

আরজি কর: হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ, সিবিআইয়ের প্রবেশ। গ্রাফিক্স -শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
২৫শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কোনও অপরাধের তদন্তকে ঘিরে যখন জনমনে অবিশ্বাস তৈরি হয়, তখন আদালতই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। আরজি কর-কাণ্ডেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। রাজপথে আন্দোলন, চিকিৎসকদের প্রতিবাদ, পরিবারের প্রশ্ন এবং সামাজিক মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ— সবকিছু মিলিয়ে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল এক বড় অংশের মানুষের মনে। সেই আবহেই কলকাতা হাইকোর্টের একটি নির্দেশ মামলার গতিপথ আমূল বদলে দেয়। তদন্তভার পৌঁছে যায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে।
আরজি কর-কাণ্ডের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। একদিকে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ— সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছিল তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে। এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, মামলার গুরুত্ব এবং জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহের প্রেক্ষিতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
আদালতে শুনানির সময়ও বারবার উঠে আসে মানুষের আস্থার প্রশ্ন। হাইকোর্টের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত৷ শুনানি শেষে কলকাতা হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। তদন্তভার কলকাতা পুলিশের হাত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সিবিআইয়ের হাতে। সেই নির্দেশ কার্যত গোটা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট ছিল, ঘটনাটির গুরুত্ব এবং জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। এই সিদ্ধান্তের পর আন্দোলনকারীদের একাংশ স্বস্তি প্রকাশ করলেও, অন্য অংশের বক্তব্য ছিল— তদন্ত সংস্থা বদলালেই হবে না, সত্য সামনে আসতে হবে।
তদন্তভার হাতে পেয়েই সিবিআইয়ের বিশেষ দল কলকাতায় পৌঁছয়। প্রথম কয়েক দিনেই তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল নতুন করে পরিদর্শন করেন। যে সেমিনার রুম থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়েছিল, সেটি আবার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল তথ্য। সিবিআইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত নতুন করে পুনর্গঠন করা। কারণ, তদন্তকারীদের মতে, সত্যের কাছে পৌঁছতে হলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ যাচাই করা জরুরি।
কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায় তখন ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে। সিবিআই তাঁকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তাঁর মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি ছিল, ঘটনাস্থলের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের একাধিক প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু জনমনের একাংশের প্রশ্ন তখনও একই ছিল— তিনি কি একাই?
সিবিআই তদন্ত শুরু করার পর আবার সামনে আসে কিছু পুরনো বিতর্ক। ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী হয়েছিল? পরিবারের কাছে কেন বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছেছিল? কেন হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য নিয়ে এত বিতর্ক তৈরি হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তকারীদের নজর ধীরে ধীরে হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকার দিকে ঘুরতে শুরু করে।
এই সময়েই আরজি কর হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, ঘটনার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে একাধিক অসঙ্গতি ছিল। যদিও সন্দীপ ঘোষ বারবার দাবি করেন, তিনি নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন। তবু জনমনে সন্দেহ কমছিল না। সিবিআইও হাসপাতালের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।
আরজি কর-কাণ্ড তখন আর শুধুমাত্র বাংলার একটি অপরাধ তদন্ত নয়। দেশের বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন বিষয়টি নিয়ে সরব হয়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এই মামলা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণ করে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে জাতীয় স্তরে একটি টাস্ক ফোর্সও গঠন করা হয়। এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দেয় যে আরজি কর-কাণ্ড আর শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সিবিআই তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে প্রশ্নও।
ঘটনার আগে এবং পরে কারা কী ভূমিকা নিয়েছিলেন? তদন্তের প্রথম পর্যায়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভুল হয়েছিল কি? কোনও প্রমাণ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল কি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়েই তদন্তকারীরা আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দিকে নজর দিতে শুরু করেন।
'সন্দীপ ঘোষ, অভিজিৎ মণ্ডল এবং প্রমাণ লোপাটের ছায়া'
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
