

শৈলেন মান্না। ছবি - Google
৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শৈলেন মান্না ভারতীয় ফুটবলের এক কিংবদন্তি। যিনি ১৯৫১ সালে এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মমাস, সেই কারণে স্মরণে-বরণে ফিরছেন সেই প্রবাদপ্রতীম ফুটবলার। দীর্ঘ ফুটবলজীবনে মান্না কোনওদিন লাল কার্ড দেখেননি, অথচ তিনি ছিলেন টাফ ডিফেন্ডার। তাঁর পাশ দিয়ে বিপক্ষের কোনও ফরোয়ার্ড বল নিয়ে বেরিয়ে যাবে, তিনি সেটি চাইতেন না। তাঁদের থামাতে হার্ড ট্যাকল করতেন, কিন্তু তারপরেও রেফারিকে কোনওদিন মান্নাকে লাল কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করতে হয়নি।
শৈলেন মান্না কেন ব্যতিক্রমী, সেটি বোঝা যায় একটি ঘটনায়। তিনি ২০ বছরের ফুটবলজীবনে কোনওদিন টাকা নিয়ে মোহনবাগানে খেলেননি। যা অর্থ রোজগার করেছেন, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় কাজ করেই।
গোষ্ঠপাল তখন নিয়মিত মোহনবাগান মাঠে খেলা দেখতে আসতেন। কেউ তাঁকে বলেছিলেন হাওড়া ইউনিয়নের একটা লম্বা ব্যাক অসাধারণ খেলছে, এমনকী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দলেও আছে৷ গোষ্ঠ পাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে শৈলেন মান্নার খেলা দেখে উমাপতি কুমারকে তাঁর খোঁজ দিয়েছিলেন৷ কুমার খোঁজ এনেছিলেন ছেলেটি আবার ইন্দুর ভাগনে৷ "তাই নাকি! ডাকো ওকে"।
"ইন্দু,ওই লম্বা ছেলেটা তোমার ভাগ্নে? সামনের বছর ও আমাদের হয়ে খেলবে, মনে থাকে যেন! এখন থেকেই ঠিক করে ওকে বুঝিয়ে দিও। আদরের ভাগ্নে খেঁদি (শৈলেন মান্নার ডাকনাম ছিল) মোহনবাগানে খেললে অকালে হারিয়ে যেতে পারে আশঙ্কা ছিল মামার৷ কিন্তু সেইসময় গোষ্ঠ পালের ইচ্ছে মানে আদেশ৷ তাই আর অন্যথা হয়নি, শৈলেন মান্না হয়ে গেলেন মোহনবাগান ফুটবলার৷
সেইসময় বড় দল খেললে পয়সা দেওয়ার চল ছিল না। আসা-যাওয়ার খরচ, আর টুকটাক কিছু বকসিস দিতেন কর্তারা। মান্না প্রতিদিন হাওড়ার ব্যাঁটরা থেকে আসতেন ময়দানে প্র্যাকটিস করতে, হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রাম ধরতেন তিনি। ভাড়া ছিল চার আনা।
একদিন প্র্যাকটিস শেষ করে বাড়ির পথ ধরবেন, সেইসময় তৎকালীন মোহনবাগানের ফুটবল সচিব শঙ্করী প্রসাদ ঘোষাল শৈলেন মান্নাকে ১৩টাকা হাতখরচ দিলেন।
জীবনের প্রথম রোজগার, তাই খুব খুশি হয়ে বাড়িতে ফিরে মামিকে সবটা বললেন মান্না। মামিও খুশিতে ডগমগ, খেঁদি অবশেষে রোজগার করেছে৷ কিন্তু ওদিকে ঘটে গেল আরেক কাণ্ড৷ রাতেই মামি, মামাকে বললেন খেঁদি মোহনবাগান ক্লাব থেকে আজ ১৩ টাকা হাতখরচ পেয়েছে। শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মামা ইন্দুভূষণ৷ বললেন, ‘‘এখনই বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে৷ তুই মোহনবাগান থেকে টাকা নিয়েছিস৷ ছি ছি ছি!’’ বেচারা! শৈলেন মান্না বুঝতে পারছে না কী ভুল করেছেন৷ তাঁর অপরাধ কী? রাতে বাড়িতে বিরাট হইচই হচ্ছে, বেরিয়ে এলেন আরেক মামা ফনিভূষণ৷ তিনি সব শুনে রায় দিলেন ‘‘খেঁদির দোষ কোথায়? ওকে দিয়েছে তো ক্লাব, তাই নিয়েছে৷ ঠিক আছে ওই টাকা কাল ফেরত দিয়ে দেবে৷’’
ভ্যাবাচাকা খাওয়া শৈলেন বুঝতেই পারছে না কী হচ্ছে এসব৷ আদপে কী তাঁর অপরাধ! পরদিন মামাদের রায়ে খেঁদি গেল টাকা ফেরত দিতে, তবে মোহনবাগান সচিব সেদিন টাকা ফেরত নেননি। আর মান্নাও বাকি জীবনে মোহনবাগান থেকে একটিও অর্থ নেননি। এই হল তাঁর পরিবারের অনুশাসন। মোহনবাগানে খেলে তুমি টাকা নেবে? কোনওদিন হবে না, এই ছিল মামাদের আদেশ। মান্নাই মোহনবাগান ক্লাবের প্রথম রত্ন। তাঁকে দিয়ে এই পুরস্কার চালু হয়।
সুরেন্দ্রনাথ কলেজের স্নাতক শৈলেন মান্না জিওলজিক্যাল সার্ভেতে বড় পদে কাজ করতেন। ১৯৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকে ভারত প্রথম ম্যাচেই ফ্রান্সের কাছে ১-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল। ভারতের খেলা দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলেন লন্ডনের হাজার হাজার দর্শক। অবাক হয়েছিলেন ‘রাজকুমারী’ এলিজ়াবেথ। রানি তাঁর বোন মার্গারেট এবং স্বামী ফিলিপকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন মাঠে। কথিত রয়েছে, রানি এলিজ়াবেথ নাকি শৈলেন মান্নার পা ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তা সত্যিকারের রক্তমাংসের পা কিনা। বেঁচে থাকতে মান্না এই কথা গর্বের সঙ্গে সব অনুষ্ঠানে বলতেন।
শৈলেন মান্না শতাব্দীর সেরা ভারতীয় ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন। একটি ঘটনা ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আসামের গুয়াহাটি প্রেস ক্লাব তাঁকে সংবর্ধনা দেবে৷ সংগঠকরা দুটি বিমানের টিকিট পাঠিয়েছিলেন, একটি মান্নার জন্য, অন্যটি মান্নার স্ত্রী আভার জন্য। তো মান্না যথাসময়ে গুয়াহাটিতে সংবর্ধনা নিতে গেলেন, সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিনী আভাও। তাঁর গুয়াহাটি যাওয়ার আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল, সেটি কামাখ্যা মন্দির দর্শন, কোনওদিন সেটি দেখেননি আভা। সংগঠকদের গিয়ে মান্নার স্ত্রী জানালেন, কেন তাঁদের জন্য দুটি বিমানের টিকিট পাঠানো হয়েছে? তিনি তো ঘুরতে এসেছেন স্বামীর সঙ্গে। তিনি ওই একটি বিমানের টিকিটের দাম ফেরত দিয়ে দেন সংগঠকদের। এই ঘটনাতেই প্রমাণ হয়, শুধু মান্নাই নির্লোভ ছিলেন না, তাঁর স্ত্রীও একই ধাতুতে গড়া ছিলেন। সেই কারণেই মৃত্যুর ১৪ বছর পরেও অমলিন তাঁর স্মৃতি, তাঁর কীর্তি। আর এটি থাকবে আগামী একশো বছরেও!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
