

শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ মৌলবাদের প্রতীকী ছবি - AI
৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বৌদ্ধ ধর্মের কথা শুনলেই গড়পড়তা বাঙালির চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক প্রশান্ত ধ্যানমগ্ন মুখাবয়ব। মৈত্রী, করুণা আর নিখাদ অহিংসার শাশ্বত বাণী। যে ধর্মে একটি ক্ষুদ্র প্রাণীকে হত্যা করাও মহাপাপ বলে বিবেচিত হয়, সেখানে যদি শোনেন সেই ধর্মের ধ্বজাধারীরাই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, এমনভাবে মানুষ কাটে যাতে কচুকাটা লজ্জায় পড়ে যাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই যে বিস্ময় তৈরি হয় তার ঘোর কাটা সহজ হয় না! নিজের মধ্যেই কেমন যেন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে দুঃখজনক হলেও এটাই চরম সত্যি।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার ইতিহাস ঘাঁটলে বৌদ্ধ ধর্মের নামে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের গতিপথটা খুব সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়বে। এই উগ্র জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থার বীজ আজ বা গতকাল বোনা হয়নি। ধর্মের নামে অন্য জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার এই উল্লাস সেখানে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা সুপরিকল্পিত এক রাজনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট।
যুগ যুগ ধরে একটি প্রাচীন নির্মম আখ্যানকে হাতিয়ার করে সিংহল, পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। সেই বিতর্কিত রাজনীতির জাঁতাকলে নির্মমভাবে পিষ্ট হয়েছে তামিল হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যালঘুরা। আসল বাস্তবতা হল, শান্তির ধর্ম বলে পরিচিত বৌদ্ধ ধর্মকে ঢাল করে শ্রীলঙ্কায় এক সমান্তরাল মাফিয়া রাজত্ব কায়েম করেছিল উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
সকলের জানা বোঝার সুবিধার জন্য একটা কথা গড়াতেই বলে নেওয়া যাক- শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম গিয়েছিল এই ভারত ভূখণ্ড থেকে। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের পুত্র মহিন্দ ও কন্যা সংঘামিত্রা তৎকালীন সিংহলে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কায় থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে।
তার কিছু সময় পড়ে, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের একটি ঘটনা। প্রাচীন সিংহলের ইতিহাস গ্রন্থ ‘মহাবংশ’-এ ওই সময়কার এক বিখ্যাত ও ভয়াবহ যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। যুদ্ধটি হয়েছিল সিংহলি বৌদ্ধ রাজা দুত্থগামানি (দুতুগেমুনু) এবং অনুরাধাপুরের তামিল হিন্দু রাজা এলারার মধ্যে। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে রাজা এলারা পরাজিত হন। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সম্রাট অশোকের যেমন মানসিক অবস্থা হয়েছিল, সিংহলি রাজা দুত্থগামানি'র কতকটা তেমন পরিস্থিতি হয়। হাজার হাজার তামিল সৈন্যের লাশের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে রাজা দুত্থগামানি প্রবল অনুতপ্ত হন। বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী এই প্রবল নরহত্যার কারণে মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। তখন তাঁর কাছে ছুটে এসেছিলেন একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু। তাঁরা রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে যে কথাটি বলেছিলেন বলে ওই বৌদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে, তা আজকের যুগে দাঁড়িয়ে শুনলে শিউরে উঠবে যে কোনও মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ।
সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রাজাকে বলেছিলেন, এই যুদ্ধে তাঁর নাকি কোনও পাপই হয়নি! কারণ, তিনি নাকি হিসেবমতো মাত্র "দেড় জন" মানুষ হত্যা করেছেন। একজন, যিনি বুদ্ধের শরণ নিয়েছিলেন এবং অন্যজন বৌদ্ধ সংঘের সদস্য। বাকি যেসব তামিল মারা গেছে, তারা বুদ্ধের অনুসারী না হওয়ায় নিছকই "পশু" বা দানব ছিল। অর্থাৎ পরাজিত তামিল হিন্দুদের মানুষ বলেই স্বীকৃতি দিতে রাজি ছিল না বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা!
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, প্রাচীন এই বিকৃত আখ্যানকেই আঁকড়ে ধরে, তাকে সিংহলি বৌদ্ধ মৌলবাদের ভিত্তি নির্মাণে ব্যবহার করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানকার বৌদ্ধ চরমপন্থীরা তাদের যাবতীয় হিংসা, সন্ত্রাসবাদেকে মান্যতা দিয়ে এসেছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করা যে পাপ নয়, বরং ধর্মের স্বার্থে সেটা একটা ‘পুণ্যের কাজ’- বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী এবং সার্বিক এই অমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজেশনের জন্ম দিয়েছিল মহাবংশ। তখন থেকেই সিংহদের বা শ্রীলঙ্কায় একটি অলিখিত নিয়ম কায়েম হয়- এই ভূমি কেবল সিংহলিদের, আর সিংহলি মানেই বৌদ্ধ!
এই দেশেও ঠিক এমনই পথ ধরার চেষ্টা করছে ধর্মীয় মৌলবাদীরা।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই বৌদ্ধ আধিপত্যবাদ ও মৌলবাদকে আরও উস্কে দেন শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ পুনর্জাগরণের তথাকথিত 'পিতা' আনাগারিকা ধর্মপাল। তিনি প্রকাশ্যে মুসলিমদের ‘বিদেশি শোষক’ এবং খ্রিষ্টানদের ‘উচ্ছিষ্ট’ বলে গালিগালাজ শুরু করেন। তাঁর উস্কানিতেই ১৯১৫ সালে শ্রীলঙ্কায় প্রথম বড় ধরনের সিংহলি-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধে।
তবে ধর্মের আড়ালে সংঘের (বৌদ্ধ ভিক্ষু সমাজ) নোংরা রাজনীতি সবচেয়ে বীভৎস রূপ নেয় ১৯৫৯ সালে। সেই বছর শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এস. ডব্লিউ. আর. ডি. বন্দরনায়েককে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘাতক ছিল তালদুওয়ে সোমারামা নামে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। আর এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন কেলানিয়া বৌদ্ধ মঠের প্রধান পুরোহিত মাপিতিগুমা বুদ্ধরকখিত থেরো।
মাপিতিগুমা বুদ্ধরকখিত থেরো'র মতো অতি প্রভাবশালী একজন বৌদ্ধ পুরোহিতের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার মতো ঘটনার পরিকল্পনার কারণ জানলে চমকে উঠতে হয়। এর পেছনে ধর্ম রক্ষার কোনও তথাকথিত মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। ছিল স্রেফ টাকা আর ক্ষমতার লোভ। বুদ্ধরকখিত থেরো একটি শিপিং কোম্পানি খুলেছিলেন এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের কাছে একচেটিয়া চুক্তির দাবি করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বন্দরনায়েক সেই দুর্নীতিতে সায় দেননি। তারই প্রতিশোধ নিতে তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয় ওই প্রভাবশালী বৌদ্ধ পুরোহিত।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ধর্মের আড়ালে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একাংশ আসলেই মাফিয়াতন্ত্রের প্রচলন করেছিল। ধর্মীয় ভক্তির বদলে তাদের কাছে অর্থ, ক্ষমতা আসল বিষয় ছিল।
স্বাধীনোত্তর শ্রীলঙ্কায় তামিলদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের পরিণত করার সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক মনোভাব থেকেই জন্ম হয়েছিল এলটিটিই (LTTE)-এর। তার প্রভাবে দীর্ঘ তিন দশকের এক রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিল দ্বীপ রাষ্ট্রটি। কিন্তু ২০০৯ সালে সেই গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উগ্রপন্থী সিংহলি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে সেখানকার মৌলবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুক ও রাজনীতিবিদদের একাংশ। এর জন্য নতুন একটা ‘শত্রু’ দরকার হয়ে পড়েছিল। তামিল হিন্দুদের মেরুদণ্ড তখন ভাঙা। তাই চরমপন্থীদের নতুন নিশানায় পরিণত হয় শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়।
মৌলবাদীদের নতুন শত্রু খোঁজার তাগিদ থেকে ২০১২ সালে জন্ম নেয় ‘বোদু বালা সেনা’ (BBS) বা বৌদ্ধ শক্তি বাহিনী। নেতা গালাগোদা আত্তে জ্ঞানসারা থেরো নামে এক উচ্চপদস্থ বৌদ্ধ ভিক্ষু। এই সংগঠন প্রথমেই মুসলিমদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করার জন্য দেশজুড়ে ‘হালাল’ বয়কটের ডাক দেয়। ‘ফ্যাশন বাগ’ বা ‘নো-লিমিট’-এর মতো শ্রীলঙ্কার বড় মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে আগুন লাগিয়ে দেয়।
এখানেই শেষ নয়। সাধারণ সিংহলিদের মধ্যে মুসলমান বিদ্বেষ চরম আকারে নিয়ে যেতে মিথ্যা গুজবের আশ্রয় নেয় এই সংগঠনটি। সাধারণ সিংহলিদের মধ্যে প্রচার করে, মুসলিম রেস্তোরাঁগুলোর খাবারে এবং ওষুধের দোকানে এমন রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে, যা খেলে সিংহলি নারী-পুরুষরা চিরতরে বন্ধ্যা হয়ে যাবে। এইভাবে নাকি সিংহলিদের জন্মহার কমিয়ে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠার চক্রান্ত করছে। যাতে এক সময় তারা গোটা দেশটার উপর রাজত্ব করতে পারে!
সন্ন্যাসী হলেও শ্রীলঙ্কার মৌলবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুক এবং তাদের বিভিন্ন সংগঠন ঠিক এভাবেই মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের দাপট, নিজেদের প্রভাব, নিজেদের রাজনীতিকে বারে বারে বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছে। অবশ্য এটা শ্রীলঙ্কার একান্ত ব্যক্তিগত ছবি নয়। ইউরোপ হোক বা আমেরিকা বা আফ্রিকা বা আমাদের ভারত বা প্রতিবেশী বাংলাদেশ, সর্বত্রই যে যেখানে মৌলবাদের পক্ষে তারা ঠিক এভাবেই বারে বারে মিথ্যে এবং হিংসার আশ্রয় নেয় নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে।
২০১২ থেকে ২০২২ এই এক দশক ছিল শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ মৌলবাদের স্বর্ণযুগ। তৎকালীন রাজাপক্ষ সরকারের (প্রথমে মহিন্দা এবং পরে গোতাবায়া রাজাপাক্ষে) নিরঙ্কুশ আনুকূল্যে BBS রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছে।
২০১৪ সালের আলুথগামা দাঙ্গার কথাই ধরা যাক। জ্ঞানসারা থেরোর প্রকাশ্য উস্কানিমূলক ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখানকার মুসলিমদের দোকানপাট, বাড়ি ও মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০১৮ সালে ক্যান্ডির দিগানাতেও। একটি তুচ্ছ ভুতুড়ে কারণ ও ব্যক্তিগত বচসাকে কেন্দ্র করে চরম মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত করা হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই দাঙ্গাগুলো চলাকালীন পুলিশ ও সেনাবাহিনী স্রেফ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। কারণ গেরুয়া পোশাক পরা ভিক্ষুদের গায়ে হাত দিলে রাজাপক্ষদের সিংহলি ভোটব্যাঙ্কে ধস নামত। এক্ষেত্রে জেনে রাখা দরকার, রাজাপক্ষেরা সিংহলি মৌলবাদ ও জাতীয়তাবাদের হাওয়ায় ভর করেই দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে নিজেদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কায়েম করে রাখতে পেরেছিল। ওটাই ছিল তাদের ভোটব্যাঙ্ক।
এই ভিক্ষুরা কতটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তার চরম নিদর্শন মেলে একটি বিচারবিভাগীয় কেলেঙ্কারিতে। গুম হয়ে যাওয়া সাংবাদিক প্রগীথ একনালিগোদার স্ত্রী সান্ধ্য একনালিগোদা তখন আদাল কক্ষে বিচারের আশায় দাঁড়িয়ে। এই ঘটনায় বোদু বালা সেনার প্রতিষ্ঠাতা জ্ঞানসারা থেরো প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু গোটা বিষয়টি নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া যাতে আর না এগোয় তার জন্য এই জ্ঞানসারা থেরো দলবল নিয়ে এজলাসে ঢুকে পড়ে খোদ বিচারকের সামনেই সেই অসহায় নারীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন! এমন ঘটনা আমরা অনেকেই কল্পনাতেও আনতে পারব না।
এই দূর্বিনীত আচরণের পর আদালত অবমাননার দায়ে জ্ঞানসারা থেরোর ছয় মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন বিচারক। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মাইথ্রিপালা সিরিসেনা তাঁকে বিশেষ ক্ষমতাবলে ক্ষমা করে দেন। আর গোতাবায়া রাজাপাক্ষে তো আরও এক ধাপ এগিয়ে, চরমপন্থী এই জ্ঞানসারাকেই ‘এক দেশ, এক আইন’ (One Country, One Law) বিষয়ক প্রেসিডেনশিয়াল টাস্ক ফোর্সের প্রধানের পদে বসিয়েছিলেন। রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাসীদের পুরস্কৃত করে, তখন সংখ্যালঘুদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না।
তবে ইতিহাসের চাকা ঘোরে নিজের নিয়মেই। দুর্নীতির ভারে এবং চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। শুরু হয় ‘আরাগালায়া’ বা সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ। খাদ্যাভাব আর মুদ্রাস্ফীতির আগুন জাতপাত বোঝে না। সেই প্রথম তামিল, মুসলিম ও সিংহলি যুবকেরা এক হয়ে গণআন্দোলনের মাধ্যমে রাজাপক্ষদের গদিচ্যুত করে।
এর চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় ২০২৪ সালের শেষের দিকে। এক অভাবনীয় পালাবদলের সাক্ষী হয় দ্বীপ রাষ্ট্রটি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (NPP) জোটের বামপন্থী নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তাঁর হাত ধরেই শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বৌদ্ধ মৌলবাদীদের কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী দিশানায়েকের সরকার প্রথমেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করার কাজ শুরু করেছে। রাজাপক্ষদের আমলে চরমপন্থী ভিক্ষুরা যে রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি উপভোগ করতেন, তা এখন অতীত। দিশানায়েকের প্রশাসন কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছে, ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়ালে কাউকে রেয়াত করা হবে না। সে গেরুয়া পোশাক পরিহিত কেউ হলেও আইন মেনেই তার বিচার হবে।
চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে ধুঁকতে থাকা দেশকে টেনে তুলতে সব জাতিকে এক সুতোয় বাঁধার নীতি নিয়েছে বর্তমান সরকার। তামিল ও মুসলিমদের হারানো আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। হলে কোনও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতে রাজি নয় তারা।
ফলে যে বোদু বালা সেনার হুঙ্কারে একসময় শ্রীলঙ্কার প্রশাসন কাঁপত, তারা এখন কার্যত অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে গিয়েছে।
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, "শত্রুতা দিয়ে কখনও শত্রুতার অবসান হয় না, মৈত্রীর মধ্য দিয়েই তার অবসান ঘটে।" অথচ তাঁর নামেই শ্রীলঙ্কায় যে ঘৃণার রাজনীতি চলেছে, তা বুদ্ধের দর্শনকেই সবচেয়ে বেশি অপমান করেছে। মহাবংশের যুগ থেকে রাজাপক্ষদের আমল পর্যন্ত ধর্মের এই নগ্ন রাজনৈতিক ব্যবহার একটি কঠিন সত্যকে বারবার মনে পড়িয়ে দেয়- রাষ্ট্রীয় মদত ছাড়া কোনও মৌলবাদই শিকড় গাড়তে পারে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
