

লিওনেল মেসি। ছবি - Google
২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ব্রিন্দিস।
এই ছোট্ট শব্দটি স্প্যানিশ ভাষাভাষী দেশগুলির মানুষদের কাছে বিশেষ অর্থবহ। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে। এই গানটি আরও আলোচিত হচ্ছে একটাই কারণে, লিওনেল মেসি সম্প্রতি যে অবসর বার্তা দিয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সেই বার্তার আবহ সুর হিসেবে বাজছিল এই গানটি। এই গানটি আর্জেন্টিনার নামী পপ গায়িকা সোলেদাদ পাস্তোরুত্তির গাওয়া গান, যেটি বর্তমানে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের পছন্দের সঙ্গীত হিসেবেও গন্য হচ্ছে।
মেসির বিদায়ী ভিডিওতে এই গানটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গানের কথাগুলোতে তাঁর জীবনের দীর্ঘ লড়াই, অনেক যুদ্ধ, চড়াই-উতরাই এবং শেষপর্যন্ত সাফল্য প্রাপ্তির গল্পের কথা বলা হয়েছে। গানটি আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে অত্যন্ত আবেগের। মেসির ফুটবল কেরিয়ারের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের যে মহাকাব্যিক যাত্রা, তার সঙ্গে এই গানের সুর ও কথা হুবহু মিলে গিয়েছে। তাই এই গান সুকৌশলে ব্যবহার করেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল রাজপুত্র।
এই গানটি গত কাতার বিশ্বকাপে মেসির সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। ড্রেসিংরুম থেকে মাঠ পর্যন্ত তাঁর সতীর্থরা গানটি সবসময় গাইতেন। সেই পাস্তোরুত্তির গাওয়া ‘ব্রিন্দিস’ গানটিকেই অবসর ঘোষণার মুহূর্তে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের আবেগঘন কোলাজের ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসাবে বেছে নিয়েছেন ফুটবল জাদুকর।
২০০৬ সালে ৭ অক্টোবর একটি কনসার্টে সোলেদাদ প্রথমবার দিয়েগো মারাদোনার সামনে এই গানটি গেয়েছিলেন। গানের কিছু অংশ বদলে দিয়ে তিনি গেয়েছিলেন - দিয়েগোর সঙ্গে এমন একটি রাতের জন্য আমি আমার জীবনও দিয়ে দিতে পারি। তারপর থেকে আর্জেন্টাইনদের কাছে ক্রমশ পছন্দের গান হয়ে উঠতে থাকে ‘ব্রিন্দিস’। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর থেকেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গী হয়ে ওঠে ব্রিন্দিস’।
পরবর্তীকালে সোলেদাদ জানিয়েছেন, আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁকে বলেছিলেন, ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার পর থেকেই এই গান আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রিয় সঙ্গীত হয়ে উঠেছিল। মেসিও নিশ্চিত করেছিলেন, ‘ব্রিন্দিস’ তাঁদের দলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছে।
২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের কয়েক মাস পরে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন মেসি। সেই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডেও তিনি ব্যবহার করেছিলেন এই ‘ব্রিন্দিস’ গানটিকেই। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও তাঁর মননে এই জনপ্রিয় গান। এই গানের ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে বারবার কষ্ট পেয়েও হাল না ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। মেসির জীবন কিন্তু সহজ ছিল না, তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবার পরিজন ছেড়ে বার্সেলোনায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁর বাবা হোর্সে মেসিও পুত্রের সঙ্গে পুরো পরিবার নিয়ে স্পেনের উদ্দেশে পাড়ি দেন। তাঁদের কাছে একেবারেই অজানা ছিল সেই যাত্রাপথ। কী হবে, কী হতে পারে এতকিছু না ভেবেই তাঁরা সমগ্র পরিবার ছোট্ট লিওকে সমর্থন করে গিয়েছিল।
গত সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনটি হাতে লেখা কাগজ আপলোড করেছেন মেসি। সেখানেই ‘বুকে কষ্ট নিয়ে’ বিদায়ের কথা জানিয়েছেন। ইনস্টাগ্রাম বার্তায় নীল-সাদা জার্সি তুলে রাখার কথা জানিয়েছেন আর্জেন্তিনীয় কিংবদন্তি।
গত ২১ বছর ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফুটবল বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু আর সেই জাদু দেখা যাবে না। সে কথা ভেবে চোখে জল ফুটবলভক্তদের। ২০০৫ সালে প্রথম আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন, সেবারও ছিল আগস্ট মাস। আর সেই মাসেই জাতীয় দলের হয়ে না খেলার কথা ঘোষণা করেছেন। কেউ ঘুনাক্ষরে টেরও পায়নি যে বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বাবার মৃত্যুর পরে মেসি একপ্রকার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলার মতো সেই তাগিদ তিনি পাচ্ছেন না। তাই অবসর নিতে দ্বিধা করেননি।
মেসি জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচেই লাল কার্ড দেখেছিলেন। সেখান থেকে ২১ বছর খেলেছেন, জিতেছেন বিশ্বকাপ-সহ বহু ট্রফি। যে আর্জেন্টিনা তাঁর ধমনীতে মিশে গিয়েছিল, সেই দেশের হয়ে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তিনি কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু কঠিন সি্দ্ধান্ত নিতে আগু-পিছু আর কিছু ভাবেননি। মেসির এই যাত্রাপথকে আর বর্ণময় করে গিয়েছে ব্রিন্দিস গানটি, তাই বিদায়ী বার্তাতেও তাঁর পছন্দের গানেই ভেসে গিয়েছেন আবেগের সমুদ্রে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
