

AI ছবির কতটা মূল্য পরিবেশকে দিতে হচ্ছে জানেন? ছবি - Google
১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের টাইমলাইনে চোখ রাখলেই মনে হচ্ছে সময় যেন চার দশক পিছিয়ে গেছে। চেনা মানুষগুলো হঠাৎ হাজির হচ্ছেন আশির দশকের ফ্যাশনে— ফুলিয়ে তোলা ঝাঁকড়া চুল, ভিন্টেজ জ্যাকেট, চোখে রঙিন চশমা আর ছবিতে রেট্রো ক্যামেরার হালকা হলদেটে আভা। জেন-জি থেকে শুরু করে বলিউড তারকা কিংবা রাজনীতিবিদ— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ম্যাজিকে আশির দশকের নস্টালজিয়ায় গা ভাসাচ্ছেন প্রায় সবাই।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েকটা শব্দ লিখে ‘জেনারেট’ বোতামে চাপ দিলেই চোখের পলকে তৈরি হয়ে যাচ্ছে মনের মতো ছবি। আপাতদৃষ্টিতে এই বিনোদন সম্পূর্ণ নির্দোষ মনে হলেও, ভার্চুয়াল জগতের এই চকচকে পর্দার আড়ালে প্রকৃতিকে চুকাতে হচ্ছে এক অদৃশ্য চড়া মূল্য।
মোবাইলে ছবি পেতে হয়তো কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে, কিন্তু ব্যাকএন্ডে এই কাজটা মোটেই সহজ নয়। একটি ছবি তৈরি করতে এআই-কে কাজ করতে হয় হাজার হাজার শক্তিশালী প্রসেসর সমৃদ্ধ বিশালাকার ডেটা সেন্টারে।
গবেষণা অনুযায়ী, একটি মাত্র এআই ছবি তৈরি করতে প্রায় ০.০১ থেকে ০.২৯ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে। সহজ কথায় বললে, একটি ১০ ওয়াটের এলইডি বাল্ব একটানা প্রায় ১৭ মিনিট জ্বালালে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, একটি সাধারণ এআই পোর্ট্রেট বানাতে খরচ হয় প্রায় সমপরিমাণ শক্তি। টেক্সটভিত্তিক সাধারণ কোনো অনুসন্ধানের চেয়ে এআই ইমেজ তৈরি করতে প্রায় ১,৪৫০ গুণ বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়।
শক্তির পাশাপাশি আসে জলের প্রশ্নও। ডেটা সেন্টারে যখন হাজার হাজার গ্রাফিক্স প্রসেসর বা চিপ দিনরাত কাজ করে, তখন সেখানে তৈরি হয় প্রচণ্ড তাপ। এই বিশাল সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে জলের বড় এক পরোক্ষ ব্যবহার।
গবেষকদের হিসাবে, একটি মাত্র এআই ছবি জেনারেট করার পেছনে বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত যে জলের খরচ জড়িয়ে থাকে, তা হয়তো মাত্র দুই টেবিল চামচের (প্রায় ২৯ মিলি) মতো। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যখন কোটি কোটি ছবি ও ভিডিও তৈরি হচ্ছে, তখন সেই হিসাব আর সামান্য থাকে না। এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এআই-সম্পর্কিত পরিকাঠামোর কারণে বছরে ৪২০ থেকে ৬৬০ কোটি কিউবিক মিটার জল খরচ হতে পারে।
একটা ছবি তৈরি করলে কি পৃথিবীর আকাশ ভেঙে পড়বে? নিশ্চয়ই নয়। আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে এর বহরে (Scale)।
সাধারণত কেউই প্রথম ছবিতেই সন্তুষ্ট হন না। মনের মতো ফ্রেম বা লুক পেতে একজন ব্যবহারকারী পাঁচ থেকে দশটি ছবি জেনারেট করেন। যখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে কোনো ভাইরাল ট্রেন্ডে মেতে ওঠেন, তখন সার্ভারগুলোর ওপর তৈরি হয় পাহাড়প্রমাণ চাপ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪৬০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে— আর এই বৃদ্ধির সিংহভাগ চালিকাশক্তিই হলো এআই।
এআই ছবির পরিবেশগত ছাপ শুধু আপনার স্মার্টফোনে টাইপ করার সময় থেকে শুরু হয় না। ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও প্রসেসর তৈরি করতে প্রয়োজন হয় বিরল খনিজ উপাদান, কোটি কোটি লিটার পরিশোধিত জল এবং জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হাজার হাজার টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-ওয়েস্টের সমস্যা। অর্থাৎ, প্রযুক্তির এই চমক শুরু থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের আপস করে তৈরি।
প্রযুক্তি ক্রমশ উন্নত হচ্ছে এবং প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতাও বাড়ছে। এই প্রতিবেদন এআই পুরোপুরি বর্জন করার কোনো নিদান দিচ্ছে না। প্রযুক্তিকে উপভোগ করায় কোনো বাধা নেই, তবে প্রয়োজন একটু সচেতনতা।
অহেতুক ডজন ডজন ছবি বারবার জেনারেট না করে যদি আমরা একটু ভেবেচিন্তে ব্যবহার করি, তবেই হয়তো প্রযুক্তির আনন্দও বজায় থাকবে, আর পৃথিবীর ওপর অহেতুক বোঝাও কমবে। আর সত্যি বলতে কী, আশির দশকের আসল নস্টালজিয়া পেতে চাইলে বাড়ির পুরোনো অ্যালবামে ধুলো জমা আসল ছবিগুলো উল্টে দেখার রোমাঞ্চ কিন্তু কোনো নিখুঁত অ্যালগরিদম দিতে পারে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
