সপ্তদশ শতকের কলকাতা। শিল্পীর ক্লপনায় প্রতীকী ছবি - ফাইল চিত্র। গ্রাফিক্স: দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস। মূল ছবি - Google
১লা জুন, ২০২৬
কলকাতা। নামটা উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে হাওড়া ব্রিজের ইস্পাতের বিস্ময়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা গাম্ভীর্য, কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধ কিংবা দুর্গাপুজোর আলোর উৎসব। কিন্তু এই শহরকে ঘিরে এক অদ্ভুত পরিহাস লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।
আজ যে কলকাতা বাংলা তথা পূর্ব ভারতের প্রাণকেন্দ্র, একসময় সেই কলকাতার নাম শুনে মুর্শিদাবাদের নবাবি দরবারে অনেকেই ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করতেন, “কলকাতা? সেটা আবার কোথায়?”সেই সময় বাংলার আকাশে একমাত্র উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিল মুর্শিদাবাদ। নবাবের ক্ষমতা, রাজস্ব আদায়, বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতি— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভাগীরথীর তীরের ঐশ্বর্যশালী সেই নগরী। তার তুলনায় কলকাতা ছিল প্রায় অচেনা এক জনপদ; গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার জলাজঙ্গল ঘেরা তিনটি ছোট গ্রাম— সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা।
নবাবি আমলের অভিজাত সমাজের কাছে এই অঞ্চল ছিল গুরুত্বহীন। জেলে, তাঁতি, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ছিলেম মূল অধিবাসী। রাজনীতি কিংবা প্রশাসনের মানচিত্রে এই এলাকার কোনও উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল না। বাংলার ক্ষমতার অলিন্দে কলকাতার নাম প্রায় অনুচ্চারিতই ছিল।তখনকার কলকাতার চেহারা আজকের নাগরিক কলকাতার সঙ্গে কল্পনাতেও মেলানো কঠিন। চারদিকে কাদামাটি, খাল-বিল, জঙ্গল আর জলাভূমি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যেত। ম্যালেরিয়া ও নানা জলবাহিত রোগ ছিল নিত্যসঙ্গী। ইউরোপীয় নাবিক ও পর্যটকদের বিবরণে এই অঞ্চলকে বলা হয়েছে, “অস্বাস্থ্যকর, কিন্তু সম্ভাবনায় ভরপুর।”

সেই সম্ভাবনাই প্রথম চিনতে পেরেছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৯০ সালে জব চার্নকের আগমনকে ঘিরে কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত অধ্যায় শুরু হয়। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তিনি শহরের প্রতিষ্ঠাতা নন; তাঁর আগেই এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কোম্পানির বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত কলকাতার ভাগ্যরেখা বদলে দেয়।
গঙ্গার গভীর নাব্যতা, সমুদ্রপথের নৈকট্য এবং অভ্যন্তরীণ নদীপথের সুবিধা ইংরেজদের কাছে এই অঞ্চলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। শুরু হয় জঙ্গল কেটে বসতি নির্মাণ। তৈরি হয় গুদামঘর, কুঠি, বাজার, রাস্তা। ১৬৯৮ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে তিন গ্রামের জমিদারি অধিকার লাভ করে কোম্পানি। ধীরে ধীরে বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে কলকাতার।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সঙ্গে শুধু এক শাসকের পতন হয়নি; বদলে গিয়েছিল বাংলার ক্ষমতার ভূগোল। মুর্শিদাবাদের জৌলুস ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। অন্যদিকে, যে কলকাতাকে একসময় জলাজঙ্গলের প্রান্তিক গ্রাম বলে তুচ্ছ করা হত, সেই কলকাতাই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শক্তির প্রধান ঘাঁটি।
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কার্যত প্রশাসনিক রাজধানী কলকাতায় নিয়ে আসেন। এরপর প্রায় দেড়শো বছর ধরে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। এই শহরের রাইটার্স বিল্ডিং, ফোর্ট উইলিয়াম কিংবা গভর্নমেন্ট হাউস থেকেই পরিচালিত হয়েছে উপমহাদেশের বিশাল অংশের প্রশাসন। শুধু প্রশাসন নয়, উনিশ শতকে কলকাতা হয়ে ওঠে ভারতীয় নবজাগরণেরও কেন্দ্র। এখানেই জন্ম নেয় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সংবাদপত্র, সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনা। রাজা রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ- ইতিহাসের অসংখ্য মহীরুহ এই শহরকে ঘিরেই নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তাই কলকাতার উত্থান কেবল একটি শহরের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি সময়ের নির্মম পরিহাসেরও গল্প। যে জনপদকে একদিন মুর্শিদাবাদের ক্ষমতাবানরা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, সেই জনপদই পরে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
আজও কলকাতার পুরনো গলি, গঙ্গার ঘাট কিংবা ফোর্ট উইলিয়ামের ছায়াঘেরা প্রাচীর যেন সেই ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়— ক্ষমতার মানচিত্র পরিবর্তনশীল। যে পথ পেরিয়ে তিলোত্তমার এই 'হয়ে ওঠা', সে পথের ইতিহাসে মিশে থাকা যে চর্চা, যে অনুভব, আধুনিকতার সমাদর ও বিবর্তনের উজ্জ্বল পটচিত্র - আমরা কি সে লেগ্যাসি বহন করছি আজও?
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
লেখকের বিস্তারিত তথ্য শীঘ্রই যোগ করা হবে।