

লিওনেল মেসি। ছবি - Google
১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আধুনিক ফুটবলে লিওনেল মেসি ছিলেন একজন প্রকৃত অর্থের সিন্ড্রেলা, তিনি মাঠে জীবনের জয়গান গেয়ে গিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন প্রতিভা একজনকে মহান করতে পারে, কিন্তু ভালবাসা একজনকে কিংবদন্তি বানায়। মেসি সেটি পেরেছেন। তিনি দেশের প্রতি এতটাই আনুগত্য পোষণ করেছেন যে জাতীয় দলের জার্সিতে বিদায়বেলায় জানিয়েছেন, আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি আমাকে আর্জেন্টাইন বানিয়েছেন।
৩৯ বছর বয়সেও যিনি দিব্যি ফুটবলকে কথা বলাচ্ছিলেন, সেই মানুষটি দেশের জার্সি থেকে অবসর নেওয়ায় প্রশ্ন একটাই, এত তাড়া কেন দেখালে লিও? এটাই তো ম্যাজিক, এটাই তো সেরা সময়, যেখানে কেউ বলার সাহস পেল না, কেন তুমি সরছ না? ভিয়েনার ঔপন্যাসিক সেন টরবার্গ আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁকে নিয়েও লিখতেন; ‘লিওনেল মেসি যেভাবে ফুটবল খেলেন, কাফকা সেভাবে গল্প লিখতেন।’
ফ্রাঞ্জ কাফকা যেভাবে তাঁর পাঠকদের বারবার এক গোলকধাঁধায় ফেলতেন, জীবনভর ভাবিয়েছেন ‘দ্য ট্রায়াল’ লিখে, কিংবা ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এ যে ধাঁধা তিনি তৈরি করেছেন তা এখনও পাঠকদের ভাবায়। কেন পৃথিবীর দুঃখগুলো নীল না হয়ে লাল হয়, বলতে পারেন! কেন গ্রেগর সামসা আচমকাই এক সকালে বিশালাকার পতঙ্গে পরিণত হল? কেন বয়স বাড়লে বন্ধু হারিয়ে যায়, কিংবা কেন এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে কর্মহীন মানুষ এত মূল্যহীন? কাফকার গল্পে এমন হাজার হাজার প্রশ্নের কোনও জবাব নেই।
এই গোলকধাঁধার পৃথিবীতে ফুটবল মাঠেও এক চিরন্তন ধাঁধার নাম লিওনেল মেসি। ২২ বছরের দীর্ঘ ফুটবল জীবনে মানুষটি ৩৯ বছর বয়সেও এক চিরসবুজ প্রাণ, মাঠের বুকে এখনও টগবগে। আর্জেন্টিনার অবহেলিত রোজারিওর ধুলোমাখা গলি থেকে যে রূপকথার জন্ম হয়েছিল, তা আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় অপার বিস্ময়।
শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি কাটিয়ে বার্সেলোনায় যোগদান, যার একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপার হয়ে উঠেছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামী দলিল। এরপর ক্যাম্প ন্যুর সবুজ ঘাসে লম্বা চুলের, ১৯ নম্বর জার্সি পরা সেই ছেলেটা যখন রোনাল্ডিনহোর পাস থেকে আলতো চিপে কেরিয়ারের প্রথম গোল করলেন, গ্যালারি তখনই ভেবেছিল, এই তো ফুটবল রাজপুত্র এসে গিয়েছেন! ধারাভাষ্যকারদের কন্ঠে বিস্ময়, এ তো ম্যাজিক দেখলাম!
সেই বিস্ময়ের শুরু, তারপর টানা দুই দশক ধরে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ক্রমাগত নাচিয়েছেন। তিনিই যেন ফুটবলের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি! তিনি মাঠে নকশা আঁকতেন, যিনি মাঠে তুলির টান দিয়ে অবয়ব গড়ে তোলেন।
পেপ গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে বার্সায় ‘ফলস নাইন’ হিসেবে মেসি ফুটবলকে দিয়েছিলেন এক নতুন ভাষা। একের পর এক ব্যালন ডি’অর আর ট্রফিতে যখন তাঁর ড্রয়িংরুম ভরে উঠেছিল, সেইসময় সমালোচকরা বলেছিলেন, কী হে, তোমার হাতে বিশ্বকাপ কোথায়! তুমি আর যাইহোক কোনওদিন দিয়েগো মারাদোনা হতে পারবে না। সেই কথায় তিনি ব্যথা পেতেন মনের গভীরে, রক্তাত্মও হতেন।
২০২২ বিশ্বকাপে লিও সেটি করে দেখিয়েছেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই সোনার ট্রফিটার পাশ দিয়ে তাঁর শূন্য চোখে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা পরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬ সালে ডাগআউটে বসে শিশুর মতো কান্না - ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। নিজের দেশের মানুষই তাঁকে পরবাসী বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিল। এও বলেছিল, বন্যেরা বনে সুন্দর, মেসি বার্সেলোনায়! ট্র্যাজেডি না থাকলে পুনরুত্থানের গল্প এত মধুর হতেই পারত না, তাই তিনি অবসর ভেঙে ফিরে এসে সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন।
ব্যর্থতার মেঘ কেটে প্রথম সূর্যকিরণ দেখা দেয় ২০২১ সালে, মারাকানার বুকে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। কিন্তু ফুটবল দেবতা তাঁর জন্য সোনার ডালি সাজিয়ে রেখেছিলেন কাতারে, আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পরে বিশ্বকাপ জিতিয়ে। মেসির হাতে কাপ দেখে মোহিত হয়ে যায় দেশের মানুষ।
সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল, তখন থেকেই শুরু হল ফিনিক্স পাখির মতো এক অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানো। মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই জাদুকরী দূরপাল্লার শট, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পাসের সেই অবিশ্বাস্য জ্যামিতি, ফাইনালে এমবাপ্পের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল শেষে হাতে ট্রফি। লুসেইল স্টেডিয়ামে যখন টাইব্রেকারে শেষ শটটি জালের ভেতর জড়াল, মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাঠের বুকে। সেদিন তাঁর অতি বড় সমালোচকরাও বলেছিলেন, এই মানুষটার হাতেই বিশ্বকাপ মানায়। না হলে সঠিক বিচার হতো না, এটাই তো প্রাপ্তি মেসির।
এবারও সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে মেসি ম্যাজিক দেখেছিল সারা বিশ্ব। সবাই যখন ভাবতে শুরু করেছিলেন, আবারও হয়তো লিওর হাতে বিশ্বসেরা ট্রফি উঠতে চলেছে, সেইসময় তাল কাটল ফাইনালে এসে। এমন করুণ আত্মসমর্পন দেখে ফুটবল দুনিয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল, এ কোন আর্জেন্টিনা দল খেলল? এটা আগে থেকে তৈরি করা কোনও চিত্রনাট্য না তো? মেসি হেরে গিয়েও কেঁদেছিলেন। তিনি তার পরেরদিনই নিজের ডায়েরির পাতায় লিখে ফেলেছিলেন অবসরের কাহিনি। সেটাই প্রকাশ্যে আনলেন আগস্ট মাসের শেষদিন। তাঁর অভিষেক হয়েছিল দেশের জার্সিতে এই আগস্টেই, শেষও করলেন একই মাসে। বিধাতা মনে হয় মেসির জন্য সব স্ক্রিপট আগে থেকে বানিয়ে রাখেন!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
