

প্রতীকী চিত্র। ছবি - AI
৮ই আগস্ট, ২০২৬
পিঠ বাঁচাতে কাপুরুষদের জোট, নাকি টালমাটাল বিশ্ব রাজনীতিতে মারকাটারি মাস্টার স্ট্রোক? তিন সুন্নি মুসলমান প্রধান দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সামরিক সমঝোতাকে কী নামে অভিহিত করা হবে তা নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত রাজনৈতিক মহল।
ঠিক একদিন আগে সৌদি আরবের জেড্ডায় মক্কা ট্রিটি বা মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। এই চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ পরস্পর পরস্পরের আত্মরক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ এই তিন দেশের মধ্যে কোনও একটি দেশ আক্রান্ত হলে বা কোনও দেশ তাকে আক্রমণ করলে বাকি অপর দুই দেশ সেই আক্রমণকে তার নিজের উপর হওয়া আক্রমণ বলে বিবেচনা করবে। যার ফলশ্রুতিতে তিন দেশ একসঙ্গে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানের নামবে।
সহজ উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বোঝা যাক- মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে সেটা আমরা সকলেই জানি ইজরায়েল ও আমেরিকা হাতে হাত মিলিয়ে ইরানকে আক্রমণ করছে। ইরান পাল্টা ইজরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বন্ধু দেশ বাহরিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব ইত্যাদি দেশে যে সকল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা সরঞ্জাম আছে সেগুলোকে টার্গেট করে মিসাইল ছুঁড়ছে। এবার ধরুন সুনির্দিষ্টভাবে সৌদি আরবকে আক্রমণ করল ইরান। সে ক্ষেত্রে মক্কা চুক্তি অনুযায়ী সেই আক্রমণকে পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের নিজেদের উপর হওয়া আক্রমণ বলে বিবেচনা করবে। এর ফলে পাকিস্তান ও তুরস্ক যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানকে প্রতিরোধ করবে বা পাল্টা আক্রমণ করবে। এইটা হল চুক্তির সাধারণ নির্যাস।
পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সেনাবাহিনী অন্যতম শক্তিশালী। তাদের কাছে আমেরিকার অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমানগুলোর বেশিরভাগই আছে। অপরদিকে তুরস্ক সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে তাদের চালকবিহীন যুদ্ধ ড্রোন এই মুহূর্তে ওই ক্যাটাগরিতে বিশ্বের সেরা বলে পরিচিত। ফলে এই তিন মুসলিম অধ্যুষিত দেশ সামরিকভাবে জোটবদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
এমনই সামরিক সমঝোতা চুক্তি কিছু মাস আগেই প্রথম সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে হয়েছিল। বলা যেতে পারে তুরস্ক সেই চুক্তিতে তৃতীয় সহযোগী হিসেবে যোগ দিয়েছে। এই চুক্তি আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় 'সুন্নি ন্যাটো জোট' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পাকিস্তান আর সৌদি আরব ঘোষিতভাবেই ইসলামী রাষ্ট্র হলেও, তুরস্ক সেটা নয়। কিন্তু রিসেপ তায়েপ এরদোগানের শাসনামলে তুরস্কের ইসলামিকরণ অনেকটাই ঘটে গিয়েছে।
এর আগে এই চুক্তিতে যখন শুধু পাকিস্তান আর সৌদি আরব ছিল, ঠিক সেই সময়ই ইরানের হাতে সৌদি আরব একাধিকবার আক্রান্ত হয়। তখন দেখা গিয়েছিল, পাকিস্তান কিছু বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কোনও কার্যকরী ভূমিকা নেয়নি। অথচ অনেকেই মনে করেছিলেন চুক্তিকে মর্যাদা দিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সৌদি আরবের পক্ষে ও ইরানের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হবে। যদিও বাস্তবে তেমনটা কিছুই ঘটেনি।
এর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সৌদি আরবের উপর পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই নির্ভরশীল হলেও প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গেও তাকে সুসম্পর্ক রেখে চলতে হবে। তাই যতই চুক্তি থাক না কেন বিপর্যস্ত অর্থনীতির পাকিস্তানের পক্ষে অন্যের হয়ে আরেকটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মতো বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন উঠছে, তুরস্ক যদি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তবে সেই যুদ্ধে পাকিস্তান বা সৌদি আরব আদৌ অংশগ্রহণ করবে তো?
রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঠিক রাখাটা ইসলামাবাদের জন্যই জরুরি। আর তাছাড়া রাশিয়ার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি সৌদি যুবরাজ বিন সালমান বা পাকিস্তান সরকার আদৌ নিতে চাইবে কিনা এই প্রশ্ন সর্বত্র আছে। পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর দেশ ঠিকই, কিন্তু তাদের থেকে অনেক বেশি সংখ্যায় এবং অনেক বেশি আধুনিক মানের পরমাণু বোমা আছে রাশিয়ার কাছে।
অর্থাৎ এই চুক্তি আদতেই মাস্টার স্ট্রোক নাকি গালভরা আন্তর্জাতিক ইভেন্ট বই বেশি কিছু নয়, সেটা সময় বলবে।
অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গিয়েছে, ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর সক্ষমতা পাকিস্তানের থেকে বহুগুণ এগিয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে আবার ভারত-পাক সংঘর্ষ হলে তাতে যদি সৌদি আরব ও তুরস্ক যোগ দেয় তাহলে অবশ্যই নয়া দিল্লির মাথাব্যথা বাড়বে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে তুরস্ক তাদের বৈদেশিক নীতি পরিবর্তন করার পর থেকে দিল্লির সঙ্গে আঙ্কারার সুসম্পর্ক তেমন একটা নেই। বরং বিভিন্ন ইস্যুতে সুযোগ পেলেই সরাসরি ভারতের নাম করে কুৎসিত আক্রমণ করে থাকেন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইপ এরদোগান। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো।
এই অবস্থায় চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি অবশ্যই অনেকটা বেড়েছে। কিন্তু সেটা আদৌ কার্যকরী কিনা তা এত দ্রুত বলা মুশকিল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
