

অভিপ্রায় বিশ্বাস। ছবি - শুভ্র মুখার্জি
২৯শে আগস্ট, ২০২৬
রাত তখন গভীর। দুর্গাপুরের সুকান্তপল্লির বাড়িগুলো একে একে নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ছোট্ট অভিপ্রায় বিশ্বাসের চোখে তখন ঘুম নেই। তাঁর চোখে একটাই স্বপ্ন, একদিন তিনি ক্রিকেটার হবেন। মাত্র সাত বছর বয়সে দুর্গাপুরের একটি অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেট শেখা শুরু করেন অভিপ্রায়। কিন্তু নিজের শহরে ক্রিকেটের সুযোগ সুবিধা সীমিত ছিল। তাই স্বপ্নকে আরও বড় করতে শুরু হয় দুর্গাপুর থেকে কলকাতার যাত্রা। শনিবার বা রবিবার মানেই ছিল অন্যরকম লড়াই। মাঝরাতে মায়ের সঙ্গে দুর্গাপুর থেকে ট্রেনে উঠতেন অভিপ্রায়। ভোরে পৌঁছে যেতেন হাওড়া স্টেশনে। তারপর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। ঘুম চোখে, শরীরে ক্লান্তি। কিন্তু চোখের সামনে ছিল ক্রিকেটের মাঠ। সেখান থেকে আবার বেরিয়ে পড়া কলকাতার মাঠের উদ্দেশে।
দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় এসে করুণাময়ীর ভিডিওকন অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন শুরু করেন অভিপ্রায়। ছোটবেলা থেকেই ব্যাটিং এবং উইকেটকিপিং দুটোই করতে ভালবাসতেন তিনি। পরপর দু'বছর ভিডিওকন অ্যাকাডেমির হয়ে অম্বর রায় অনূর্ধ্ব ১৩ টুর্নামেন্টে খেলেন। মনে হচ্ছিল স্বপ্নের পথ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই এল এক বিরাট বাধা। করোনার অতিমারি বদলে দিল সবকিছু। বন্ধ হয়ে গেল ক্রিকেট। মাঠে যাওয়া নেই, প্র্যাকটিস বন্ধ, কিন্তু একটা জিনিস বন্ধ হয়নি, সেটি অভিপ্রায়ের স্বপ্ন।
অতিমারি শেষ হওয়ার পর আবার ক্রিকেটে ফিরলেন তিনি। বর্ধমানের হয়ে সিএবি জেলা ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিলেন। বাঁ-হাতি ব্যাটার হিসেবে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। এরপর এল ক্লাব ক্রিকেট। ২০২২ থেকে ২৩ মরশুমে ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলেন অভিপ্রায়। সিএবি অনূর্ধ্ব ১৮ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করলেন। তাঁর পারফরম্যান্স এবার নির্বাচকদের নজরে পড়ল। বাংলার অনূর্ধ্ব ১৬ দলে সুযোগ পেলেন অভিপ্রায়। বাংলার হয়ে তামিলনাড়ুতে প্রস্তুতি সফরে গিয়ে শেষ ম্যাচে করলেন দুর্দান্ত ১৭৯ রান। এরপর আমদাবাদের প্রস্তুতি ম্যাচেও রান পেলেন। সুযোগ এল বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে। কিন্তু শুরুটা ভাল হয়নি। প্রথম দুই ম্যাচে রান পেলেন না অভিপ্রায়।
এরপরেই তাঁর চরিত্রের কাঠিন্য ধরা পড়েছে। গোয়া, হরিয়ানা এবং সৌরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরপর তিন ম্যাচে তিনটি সেঞ্চুরি করলেন অভিপ্রায়। ব্যর্থতার জবাব দিলেন ব্যাট দিয়ে। এর মধ্যেই খেললেন অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেটে। কোচবিহার ট্রফিতে করলেন সাড়ে তিনশোর বেশি রান। একটার পর একটা বয়সভিত্তিক স্তর পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকলেন তিনি। এরপর এল বেঙ্গল টি২০ লিগে খেলার সুযোগ। রশ্মি মেদিনীপুর উইজার্ডসের হয়ে খেললেন অভিপ্রায়। সেখানে পাশে পেলেন বাংলার প্রাক্তন তারকা উইকেটকিপার ঋদ্ধিমান সাহাকে। অভিপ্রায়ের প্রিয় উইকেটকিপারও ঋদ্ধিমান। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পান তিনি। আর ব্যাটিংয়ে তাঁর পছন্দ বিরাট কোহলি।
এরপরে এল সেই মুহূর্ত, যার জন্য এতদিনের পরিশ্রম। বেঙ্গালুরুর সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে ছিলেন অভিপ্রায়। দলীপ ট্রফির কারণে সেখানে ছিলেন বাংলার ক্রিকেটার সূরজ সিন্ধু জয়সওয়ালও। অভিপ্রায় ছিলেন তাঁর ঘরেই। হঠাৎ ফোন এল সৌরাশিস লাহিড়ীর। খবরটা শুনে অভিপ্রায়ের জীবনের একটা বড় স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। খবরটা পাওয়ার পর প্রথমেই বাড়িতে ফোন করেন অভিপ্রায়। দুর্গাপুরের বাড়িতে তখন আনন্দের মুহূর্ত। মা, বাবা, দাদু সবাই খুশি। আর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাঁর দাদু। যে নাতিকে একদিন মাঝরাতে মায়ের সঙ্গে ট্রেনে কলকাতায় যেতে হতো, আজ সেই নাতিই দেশের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের দরজায়।
সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের বিরুদ্ধে ওয়ান ডে এবং লাল বলের ক্রিকেট সিরিজ খেলবে ভারত। মাল্টি ডে সিরিজের দলে সুযোগ পেয়েছেন বাংলার উইকেটকিপার ব্যাটার অভিপ্রায় বিশ্বাস। সামনে এবার অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেটবিশ্বে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত একটি দল। আর সেই দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার অপেক্ষায় বাংলার এক তরুণ ক্রিকেটার। তিনি নিজেও উচ্ছ্বসিত। জানিয়েছেন, ‘‘এদিনের জন্যই এত কঠোর পরিশ্রম করে গিয়েছি। আমার পরিবারের কাছে এই দিনটি অনেককিছু, তাদের জন্যই আমাকে আরও অনেক পথ এগোতে হবে।’’
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
