

সূর্যের আলো শুষে নিয়ে বাড়িকে ঠান্ডা রাখবে রং! ছবি - Google
১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাইরে তীব্র রোদ। ছাদের তাপ যেন ঘরের দেওয়াল বেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ছে। স্বস্তি পেতে এসি চালানো ছাড়া উপায় নেই। আর তাতেই বাড়ছে বিদ্যুতের বিল, বাড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে পৃথিবীর বহু প্রান্তে যখন বাড়ছে তাপপ্রবাহ, তখন এই সমস্যারই অপেক্ষাকৃত সস্তা সমাধান খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। বাড়ির ছাদে এমন রং করা হবে, যা সূর্যের আলো শুষে নিয়ে গরম হওয়ার বদলে অধিকাংশ আলো ফিরিয়ে দেবে মহাশূন্যে। ফলে ঠান্ডা থাকবে বাড়ির পৃষ্ঠ, কমবে এসি-র প্রয়োজনও।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)-এর বিজ্ঞানীরা এমনই একটি নতুন আবরণ তৈরি করেছেন। তাঁদের পরীক্ষামূলক উপাদান সূর্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে পারে। সাধারণ সাদা রং যেখানে প্রায় ৮৪ শতাংশ সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, সেখানে এই নতুন আবরণ আরও এক ধাপ এগিয়ে। মাদ্রিদে চালানো একটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রচলিত সাদা রঙের তুলনায় নতুন আবরণে ঢাকা পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকতে পারে। পরীক্ষাটি অবশ্য এখনও পিয়ার-রিভিউ হয়নি।
এখানেই এই প্রযুক্তির আসল চমক। শুধু সূর্যের আলো ফেরত পাঠানো নয়, আবরণটি নিজের সঞ্চিত তাপও বাইরে বের করে দিতে পারে। পৃথিবীর কোনও বস্তু সাধারণত ইনফ্রারেড বিকিরণের মাধ্যমে তাপ ছাড়ে। নতুন ধরনের ‘রেডিয়েটিভ কোটিং’ সেই তাপ এমন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরণ করে, যা বায়ুমণ্ডল তুলনামূলক ভাবে সহজে পার হতে পারে। অর্থাৎ বাড়ির ছাদ থেকে তাপ সরাসরি মহাকাশের দিকে বেরিয়ে যেতে পারে।
বিষয়টি বোঝার জন্য ছাদকে একটি তাপ-সংগ্রাহক হিসেবে ভাবা যায়। সূর্যের আলো পড়ে ছাদ গরম হয়, সেই তাপ ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে পৌঁছয়। কিন্তু ছাদ যদি সূর্যের অধিকাংশ শক্তিই প্রতিফলিত করে দেয় এবং একই সঙ্গে নিজের তাপ বিকিরণ করে বাইরে পাঠায়, তা হলে তার উত্তপ্ত হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়।
UCL-এর গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে সিলিকা অ্যারোজেল-এর কণা ও একটি বিশেষ পলিমার। অ্যারোজেলকে অনেকটা অত্যন্ত হালকা, স্পঞ্জের মতো পদার্থ বলা যায়। এর কণাগুলি আলোর সঙ্গে এমন ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে যে সূর্যালোকের বড় অংশ শোষিত না হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে উপাদানের রাসায়নিক বন্ধন ইনফ্রারেড তরঙ্গের মাধ্যমে তাপ বাইরে পাঠাতে সাহায্য করে।
এমন প্রযুক্তির প্রয়োজন যে বাড়ছে, তার পিছনে রয়েছে আরও বড় সমস্যা। বিশ্বে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ স্পেস কুলিং বা ঘর ঠান্ডা রাখার কাজে গিয়েছে, ১৯৯০ সালে যা ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। ফলে এসি-নির্ভরতা শুধু বিদ্যুতের বিলের সমস্যা নয়, জলবায়ুর উপরেও চাপ বাড়াচ্ছে। এসি-র মাধ্যমে ঘরের তাপ বাইরে বার হয়, ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে শহরের ছাদগুলি এই প্রযুক্তির বড় ক্ষেত্র হতে পারে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, সূর্যের আলো পড়লে ছাদ বিপুল পরিমাণ শক্তি শোষণ করে। তাই শহরের বিস্তীর্ণ ছাদে এমন প্রতিফলক আবরণ ব্যবহার করা গেলে ভবনের তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুতের প্রয়োজনও কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে শুধু নতুন সাদা রংই নয়, আরও সস্তা পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা চলছে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা এমন একটি সিমেন্ট-ভিত্তিক আবরণ তৈরি করেছেন, যার ভিতরে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ছিদ্র রয়েছে। এই আবরণ বৃষ্টির জল শুষে নেয়। পরে জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় তাপ নিয়ে বেরিয়ে যায়—অনেকটা মানুষের ঘাম শুকিয়ে শরীর ঠান্ডা হওয়ার মতো।
এই পদ্ধতিতে লবণ যোগ করলে আর্দ্র বাতাস থেকেও জলীয়বাষ্প টেনে নেওয়া সম্ভব হয়। পরীক্ষায় ওই সিমেন্ট-ভিত্তিক আবরণ একটি প্রচলিত রেডিয়েটিভ কোটিংয়ের তুলনায় প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ঠান্ডা থাকতে পেরেছে এবং এসি-চালিত ভবনে শক্তি সাশ্রয় হয়েছে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বড় বিষয়, সিমেন্ট সস্তা হওয়ায় এই আবরণের খরচ রেডিয়েটিভ-কুলিং পেইন্টের প্রায় ত্রিশ ভাগের এক ভাগ বলে দাবি গবেষণায়।
এখনও সব প্রযুক্তিই বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে বাজারে ইতিমধ্যেই কয়েকটি ‘রেডিয়েটিভ কোটিং’ আসতে শুরু করেছে। ফলে ভবিষ্যতের লড়াইটা হয়তো শুধু আরও শক্তিশালী এসি তৈরির নয়, এমন ছাদ তৈরিরও, যা গরম শুষে নিয়ে ঘরকে আরও গরম করবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাপপ্রবাহ বাড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও উষ্ণপ্রধান দেশগুলিতে অনেকের পক্ষেই সারাক্ষণ এসি চালানো সম্ভব নয়। সেই জায়গায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে, বাড়তি শক্তি খরচ না করেই ভবন ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তি শুধু বিদ্যুৎ বাঁচানোর কৌশল নয়, আগামী দিনে তা তাপপ্রবাহ মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
