

বাবার সঙ্গে মেসি। ছবি - Google
১৩ই আগস্ট, ২০২৬
বেজিং অলিম্পিকে ভারতকে প্রথম ব্যক্তিগত বিভাগে সোনা এনে দেওয়ার পরে অভিনব বিন্দ্রার সেই কথাটা এখনও কানে ভাসে। মোবাইলে ভারতের সোনার ছেলে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আজ আমি যা হয়েছি, তার জন্য আমার বাবার অবদান ৯০ শতাংশ, বাকিটা আমার চেষ্টা।’’
বিন্দ্রা জানিয়েছিলেন সেদিন, বাবা আমার জন্য জিরাকপুরের বাড়িতে আস্ত একটা শুটিং রেঞ্জ করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি বাড়িতেই ট্রেনিং করো, কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। তবে মনে রেখো, আমার এই কষ্টের দামের একদিন মূল্য দিও। অভিনব বেজিং অলিম্পিকে যখন সোনার পদক গলায় দাঁড়িয়েছিলেন, নিশ্চয়ই সেইসময় বাবার কথা মনে করেছিলেন।
সন্তানের প্রতি বাবাদের নিঃশব্দ আত্মত্যাগ কখনও কখনও ইতিহাস হয়ে যায়। জন্ম নেয় এক বিশেষ রূপকথার। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে তৈরি করার পিছনে যেমন ছিলেন প্রয়াত চণ্ডী গঙ্গোপাধ্যায়। কাস্টমস মাঠের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি, কখন ছেলে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করে উঠবে, সেইসময় তাঁকে ডাবের জল খাওয়াবেন।
বাবারা সন্তানদের মনের মতো কথা হয়তো বলেন না, কিন্তু তাঁদের সংকল্পই থাকে, তাঁর ছেলে কিংবা মেয়ে যেন দেশের দশের একজন হয়। লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসিও তাই চেয়েছিলেন। তাই যখন আর্জেন্টিনার রোজারিও গ্রাম থেকে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে বার্সেলোনায় চলে এলেন ছোট্ট ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তখন আত্মীয় থেকে প্রতিবেশীরা কী বলেননি, একটা রোগাপাতলা ছেলের জন্য দেশই ছেড়ে দিচ্ছ? সিনিয়র মেসি কিছু বলেননি, কিন্তু নিজের মধ্যে একটা বিশ্বাস ছিল, তিনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, একদম সঠিক। একদিন এই ছেলের জন্য আমাদের স্পেন ও আর্জেন্টিনায় দুটি বিলাসবহুল বাড়ি হবে।
হয়েছেও তাই। লিও মেসি কথা রেখেছেন, তিনি দেখিয়েছেন বাবার ওই বিশ্বাসকে কী করে সোনার পাথরবাটিতে বদলে দিতে হয়। তখন এতো ট্রফির ঝলকানি ছিল না। ছিল না ব্যালন ডি'অর পুরস্কারের চমক। এমনকী তাঁর নাম ধরে গর্জে ওঠা কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামও। ছিল কেবল রোজারিও থেকে বার্সেলোনায় আসা এক লাজুক ছেলে - যাঁর চোখে এক আকাশ স্বপ্ন, আর সঙ্গী একজন আদর্শ বাবা। যিনি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে ছেলের স্বপ্নকে ডানা মেলার সাহস দিয়েছিলেন।
হোর্হে মেসি - রোজারিওর লা বাখাদায় যাঁর বেড়ে ওঠা। ইস্পাত কারখানার নির্মম খাঁচায় দিনরাত ঘাম ঝরালেও, তাঁর ভাবনার পুরোটা জুড়ে থাকতো চার সন্তান। বিশেষ করে সেই ছোট্ট ছেলেটি - যাঁকে দেখে চিকিৎসকরা রায় দিয়েছিলেন, ‘‘ওকে নিয়ে এত আশা বাঁধছেন কেন? গ্রোথ হরমোনের অভাবে ভুগছে আপনার ছেলে, ও পারবে না ফুটবল খেলার মতো ধকল নিতে।’’
পৃথিবীর সব সংশয়ের বিপরীতে গিয়ে একা দাঁড়িয়েছিলেন এক আত্মবিশ্বাসী বাবা। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর; ছেলের নতুন ভোরের আশায় সব মায়া পেছনে ফেলে তিনি সপরিবারে চলে গেলেন স্পেনে। মেসি প্রথমবার বিমানে চড়লেন। বিশ্বজয়ের নেশায় পা রাখলেন বার্সেলোনায়। স্পেনের জায়ান্ট ক্লাব বার্সেলোনার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে টানা দুই সপ্তাহ অনুশীলন করার পর ছেলেটার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হল সবাই।
অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যা চিরতরে বদলে দিল ফুটবলের ইতিহাসই। বার্সেলোনার তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর কার্লোস রেক্সাচ মাঠে নামতে দেখলেন লিওকে। চোখের পলকে বুঝে গেলেন, এই ছেলে জন্ম নিয়েছে ইতিহাস লেখার জন্যই। এরপরই খুলতে থাকে প্যানডোরার বক্স ও অবিশ্বাস্য সব কল্পকাহিনী।
২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর, সামান্য এক ন্যাপকিনে সই করে মেসিকে বার্সায় নেওয়ার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দেন রেক্সাচ। সেই দিনের এক চিলতে কাগজে সই হওয়া অতিসাধারণ ছেলেটিই যে একদিন ফুটবলের ঈশ্বর হয়ে উঠবেন, তা কেই বা জানতেন!
বিশ্ব জোড়া কোটি কোটি মানুষ লিওনেল মেসির ভক্ত হওয়ার অনেক আগেই, নিভৃতে একজন মানুষ তাঁকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, বাবা হোর্হে মেসি, না হলে বাবা হারানোর কষ্ট বুকে লালন করে লিও বলে ফেলেন, আমি জানি না, বাবা ছাড়া বাকি জীবনে কী নিয়ে বাঁচব! এতো দ্রুত কেন চলে গেলে আমাকে ছেড়ে? সেই বিশ্ববিখ্যাত ছেলের করুণ আর্তি।
এটি কেবল এক মহাতারকার গল্প নয়। এটি একটি যাত্রা, একটি দূরন্ত স্বপ্ন এবং এক বাবার গল্প - যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বিশ্বাস হারাতে শেখেননি। তাই তো সুযোগ পেলেই পরম ভালোবাসায় বাবার কথা স্মরণ করছেন মেসি। বাবার অপরিসীম প্রজ্ঞা, অসীম ধৈর্য এবং পরিবারের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতাই আজকের পরিণত মেসিকে গড়ে তুলেছে।
সত্যিই তো, কোনো কোনো কিংবদন্তির মহাকাব্যিক গল্প তো কোনো জমকালো মঞ্চ দিয়ে শুরু হয় না। তার সূচনা হয় নিঃশব্দে, পরম মায়ায় বাবার বলা দুটি বাক্যে – তুই তোর মতো এগিয়ে যা, আমি তোর পাশে আছি।
হোর্হে মেসির জীবনের সমাপ্তিতে আজ আবারও ঘুরেফিরে আসছে মেসির প্রতি তাঁর সেই অবিশ্বাস্য দায়বদ্ধতার গল্প। একটি মাত্র সিদ্ধান্ত, একটি কঠিন পদক্ষেপ কীভাবে রোজারিওর এক শীর্ণকায় বালককে স্পেনে নিয়ে গিয়েছিল, আর সেখান থেকে বিশ্বজয়ের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপানোর জেদ থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারের প্রতিটি মোড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল বাবার সেই অমর বাণী – ‘দুনিয়ার আর কে কী বলল আমি জানি না, আমি তোকে বিশ্বাস করি, একদিন তুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবি।’
বিখ্যাত বাবাদের গল্প এমনই হয়, তাঁদের সন্তানদের জন্যই তাঁর ত্যাগ জীবনের শেষে গিয়ে পূর্ণতা পায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
