

ডিজিটাল যুগে বদলে গিয়েছে স্বাক্ষরতার সংজ্ঞা। প্রতীকী ছবি - AI
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সদ্য আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস গিয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে 'সাক্ষরতা' শব্দটির মর্মার্থ ঠিক কী?
এমনিতে 'সাক্ষরতা' শব্দটা মাথায় এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্লেট-পেন্সিল হাতে নেওয়া কোনও শিশু বা নিরক্ষর মহিলার মুখ। সোশ্যাল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এফেক্ট আরকি। অথবা বয়স্ক শিক্ষার কোনও চেনা বিজ্ঞাপন। নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করার কথা বারবার বলা হয়। কিন্তু যারা অক্ষর চিনেছেন, তাঁদের সকলেও কি আদৌ বর্তমান সময়ের নিরিখে সাক্ষর বলে বিবেচিত হন? হওয়া উচিত?
একটু খেয়াল করলেই চারপাশ থেকে একটা আক্ষেপ শোনা যায়। মানুষ নাকি আজকাল আর পড়ছে না। বইয়ের পাতায় ধুলো জমছে। পড়ার অভ্যাস নাকি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। আদৌ এই কথাগুলো ঠিক?
একটু তলিয়ে ভাবলে কিন্তু অন্য দৃশ্য আপনার-আমার মনোজগতে ফুটে উঠবে। আর তাও হল বিবর্তিত পড়ার ধরণ।
তথ্য বলছে, আমরা আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে প্রতিদিন অনেক বেশি শব্দ পড়ছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোনের স্ক্রিন আনলক করা থেকে এর শুরু। এরপর খবরের পোর্টাল, ফেসবুকের টাইমলাইন, হোয়াটস্যাপের মেসেজ বা এক্স হ্যান্ডেলের ছোট ছোট পোস্ট- সারাদিন ধরে আমাদের চোখ কোনও না কোনও অক্ষরের উপরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। উনিশ শতকের একজন স্কলার সারাদিনে যত শব্দ পড়তেন, আজ একজন সাধারণ চাকরিজীবী তার চেয়ে অনেক বেশি শব্দ স্মার্টফোনের পর্দায় পড়ে ফেলেন। কারণ বর্তমানে পড়ার সুযোগ বা উপায় অনেক বেড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ পড়ছে না, এই অভিযোগটা মোটেও ঠিক নয়।
আসলে আমাদের পড়ার পরিমাণ কমেনি। বদলে গেছে পড়ার ধরনটা। আগে পড়া বলতে বোঝাত একটা বইয়ের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা গল্পের বা প্রবন্ধের গভীরে ডুবে থাকা। অর্থাৎ একটি বই পড়ার মধ্য দিয়ে তার গভীরতা থেকে ভাব, বোধ, অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁড়ে নিয়ে আসতাম আমরা। কিন্তু এখন সেই ধৈর্য আর কোথায়!
মানুষ এখন আর পড়ে না, মূলত 'স্কিম' করে। অর্থাৎ, চোখ বুলিয়ে নেয়। বড় কোনও লেখা দেখলে আমাদের আঙুল আপনাআপনি স্ক্রল করে নিচে নেমে যায়। বেশিরভাগ সময়ই বড় লেখা পড়তে ইচ্ছে করে না। এখন গড়পড়তা মানুষের মধ্যে চাহিদা হল খুব দ্রুত তথ্য আত্তিকরণ করা। রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশের কোনও কবিতার অন্তর্নিহিত রসাস্বাদন করার জন্য যে মানসিক স্থিতি দরকার, আজকের ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততা সেই জায়গাটা কেড়ে নিয়েছে। বিদ্যাপতি বা চণ্ডীদাসের পদাবলি নিয়ে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হওয়ার বদলে আমরা এখন খুঁজি চটজলদি বিনোদন।
সাক্ষরতা মানে এখন আর শুধু নিজের নাম সই করতে পারা নয়। সময় পাল্টেছে। ইউনেস্কো এখন ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর জোর দিচ্ছে। আমরা কোন মাধ্যমে পড়ছি এখন আর সেটা বড় কথা নয়। অডিওবুক বা কিন্ডেল এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, যা পড়া হচ্ছে সেটার কতটা বুঝতে পারছে।
প্রতিদিন ইন্টারনেটে হাজার হাজার ভুয়ো তথ্য, ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়ছে। সেই তথ্যের ভিড় থেকে সঠিকটা চিনে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করাটাই হল আজকের দিনের আসল সাক্ষরতা। একেই বলে ক্রিটিক্যাল লিটারেসি বা সমালোচনামূলক পাঠ। অন্ধের মতো স্ক্রল করে যাওয়া আর সচেতনভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক রয়েছে।
তথ্যের এই স্রোতে আমরা এক নতুন ধরনের সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছি। মানুষ প্রচুর পড়ছে, কিন্তু মনে রাখতে পারছে কতটুকু? মানব মস্তিষ্ক এখন ছোট ছোট তথ্যের টুকরো গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রেখে কিছু উপলব্ধি করা বা গ্রহণ করার ক্ষমতা ক্রমশই কমছে।
তাই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সাক্ষরতা মানে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়। বরং নতুন করে শিখতে হবে, কীভাবে পড়তে হয়। ডিজিটাল পৃথিবীর এই প্রবাহকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। সেটা করা বোকামি হবে। কিন্তু সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পাঠাভ্যাসের গভীরতা যেন হারিয়ে না যায়। খবরের ফিডে চোখ বোলানোর পাশাপাশি দিনে অন্তত কিছুটা সময় তুলে রাখতে হবে নিবিষ্ট পাঠের জন্য। তা সে যে মাধ্যমেই হোক না কেন। তা না হলে আমরা হয়ত শব্দের পর শব্দ পড়েই যাব, কিন্তু তার অর্থ মগজাস্থ হবে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
