতনতা। কলকাতা আপাত শান্ত হলেও, সেই শান্তির নীচে লুকিয়ে রয়েছে সম্ভাব্য কম্পনের ছায়া। তাই ভয় নয়—প্রস্তুত থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

শান্তনুর পর সুজিত, ফের চর্চায় ‘গ্রেড ওয়ান’ বন্দি! জেলের গরাদের আড়ালেও কেন আলাদা মর্যাদা?

জেলের ভিতরে কি সকল বন্দিই সমান? আইনের চোখে হয়তো উত্তর ‘হ্যাঁ’। কিন্তু সংশোধনাগারের বাস্তব ছবি বলছে, সব বন্দির থাকার পরিবেশ বা সুযোগ-সুবিধা এক নয়। সম্প্রতি পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে ‘গ্রেড ওয়ান’ বা প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিচারভবনের বিশেষ আদালত। তার আগে দুর্নীতি ও জমি দখলের মামলায় গ্রেফতার কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসও একই মর্যাদা পেয়েছিলেন। পরপর দুই হাই-প্রোফাইল বন্দিকে এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে কারা ব্যবস্থার বহুচর্চিত ‘গ্রেড ওয়ান’ শ্রেণিবিভাগ।

প্রশ্ন উঠছে, কী এই গ্রেড ওয়ান বন্দি? কেনই বা কেউ এই মর্যাদা পান? আর সাধারণ বন্দিদের তুলনায় কতটা আলাদা তাঁদের জীবনযাপন?

কারা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি নতুন নয়। এর শিকড় ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তিকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। তাঁদের জন্য আলাদা বন্দোবস্তের ধারণা তখন থেকেই চালু হয়। স্বাধীনতার পর সেই ব্যবস্থার অনেক পরিবর্তন হলেও বিভিন্ন রাজ্যের কারা বিধিতে এখনও বিশেষ শ্রেণির বন্দির ধারণা বহাল রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের কারা বিধি অনুযায়ী, কোনও বন্দির সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত পরিচিতি, জনজীবনে অবদান এবং নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বিচার করেই তাঁকে প্রথম শ্রেণির বন্দি বা ‘গ্রেড ওয়ান’ মর্যাদা দেওয়া হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত সাধারণত আদালতের অনুমোদন এবং কারা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কার্যকর হয়।

তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি। গ্রেড ওয়ান মর্যাদা মানেই ‘ভিআইপি বন্দি’ নয়। এই মর্যাদা কোনও পুরস্কারও নয়। বরং সংশ্লিষ্ট বন্দির সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান, নিরাপত্তা এবং কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এই শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

তাহলে কী কী সুবিধা মেলে?

কারা সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির বন্দিদের সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা বাধ্যতামূলক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য পৃথক বা অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের সেলের ব্যবস্থা করা হয়। জেলের সাধারণ কম্বল বা পোশাকের পরিবর্তে নিজের পোশাক ব্যবহারের অনুমতি মিলতে পারে। বই, সংবাদপত্র, খাতা, কলম বা লেখাপড়ার অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে উন্নত মানের বিছানা, টেবিল-চেয়ার এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের কিছু অতিরিক্ত সামগ্রী রাখার সুযোগও দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিজের খরচে কিছু খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের অনুমতিও পেতে পারেন তাঁরা। যদিও এই সমস্ত সুবিধাই সংশোধনাগারের নিয়ম এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতির উপর নির্ভরশীল।

প্রাক্তন আইপিএস অফিসার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আদালত বিশেষভাবে তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্নটি বিবেচনা করেছিল। একজন প্রাক্তন পুলিশকর্তা হিসেবে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে রাখলে তাঁর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে গ্রেড ওয়ান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল বলে আদালত সূত্রে জানা যায়।

অন্যদিকে, সুজিত বসুর ক্ষেত্রে আদালত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সামাজিক অবস্থান এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা ইডি আদালতে তাঁর এই আবেদনের বিরোধিতা করেছিল। তবুও আদালত শেষ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে সায় দেয়।

তবে এই মর্যাদা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকদের প্রশ্ন, জেলের ভিতরে যদি সামাজিক অবস্থান বা পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে সমতার নীতি কোথায় দাঁড়ায়? একজন শিক্ষক, অধ্যাপক, আইএএস, আইপিএস বা প্রাক্তন মন্ত্রীর জন্য যদি আলাদা বন্দোবস্ত থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য তা থাকবে না কেন?

অন্যদিকে কারা প্রশাসনের একাংশের যুক্তি, বিষয়টি সুবিধা দেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের সঙ্গে বেশি জড়িত। প্রাক্তন বিচারপতি, আমলা, পুলিশকর্তা কিংবা জনজীবনের পরিচিত ব্যক্তিদের অনেক সময় সাধারণ ওয়ার্ডে রাখলে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই এই বিশেষ শ্রেণিবিভাগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গ্রেড ওয়ান মর্যাদা কোনওভাবেই আইনি সুবিধা নয়। এই মর্যাদা পেলে জামিন পাওয়া সহজ হয় না, সাজা কমে না, বিচারপ্রক্রিয়াতেও কোনও বাড়তি সুবিধা মেলে না। আদালতের কাছে তিনি অন্য বন্দিদের মতোই একজন অভিযুক্ত বা বিচারাধীন ব্যক্তি। পার্থক্য শুধু সংশোধনাগারের ভিতরে তাঁর বসবাসের পরিবেশে।

সুজিত বসু ও শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে গ্রেড ওয়ান মর্যাদা দেওয়ার পর সেই পুরনো প্রশ্নটাই আবার সামনে এসেছে— জেলের গরাদের আড়ালে কি সকল বন্দি সত্যিই সমান? নাকি আইনের সমতার পাশাপাশি বাস্তবের সংশোধনাগারে এখনও টিকে রয়েছে এক অদৃশ্য শ্রেণিবিভাগ? সেই বিতর্কই এখন নতুন করে উসকে দিয়েছে দুই আলোচিত বন্দির ‘গ্রেড ওয়ান’ মর্যাদা।

নোটিশে কি বদলাবে ছবি? সরকারি স্কুলে ফিরবে পড়ুয়ার ভিড়, নাকি আবারও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে নির্দেশ?

রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দফতর ফের একবার সরকারি, সরকার-পোষিত এবং সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকদের বেসরকারি টিউশন বা গৃহশিক্ষকতা নিয়ে কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিয়ম ভেঙে কোনও শিক্ষক ব্যক্তিগত টিউশন করলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা স্কুল পরিদর্শকদেরও বিষয়টি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এমন নির্দেশ কি এই প্রথম? মোটেই নয়। গত এক দশকে একাধিকবার শিক্ষা দফতর, স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক মহল থেকে একই ধরনের নির্দেশ জারি হয়েছে। ২০১৮ সালেও সরকারি স্কুলশিক্ষকদের ব্যক্তিগত টিউশন বন্ধে কড়া নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়েও বলা হয়েছিল, অভিযোগ পেলে তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কতটা কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।

শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, সমস্যার মূল কারণ নির্দেশ জারি নয়, তার বাস্তবায়ন। শহর থেকে গ্রাম—অসংখ্য সরকারি স্কুলে বছরের পর বছর ধরে ছাত্রসংখ্যা কমেছে। বহু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, স্কুলে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত টিউশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, শিক্ষকরা স্কুলে পাঠদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কোচিংয়ের মাধ্যমেই বেশি সময় দিচ্ছেন—এমন অভিযোগও বারবার উঠেছে।

ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সরকারি স্কুলে নাম নথিভুক্ত থাকলেও প্রকৃত শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে টিউশন সেন্টার। শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও দেখা গিয়েছে, বহু সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ কমছে। কোথাও কোথাও একটি শ্রেণিতে হাতে গোনা কয়েকজন পড়ুয়া নিয়ে ক্লাস চলছে। বিপরীতে কোচিং সেন্টার এবং ব্যক্তিগত টিউশনের বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র টিউশন বন্ধের নির্দেশ দিলেই সরকারি স্কুলে ছাত্র ফিরবে না। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আধুনিক পরিকাঠামো এবং জবাবদিহি ব্যবস্থা। কারণ অভিভাবকরা শেষ পর্যন্ত সন্তানের ভাল শিক্ষাই চান। যদি তারা মনে করেন স্কুলেই পর্যাপ্ত পড়াশোনা হচ্ছে, তাহলে অতিরিক্ত টিউশনের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।

এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই নতুন নির্দেশ কি সত্যিই কার্যকর হবে? নাকি আগের মতোই কিছুদিন আলোচনা চলার পর বিষয়টি আবার ধামাচাপা পড়ে যাবে?

শিক্ষক সংগঠনের একাংশ বলছে, নজরদারি বাড়ানো হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু অন্যদের মতে, শুধুমাত্র ডিআই অফিসের নির্দেশ বা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের রিপোর্টের উপর নির্ভর করলে বাস্তব ছবি ধরা কঠিন। কারণ গৃহশিক্ষকতা সাধারণত স্কুলের বাইরে হয় এবং তা প্রমাণ করাও সহজ নয়।

তবে এই নির্দেশের একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। শিক্ষা দফতর অন্তত স্বীকার করছে যে সমস্যাটি বাস্তব এবং তা মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে আদৌ কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয় কি না। কারণ অতীতে নির্দেশ ছিল, অভিযোগও ছিল, কিন্তু শাস্তির নজির ছিল খুবই সীমিত।

সরকারি স্কুলগুলির করিডর আজও বহু জায়গায় ফাঁকা। অনেক শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কম। তাই নতুন নির্দেশিকার প্রকৃত সাফল্য বিচার হবে কাগজে-কলমে নয়, স্কুলের বেঞ্চে। আগামী কয়েক মাসে যদি সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ে, শ্রেণিকক্ষ আবার গমগম করে এবং অভিভাবকদের আস্থা ফিরে আসে, তবেই বলা যাবে এই নির্দেশ সত্যিই ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্যথায়, এটি আরও একটি সরকারি নোটিশ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে—যার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কিন্তু বাস্তব প্রভাব ছিল সীমিত।

কলকাতার বুকেই ছিল এক টুকরো চিন! ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া, লাল লণ্ঠনের আলো আর হারিয়ে যাওয়া এক পাড়ার গল্প

ভোরের কলকাতা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। টেরিটি বাজারের সরু গলিতে ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে ভিড়। বাঁশের স্টিমারের ঢাকনা খুলতেই বেরিয়ে আসছে গরম ধোঁয়া, তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ডাম্পলিং, বান আর স্যুপের মাদক গন্ধ। মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে, এ যেন কলকাতা নয়—দক্ষিণ চিনের কোনও পুরনো শহরের সকাল।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, একসময় কলকাতার বুকেই ছিল একটি ছোট্ট চিন। শুধু একটি নয়, দুটি চায়নাটাউন নিয়ে গর্ব করত এই শহর। টেরিটি বাজার আর ট্যাংরা—দুটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিবাসন, সংগ্রাম, সাফল্য এবং হারিয়ে যাওয়ার এক আবেগঘন ইতিহাস।

টেরিটি বাজারের ভোরের খাবারের বাজার। ছবি – Google


প্রায় আড়াইশো বছর আগে, অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে, কয়েকজন চীনা ব্যবসায়ী ও কারিগর এই শহরে এসে পা রাখেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম টং আ-চিউ। হুগলির কাছে আচিপুরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন চিনিকল। সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে হাক্কা, ক্যান্টনিজ-সহ বিভিন্ন চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কলকাতাকে নিজেদের দ্বিতীয় ঘর বানিয়ে ফেলেন।
টেরিটি বাজার তখন শুধু একটি পাড়া ছিল না, ছিল এক টুকরো সংস্কৃতি। সেখানে ছিল চীনা স্কুল, ক্লাব, মন্দির, দাঁতের ডাক্তার, কাঠের কারখানা, জুতোর ব্যবসা—একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। কলকাতার বহু মানুষ তখন প্রথম চিনকে চিনেছিলেন এই চীনাপাড়ার মানুষের হাত ধরেই।

চিনা নববর্ষের উৎসবের দৃশ্য। ছবি – Google


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক হাক্কা পরিবার চলে যান ট্যাংরায়। তখনকার জলাভূমি অঞ্চলকে নিজেদের পরিশ্রমে বদলে দেন তাঁরা। গড়ে ওঠে ট্যানারি শিল্প। আর সেই ট্যাংরার রান্নাঘরেই জন্ম নেয় এক নতুন খাদ্যসংস্কৃতি—যাকে আজ আমরা বলি ‘ইন্ডিয়ান চাইনিজ’। চিলি চিকেন, হাক্কা নুডলস, মাঞ্চুরিয়ান—আজ দেশের প্রতিটি শহরের পরিচিত খাবার। অথচ তাদের জন্মভূমি এই কলকাতাই।
কিন্তু ইতিহাস সব সময় সমান মধুর থাকে না। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ অনেক কিছু বদলে দেয়। সন্দেহ, অনিশ্চয়তা আর প্রশাসনিক নজরদারির আবহে বহু চীনা পরিবার কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়। কেউ চলে যান কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ বা আমেরিকায়। যে পাড়াগুলি একসময় হাসি, উৎসব আর মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত, সেগুলি ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে।
পুরনো বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ হয়ে যায়। চীনা স্কুলগুলোর ঘণ্টা থেমে যায়। বহু রেস্তোরাঁর আলো নিভে যায় চিরতরে। তবুও চায়নাটাউনের গল্প শেষ হয়ে যায়নি।

ঐতিহ্যবাহী চিনা খাবার। ছবি – Google


আজও চীনা নববর্ষ এলে টেরিটি বাজার আর ট্যাংরার রাস্তায় লাল লণ্ঠন দুলে ওঠে। ড্রাগন নাচের তালে তালে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু পরিবার এখনও ধরে রেখেছেন তাঁদের শিকড়, তাঁদের ঐতিহ্য।
তাই চায়নাটাউন শুধু একটি পাড়া নয়, কলকাতার স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এক আবেগ। এমন এক ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেয়, এই শহর শুধু বাঙালির নয়, বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষা, বহু স্বপ্নের মিলনভূমি।
আজ টেরিটি বাজারের গলিতে দাঁড়ালে হয়তো আর আগের সেই কোলাহল শোনা যায় না। কিন্তু ভোরের বাতাসে ভেসে আসা ডাম্পলিংয়ের গন্ধ যেন এখনও ফিসফিস করে বলে—কলকাতার বুকেই একদিন ছিল এক টুকরো চিন, যে আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি!

ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন! কলকাতার মাটির নীচে কি সত্যিই লুকিয়ে আছে সাহেবদের গোপন সুড়ঙ্গ?

কলকাতার ইতিহাস যতটা নথিতে লেখা, ততটাই ছড়িয়ে রয়েছে কিংবদন্তিতে। আর সেই কিংবদন্তির অন্যতম জনপ্রিয় অধ্যায়—গোপন সুড়ঙ্গের রহস্য।

কেউ বলেন, ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন পর্যন্ত ছিল ভূগর্ভস্থ গোপন পথ। কারও দাবি, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের নীচে লুকিয়ে ছিল এমন এক সুড়ঙ্গ, যা বিপদের সময় ব্রিটিশ আধিকারিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হত। পুরনো কলকাতার অলিগলি ঘুরলেই আজও শোনা যায় এইসব গল্প।

কিন্তু ইতিহাস কী বলছে?

১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলার আক্রমণের অভিঘাতের পর ব্রিটিশরা নতুন করে গড়ে তোলে ফোর্ট উইলিয়াম। সামরিক কৌশল মাথায় রেখে নির্মিত এই দুর্গে ছিল ভূগর্ভস্থ গুদামঘর, অস্ত্রভাণ্ডার এবং সেনাদের চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। ফলে দুর্গের ভিতরে কিছু ভূগর্ভস্থ পথ থাকার সম্ভাবনা ইতিহাসবিদরাও উড়িয়ে দেন না।

ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন—সত্যিই কি ছিল গোপন সুড়ঙ্গ? ইতিহাস ও কিংবদন্তির সন্ধিক্ষণে কলকাতার এক অমীমাংসিত রহস্য। ছবি – Google

তবে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন বা রাইটার্স বিল্ডিং পর্যন্ত দীর্ঘ গোপন সুড়ঙ্গ ছিল—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনও পর্যন্ত মেলেনি। সরকারি নথি, মানচিত্র কিংবা সমসাময়িক দলিলে তার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না।

রাজভবন, কলকাতা। ছবি -Google

তবু রহস্যের আগুন নিভে যায়নি।

বিগত কয়েক দশকে কলকাতার বহু প্রাচীন ভবনের সংস্কারের সময় মিলেছে বন্ধ ইটের করিডর, অচেনা ভূগর্ভস্থ কক্ষ কিংবা অদ্ভুত স্থাপত্যের চিহ্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলি ছিল পুরনো নিকাশি ব্যবস্থা, খাদ্য মজুতঘর, বায়ু চলাচলের পথ অথবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্থাপত্যের অংশ। কিন্তু লোকমুখে সেগুলিই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গ’-এর গল্পে।

রাজভবনকে ঘিরেও কম কাহিনি নেই। শোনা যায়, গভর্নর জেনারেলের নিরাপত্তার জন্য সেখানে বিশেষ পালানোর রাস্তা তৈরি ছিল। একইভাবে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কর্মচারীদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল ‘বন্ধ সুড়ঙ্গ’-এর গল্প। কিন্তু কৌতূহল যতই থাক, প্রমাণের ঝুলি এখনও প্রায় ফাঁকাই।

আসলে কলকাতা এমন এক শহর, যেখানে ইতিহাস আর লোককথা প্রায়শই হাত ধরাধরি করে চলে। পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সামরিক বাংকার, ভূগর্ভস্থ গুদামঘর কিংবা পরিত্যক্ত কক্ষ—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিই মানুষের কল্পনায় হয়ে উঠেছে রহস্যময় সুড়ঙ্গের জাল।

তাই ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন পর্যন্ত সত্যিই কোনও গোপন রাস্তা ছিল কি না, তার উত্তর আজও অধরা। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—কলকাতার মাটির নীচে যেমন লুকিয়ে আছে বহু অজানা ইতিহাস, তেমনই লুকিয়ে আছে অসংখ্য অমীমাংসিত রহস্য।

আর সেই রহস্যই হয়তো আজও শহরটাকে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রলোভন জাগিয়ে রাখে।

রোলস রয়েসের ইঞ্জিন বিমানের বিস্ময়, ঝুঁকিবিহীন যাত্রার সঠিক প্রযুক্তি

স্বপ্নের গাড়ি

রোলস রয়েস মানে আমাদের মনে হয় বাইপাসের ধার দিয়ে চলে যাওয়া এক মসৃণ গাড়ি। যা দেখে পথচারি দাঁড়িয়ে যান। কেউ বা যিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্নের গাড়ি কেনার মনোবাসনায় রয়েছেন, তিনিও রোলস রয়েস গাড়ি দেখে থমকে যান। হয়তো নিভৃতে বলেও ফেলেন, এটাই আমার সেই স্বপ্নের গাড়ি।

বিমানের ইঞ্জিনেও বিস্ময়

সেই রোলস রয়েস এবার বিমানের ইঞ্জিন তৈরি করছে। এয়ারবাস সুপারজাম্বো হল বিশ্বের একমাত্র সম্পূর্ণ ডাবল-ডেক বাণিজ্যিক জেট। এই বিমানের ইঞ্জিন প্রস্তুত করার কাজটি করছে রোলস রয়েস। এই বিমানের ইঞ্জিনের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে সর্বোচ্চ ওজনের বিমান নিয়েও নিশ্চিন্তে টেক-অফ করতে পারবে। এটিতে ঐচ্ছিকভাবে চারটি রোলস-রয়েস ট্রেন্ট ৯০০ ইঞ্জিন অথবা চারটি ইঞ্জিন অ্যালায়েন্স জিপি ৭২০০ ইঞ্জিন ব্যবহার করা যাবে। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকাগামী বিমানে রোলস রয়েস ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি। ইউরোপেও বহু বিমান প্রস্তুতকারী সংস্থা ঝুঁকিবিহীন যাত্রার কারণে এই ক্ষমতার ইঞ্জিন ব্যবহার করছে।

সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন

ট্রেন্ট ৯০০ এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে, এই সুপারজাম্বোটির ছোট বোয়িং ৭৭৭-এর মতো শক্তিশালী ইঞ্জিনের প্রয়োজন ছিল না, কারণ এতে দ্বিগুণ সংখ্যক ইঞ্জিন রয়েছে। রোলস-রয়েস কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের শক্তিশালী ওয়াইডবডি ইঞ্জিন তৈরি করতে ও ন্যারোবডি ইঞ্জিনের বাজার ধরছে, সেটি বেশ চমকপ্রদ।

রোলস রয়েস-এর তৈরি বিমানের ‘আলট্রা ফ্যান’। ছিবি – Google

দুরন্ত ব্রেক সিস্টেম

প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়, বিশাল বিমানের জন্য হুইল ব্রেকিং যথেষ্ট হবে। কিন্তু প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান পদ্ধতিতে দেখা গিয়েছে, ভেতরের দুটি ইঞ্জিনে থ্রাস্ট রিভার্সার যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। থ্রাস্ট রিভার্সাল হল, জেট ইঞ্জিনের একটি অপারেটিং মোড, যা অবতরণের পরে বিমানের গতি কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি চাকারও ক্ষয় কমাতে সহায়তা করে থাকে।

আচমকা বিমান থামানোর কার্যকারিতার জন্য থ্রাস্ট রিভার্সার অপরিহার্য নয় এবং শুকনো রানওয়েতে শুধুমাত্র ব্রেক ও স্পয়লার ব্যবহার করে থামার জন্য এ৩৮০ ইঞ্জিন যথার্থই। কিন্তু রানওয়ে যখন পিচ্ছিল কিংবা বৃষ্টি হয়েছে, সেইসময় রোলস রয়েসের থার্স্ট রিভার্সিং ব্রেক একদম উপযুক্ত।

হুইসেলব্লোয়ার না হ্যাকার? ১৯ বছরের তরুণকে ঘিরে সিবিএসই-র সাইবার ঝড়

দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষা বোর্ড সিবিএসই। প্রতি বছর কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় এই বোর্ডের পরীক্ষার মাধ্যমে। সেই সিবিএসই-র ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েই এবার উঠল বড় প্রশ্ন। এক ১৯ বছরের সাইবার গবেষকের অভিযোগকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন পৌঁছে গিয়েছে জাতীয় স্তরে। প্রশ্ন উঠছে—সত্যিই কি সিস্টেম হ্যাক হয়েছিল, নাকি ঘটনাটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতির ফল?

কী দাবি করেছিলেন ওই তরুণ?
‘নিসর্গ’ নামে পরিচিত ওই তরুণ সাইবার নিরাপত্তা গবেষকের দাবি, সিবিএসই-র অন-স্ক্রিন মার্কিং (OSM) ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি পোর্টালে তিনি অনায়াসে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। সেখানে পরীক্ষার উত্তরপত্র এবং মূল্যায়ন সংক্রান্ত কিছু তথ্য দৃশ্যমান ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শুধু অভিযোগেই থেমে থাকেননি। নিজের দাবির সমর্থনে স্ক্রিনশট ও ভিডিও প্রকাশ করেন।
তার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় জোর বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, দেশের বৃহত্তম শিক্ষা বোর্ডের ডিজিটাল অবকাঠামো আদৌ কতটা নিরাপদ?

প্রথমে অস্বীকার, পরে সুর বদল সিবিএসই-র
অভিযোগ সামনে আসতেই প্রথমে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সিবিএসই। বোর্ডের বক্তব্য ছিল, যে ওয়েবসাইটের কথা বলা হচ্ছে সেটি মূল মূল্যায়ন পোর্টাল নয়। সেটি ছিল পরীক্ষামূলক বা ডেমো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রকৃত পরীক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষিত ছিল না।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য সামনে আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। কারণ, মূল তথ্য না থাকলেও কোনও সরকারি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা ত্রুটি থাকা নিজেই উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

‘হ্যাক’ না হলেও বিপদের ইঙ্গিত স্পষ্ট
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঘটনাকে হয়তো পূর্ণাঙ্গ সাইবার হামলা বলা যাবে না। কিন্তু অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ থাকা মানেই নিরাপত্তা কাঠামোয় দুর্বলতা রয়েছে।
তাঁদের মতে, কোনও সিস্টেমে তথ্য চুরি হয়েছে কি না, সেটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হল, সেখানে প্রবেশের রাস্তা আদৌ খোলা ছিল কি না। যদি সেই সুযোগ থাকে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অবশেষে নিরাপত্তা ত্রুটির কথা স্বীকার
ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত সিবিএসই স্বীকার করে যে পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার প্ল্যাটফর্মে কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। যদিও বোর্ডের দাবি, কোনও সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়নি এবং সমস্যাগুলি দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
এছাড়াও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সরকারি প্রযুক্তি সংস্থা এবং আইআইটি-র বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে বোর্ড।

লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর তথ্য কতটা সুরক্ষিত?
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে তথ্য সুরক্ষা। ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র, নম্বর, পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক নথি সংরক্ষিত থাকে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য প্রশ্নও অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সাইবার নিরাপত্তা কর্মীদের একাংশের মতে, এই ঘটনা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা
পুরো ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি শুধু সিবিএসই-র সমস্যা নয়। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ভর্তি থেকে পরীক্ষা, মূল্যায়ন থেকে ফলপ্রকাশ—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।

ফলে ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক এড়াতে শুধু সফটওয়্যার তৈরি করলেই হবে না, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা এক অর্থে বড় বিপদ ঘটার আগের সতর্কবার্তা। এখন দেখার, সেই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিস্টেম কতটা শক্তিশালী করা যায়।

ব্ল্যাক টাউন-হোয়াইট টাউন: যে কলকাতাকে ভাগ করেছিল ব্রিটিশরা

ক্ষমতা ছিল চৌরঙ্গিতে, প্রাণ ছিল শোভাবাজারে! দুই কলকাতার বিস্মৃত ইতিহাস

আজকের কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় নেই, এই শহর এক সময় আসলে দু’টি আলাদা জগতে বিভক্ত ছিল। একটি ছিল ক্ষমতার, অন্যটি জীবনের। একটি ছিল সাহেবদের ‘হোয়াইট টাউন’, অন্যটি দেশীয়দের ‘ব্ল্যাক টাউন’। একই শহরের বুকে পাশাপাশি থেকেও যেন তারা ছিল দুই ভিন্ন পৃথিবী।

হোয়াইট টাউন

সেদিনের রাইটার্স বিল্ডিং। ছবি – Google

আঠারো শতকের কলকাতা দ্রুত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। সেই সঙ্গে গড়ে উঠছিল এক অদৃশ্য প্রাচীর। ইউরোপীয় ব্যবসায়ী, সেনা ও প্রশাসনিক কর্তারা নিজেদের জন্য বেছে নিলেন শহরের দক্ষিণ ও মধ্যাংশ। চৌরঙ্গি, এসপ্ল্যানেড, ডালহৌসি স্কোয়ার এবং ফোর্ট উইলিয়াম সংলগ্ন এলাকা হয়ে উঠল তথাকথিত ‘হোয়াইট টাউন’।

সেই কলকাতার ছবি ছিল একেবারেই আলাদা। প্রশস্ত রাস্তা, সারি সারি বৃক্ষ, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, ইউরোপীয় ধাঁচের প্রাসাদোপম অট্টালিকা, ক্লাব, চার্চ ও সরকারি দফতর—সব মিলিয়ে যেন ব্রিটেনেরই এক টুকরো উপনিবেশ। এই অঞ্চলই ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতা, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু।

ব্ল্যাক টাউন

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমারটুলি। ছবি – Google

অন্যদিকে শহরের উত্তরাংশে স্পন্দিত হচ্ছিল এক ভিন্ন কলকাতা। শোভাবাজার, বাগবাজার, চিৎপুর, সুতানুটি, জোড়াসাঁকো কিংবা কুমোরটুলি—এই অঞ্চলগুলিই ছিল ‘ব্ল্যাক টাউন’। এখানে বাস করতেন বাঙালি, মারোয়ারি, আর্মেনীয়, চৈনিক ও অন্যান্য দেশীয় সম্প্রদায়ের মানুষ। সরু গলি, জমজমাট বাজার, পাড়াভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক আবহে তৈরি হয়েছিল এই কলকাতার নিজস্ব চরিত্র।

ব্রিটিশদের চোখে ব্ল্যাক টাউন ছিল অপরিকল্পিত, অগোছালো এবং জনাকীর্ণ। বহু ইউরোপীয় পর্যটকের ভ্রমণকাহিনিতে এই অঞ্চলকে ‘নেটিভ কোয়ার্টার’ বা দেশীয়দের এলাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সেই তথাকথিত ‘অগোছালো’ এলাকাতেই জন্ম নিচ্ছিল বাংলার নবজাগরণের বীজ।

শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গোৎসব, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, বাগবাজারের নাট্যচর্চা, চিৎপুরের ছাপাখানা, কুমোরটুলির শিল্পসাধনা—সবকিছু মিলিয়ে ব্ল্যাক টাউনই হয়ে উঠেছিল কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই পরে উঠে এসেছেন সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদদের এক দীর্ঘ প্রজন্ম, যাঁরা বদলে দিয়েছিলেন বাংলা ও ভারতের ইতিহাস।

আসলে কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এখানেই। যে অঞ্চলকে ব্রিটিশ শাসকরা ‘হোয়াইট টাউন’-এর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত, শেষ পর্যন্ত সেই ব্ল্যাক টাউনই গড়ে তুলেছিল শহরের প্রকৃত পরিচয়। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল দক্ষিণে, কিন্তু আত্মার ঠিকানা ছিল উত্তরে।

আজও সেই অতীতের ছাপ স্পষ্ট। রাজভবন, রাইটার্স বিল্ডিং, সেন্ট জনস চার্চ কিংবা ময়দান ঘিরে থাকা স্থাপত্যে দেখা যায় পুরনো হোয়াইট টাউনের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি, পাড়ার রক, পুরনো বাজার, বারোয়ারি পুজো এবং গলির সংস্কৃতি বহন করে চলেছে ব্ল্যাক টাউনের স্মৃতি।

স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও শহরের নগরচরিত্রে সেই বিভাজনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আজকের সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট এবং হেরিটেজ উত্তর কলকাতার পার্থক্যের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে সেই ঔপনিবেশিক যুগেই।

গ্রে টাউন

কোনও কোনও ইতিহাসবিদ এই সাদা-কালো বিভাজনের মধ্যে একটি গ্রে টাউন বা ধূসর অঞ্চল চিহ্নিত করেন। মূলত বড়বাজার-বউবাজার এলাকা এর আওতায় আসে যেখানে মিশেল ঘটেছে আর্মেনীয়, পার্সি, চৈনিক, ইহুদি নান্রকম সংস্কৃতির -মুছে গেছে সাদা-কালোর বিভেদরেখা।

কলকাতার ইতিহাস তাই শুধু ইট-পাথরের শহরের ইতিহাস নয়। এটি এমন এক নগরীর কাহিনি, যেখানে পাশাপাশি বাস করত দুই কলকাতা—একটি শাসনের, অন্যটি সংস্কৃতির। আর সময়ের বিচারে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে সেই সংস্কৃতির কলকাতাই। কারণ আজও কলকাতাকে সত্যিকারের চিনতে হলে ফিরতে হয় উত্তর কলকাতার পুরনো গলি, বনেদি উঠোন আর শতবর্ষের স্মৃতির কাছে।

জলাজঙ্গল থেকে রাজধানী: তিলোত্তমার অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

কলকাতা। নামটা উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে হাওড়া ব্রিজের ইস্পাতের বিস্ময়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা গাম্ভীর্য, কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধ কিংবা দুর্গাপুজোর আলোর উৎসব। কিন্তু এই শহরকে ঘিরে এক অদ্ভুত পরিহাস লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।

গোড়ার কথা

আজ যে কলকাতা বাংলা তথা পূর্ব ভারতের প্রাণকেন্দ্র, একসময় সেই কলকাতার নাম শুনে মুর্শিদাবাদের নবাবি দরবারে অনেকেই ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করতেন, “কলকাতা? সেটা আবার কোথায়?”সেই সময় বাংলার আকাশে একমাত্র উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিল মুর্শিদাবাদ। নবাবের ক্ষমতা, রাজস্ব আদায়, বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতি— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভাগীরথীর তীরের ঐশ্বর্যশালী সেই নগরী। তার তুলনায় কলকাতা ছিল প্রায় অচেনা এক জনপদ; গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার জলাজঙ্গল ঘেরা তিনটি ছোট গ্রাম— সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা।

নবাবি আমলের অভিজাত সমাজের কাছে এই অঞ্চল ছিল গুরুত্বহীন। জেলে, তাঁতি, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ছিলেম মূল অধিবাসী। রাজনীতি কিংবা প্রশাসনের মানচিত্রে এই এলাকার কোনও উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল না। বাংলার ক্ষমতার অলিন্দে কলকাতার নাম প্রায় অনুচ্চারিতই ছিল।তখনকার কলকাতার চেহারা আজকের নাগরিক কলকাতার সঙ্গে কল্পনাতেও মেলানো কঠিন। চারদিকে কাদামাটি, খাল-বিল, জঙ্গল আর জলাভূমি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যেত। ম্যালেরিয়া ও নানা জলবাহিত রোগ ছিল নিত্যসঙ্গী। ইউরোপীয় নাবিক ও পর্যটকদের বিবরণে এই অঞ্চলকে বলা হয়েছে, “অস্বাস্থ্যকর, কিন্তু সম্ভাবনায় ভরপুর।”

চার্নকের পদার্পণ

তিনশো বছর আগের সুতানুটি-গোবিন্দপুর অঞ্চল। প্রতীকী ছবি – দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

সেই সম্ভাবনাই প্রথম চিনতে পেরেছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৯০ সালে জব চার্নকের আগমনকে ঘিরে কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত অধ্যায় শুরু হয়। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তিনি শহরের প্রতিষ্ঠাতা নন; তাঁর আগেই এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কোম্পানির বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত কলকাতার ভাগ্যরেখা বদলে দেয়।

গঙ্গার গভীর নাব্যতা, সমুদ্রপথের নৈকট্য এবং অভ্যন্তরীণ নদীপথের সুবিধা ইংরেজদের কাছে এই অঞ্চলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। শুরু হয় জঙ্গল কেটে বসতি নির্মাণ। তৈরি হয় গুদামঘর, কুঠি, বাজার, রাস্তা। ১৬৯৮ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে তিন গ্রামের জমিদারি অধিকার লাভ করে কোম্পানি। ধীরে ধীরে বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে কলকাতার।

পলাশী ও তারপর…

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সঙ্গে শুধু এক শাসকের পতন হয়নি; বদলে গিয়েছিল বাংলার ক্ষমতার ভূগোল। মুর্শিদাবাদের জৌলুস ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। অন্যদিকে, যে কলকাতাকে একসময় জলাজঙ্গলের প্রান্তিক গ্রাম বলে তুচ্ছ করা হত, সেই কলকাতাই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শক্তির প্রধান ঘাঁটি।

১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কার্যত প্রশাসনিক রাজধানী কলকাতায় নিয়ে আসেন। এরপর প্রায় দেড়শো বছর ধরে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। এই শহরের রাইটার্স বিল্ডিং, ফোর্ট উইলিয়াম কিংবা গভর্নমেন্ট হাউস থেকেই পরিচালিত হয়েছে উপমহাদেশের বিশাল অংশের প্রশাসন। শুধু প্রশাসন নয়, উনিশ শতকে কলকাতা হয়ে ওঠে ভারতীয় নবজাগরণেরও কেন্দ্র। এখানেই জন্ম নেয় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সংবাদপত্র, সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনা। রাজা রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ- ইতিহাসের অসংখ্য মহীরুহ এই শহরকে ঘিরেই নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

লেগ্যাসি

তাই কলকাতার উত্থান কেবল একটি শহরের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি সময়ের নির্মম পরিহাসেরও গল্প। যে জনপদকে একদিন মুর্শিদাবাদের ক্ষমতাবানরা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, সেই জনপদই পরে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

আজও কলকাতার পুরনো গলি, গঙ্গার ঘাট কিংবা ফোর্ট উইলিয়ামের ছায়াঘেরা প্রাচীর যেন সেই ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়— ক্ষমতার মানচিত্র পরিবর্তনশীল। যে পথ পেরিয়ে তিলোত্তমার এই ‘হয়ে ওঠা’, সে পথের ইতিহাসে মিশে থাকা যে চর্চা, যে অনুভব, আধুনিকতার সমাদর ও বিবর্তনের উজ্জ্বল পটচিত্র – আমরা কি সে লেগ্যাসি বহন করছি আজও?