১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ছেলেরা রাঁধলে সমাজের ‘বদহজম’ হয় কেন?

রান্নাঘরে পুরুষের প্রবেশ প্রগতির কথা বলে? ছবি - AI

ছেলেরা রাঁধলে সমাজের ‘বদহজম’ হয় কেন?

calender icon 2 ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

রবিবাসরীয় আলসে সকাল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম তেলে সর্ষে আর পাঁচ ফোড়নের মিষ্টি গন্ধ। কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছেন বাড়ির ছেলে—গায়ে এপ্রন, মুখে গুনগুন গান। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই খাবার টেবিল থেকে কিংবা ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে, সাথে হালকা খোঁচা: "ছেলেটাকে শেষমেশ রান্নাবান্নাও করতে হচ্ছে! বউ থাকতেও এই দশা?"

একুশ শতকে ভারতে দাঁড়িয়ে ছবিটা কি চেনা লাগছে? কর্পোরেট দুনিয়ায় নারী-পুরুষের সমতার কথা আমরা যতই চিৎকার করে বলি না কেন, রান্নাঘরের চৌকাঠে পা রাখলেই যেন সেই আধুনিকতার চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করে। স্বামী পরম আগ্রহে রান্নাঘরে ঢুকলে সেই দৃশ্যটা একটা পরিবারের কাছে প্রগতির প্রতীক হওয়ার বদলে আজও হয়ে ওঠে স্ত্রীর বিরুদ্ধে এক অলিখিত ‘চার্জশিট’।

রান্নাঘরে স্বামী, কাঠগড়ায় স্ত্রী

আধুনিক দাম্পত্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসার সামলানোর গল্পটা এখন আর কোনো আশ্চর্য বিষয় নয়। কর্মজীবী দম্পতিদের অনেকেই রান্নাবান্না, বাসন মাজা কিংবা ঘর গোছানোর কাজ ভাগ করে নেন নিজেদের মতো করে। কিন্তু গোল বাঁধে বাইরে থেকে উঁকি দেওয়া সমাজ আর পরিবারের একাংশের নজরদারিতে।

স্বামী যদি শখ করে কিংবা ভালোবেসে স্ত্রীর কাজের চাপ কমাতে রান্নাঘরে ঢোকেন, চারপাশের মানুষ খুব সহজে তা মেনে নিতে পারে না। উল্টে একটা চাপা ফিসফাস তৈরি হয়—"বউটা ছেলেকে বশ করে ফেলেছে", কিংবা "মেয়েটার কোনো সংসারের দায়দায়িত্ব নেই, বরকে খাটিয়ে মারছে।" যে রান্নাটা স্বামীর চোখে স্রেফ একটা দায়িত্ব বা ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া, সমাজের চোখে সেটা হয়ে দাঁড়ায় স্ত্রীর ‘অক্ষমতা’ বা ‘অবহেলা’।

প্রশংসার মাপকাঠি যখন অদ্ভুতভাবে দ্বিমুখী

আরও পড়ুন
যত মাথা কাটবে, স্বর্গে তত দাস পাবে! মিজোদের ভয়ঙ্কর হেড হান্টিং
জিডিপি বৃদ্ধির দাবি কি কেবলই সংখ্যার মারপ্যাঁচ?
মধ্যবিত্তের প্রথম চাকরিতে নিঃশব্দে থাবা বসাচ্ছে AI?
‘কিছু না করা’র নিরাপদ পথে ভারতের আমলারা

আমাদের সমাজে লৈঙ্গিক ভুমিকার নিয়মগুলো বড় অদ্ভুত। একজন পুরুষ যদি মাসে একদিন ডিমের ওমলেট বানান কিংবা ছুটির দিনে মাংস রেঁধে সবাইকে খাওয়ান, তাহলে নিমেষেই তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের ‘রত্ন’ বা ‘আদর্শ স্বামী’। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ছবি দিয়ে ক্যাপশন লেখা হয়—"আমার বর সেরা!"

কিন্তু একই কাজ যখন একজন মহিলা টানা ৩৬৫ দিন সকাল-দুপুর-রাত ক্লান্তিহীনভাবে করে যান, সেটা ধরে নেওয়া হয় তাঁর পরম কর্তব্য। তার জন্য কোনো আলাদা বাহবা থাকে না, থাকে কেবল খুঁত ধরার সুযোগ। উল্টোদিকে, সেই স্বামী যখন নিত্যদিনের স্বাভাবিক রুটিনের অংশ হিসেবে রান্না করতে শুরু করেন, তখনই তিনি হয়ে যান ‘সহানুভূতি পাওয়ার পাত্র’, আর স্ত্রী হয়ে ওঠেন অপরাধী। পুরুষের রান্না করাটা সমাজের কাছে প্রশংসনীয় 'হবি', কিন্তু একজন মহিলার জন্য সেটা বেঁচে থাকার শর্ত—এই অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতিই আজ সম্পর্কের ভেতরের সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।

‘আদর্শ নারী’ কে?

এই বিচার কেবল বাইরে থেকে আসা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ধীরে ধীরে আধুনিক নারীর মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি করে। সারাদিন ল্যাপটপে মাথা গুঁজে কাজ করার পর একজন নারী যখন দেখেন তাঁর স্বামী ক্লান্ত শরীরে রাতের ডিনার বানাচ্ছেন, তখন ভালোবাসা পাওয়ার বদলে স্ত্রীর মনে একটা অদৃশ্য অস্বস্তি কাজ করে। সমাজ ছোটবেলা থেকে যে ‘লক্ষ্মী বউ’ বা ‘আদর্শ নারী’-র সংজ্ঞা মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেই সংস্কারই তাঁকে মনের ভেতর কুড়ে কুড়ে খায়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও অনেক সময় স্বামীদের সেই সাহায্যকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না অনেক নারীই।

হেঁশেল ও লিঙ্গ নিরপেক্ষতা

রান্না করা কোনো লিঙ্গভিত্তিক কাজ নয়; এটা স্রেফ বেঁচে থাকার একটা সাধারণ জীবনদক্ষতা (লাইফ স্কিল)। খিদে যেমন নারী-পুরুষ ভেদাভেদ চেনে না, তেমনই খাবার তৈরির দায়িত্বও কোনো এক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

একটি সংসারের ভিত দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক বোঝাপড়া আর অংশীদারিত্বের ওপর। সেখানে স্বামী যদি রান্না করেন আর স্ত্রী যদি বিল মেটান কিংবা ঘর পরিষ্কার করেন, তাতে কারোর মর্যাদা কমে যায় না। সময় এসেছে এই বন্ধ মানসিকতার দেয়াল ভাঙার। রান্নাঘরে খুন্তি ধরা হাতটা পুরুষের হোক বা নারীর—তা বিচার করার অধিকার বাইরের কারও নেই। হেঁশেল যখন ভালোবাসার সমতায় ভরবে, তখনই হয়তো আমাদের সমাজের আসল প্রগতি ঘটবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য