

খেমার সাম্রাজ্যের ফিমেনাকাস মন্দির। ছবি - Google
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আঙ্কর ভাট (যা বাকি দুনিয়ার কাছে আঙ্কর থম নামে অধিক সমাদৃত) চোখ ধাঁধানো স্থাপত্যের কথা বিশ্বনন্দিত। ৮০২ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেই খেমার সাম্রাজ্য (বেশিরভাগ সময় জুড়েই যার রাজধানী ছিল আঙ্কর ভাট) আজকের কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের কোণায় কোণায় লুকিয়ে আছে এমন কিছু গল্প, যা আজকের দিনে শুনলে রূপকথা বা ভৌতিক কাহিনী বলে মনে হতে পারে।
খেমার সাম্রাজ্যের ইতিহাসের রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় এরকমই একটি লোককথা হল- ফিমেনাকাস (Phimeanakas) মন্দিরের চূড়ায় সর্পদেবীর সাথে রাজার বাধ্যতামূলক নৈশসঙ্গম! তবে এটা শুধু লোককথা ছিল বললে ভুল হবে, বিষয়টি বাস্তবেও ঘটত।
চিনা কূটনীতিক চৌ দাগুয়ান (Zhou Daguan) ১২৯৬ খ্রিষ্টাব্দে খেমার সাম্রাজ্যে গিয়ে পৌঁছন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেই গোটা বিশ্ব সর্পদেবীর সঙ্গে খেমার রাজের এই অদ্ভুত যৌনসঙ্গমের বিষয়টি জানতে পারে। এই সংক্রান্ত বিভিন্ন চিত্র খেমার সাম্রাজ্যের বহু দিকে ছড়িয়ে আছে।
আঙ্কর থম শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত রাজপ্রাসাদের ভেতরে ছিল ফিমেনাকাস মন্দির। আজও এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। তিন ধাপের এই পিরামিড আকৃতির মন্দিরের চূড়ায় ছিল একটি সোনার টাওয়ার বা প্রকোষ্ঠ। চৌ দাগুয়ান লিখে গিয়েছেন, স্থানীয়দের প্রবল বিশ্বাস ছিল ওই প্রকোষ্ঠে একটি নয় মাথাওয়ালা 'নাগ' বা সর্পদেবী বাস করত। রাত হলেই সেই নাগিনী এক অপূর্ব সুন্দরী নারীর রূপ ধরত।
নিয়মটা ছিল কঠোর এবং অদ্ভুত। খেমার রাজাকে প্রতিদিন রাতে তাঁর স্ত্রী বা উপপত্নীদের কাছে যাওয়ার আগে সবার প্রথমে ওই সোনার প্রকোষ্ঠে যেতে হত। সেখানে সেই নাগিনীর সাথে একান্তে রাত কাটাতে হত বা সঙ্গম করতে হত। এটি এতটাই গোপনীয় ছিল যে, ওই নির্দিষ্ট সময়ে প্রধান রানি বা হারেমের কোনও নারীর ফিমেনাকাস মন্দির চত্বরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।
দ্বিতীয় প্রহরে অর্থাৎ মধ্যরাতের পর রাজা সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের রানি বা উপপত্নীদের কাছে যেতেন। খেমাররা বিশ্বাস করত, যদি কোনও রাতে রাজা সেখানে না যান, তবে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত। আর সর্পদেবী যদি কোনও রাতে রূপ ধারণ করে না আসেন, তার মানে হল সাম্রাজ্যের উপর খরা, মহামারী বা ভয়াবহ কোনও বিপর্যয় নেমে আসবে। তারা মনে করত, এই সর্পদেবী ছিল আঙ্কর থমের রক্ষক।
এই প্রথাটি ঠিক কবে থেকে রাজকীয় রীতির অংশ হয়েছিল, তার কোনও বা প্রামাণ্য লিখিত দলিল নেই। দশম শতাব্দীর শেষের দিকে ফিমেনাকাস মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেছিলেন রাজা রাজেন্দ্রবর্মণ (Rajendravarman)। আর একাদশ শতাব্দীর শুরুতে এটি সম্পন্ন করেন রাজা প্রথম সূর্যবর্মণ (Suryavarman I)।
তবে নাগ বা সর্পদেবতার সাথে রাজাদের এই ঐশ্বরিক সম্পর্কের ধারণাটি ফুনান বা প্রাক-খেমার যুগ থেকেই কম্বোডিয়ায় প্রচলিত ছিল। হিন্দু ধর্ম ও স্থানীয় আদিবাসী বিশ্বাসের এক সংমিশ্রণে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল। ফিমেনাকাস মন্দির নির্মাণের পর, প্রথম সূর্যবর্মণ বা তার পরবর্তী কোনও রাজা এটিকে তাদের দৈনন্দিন রাজকীয় রীতির একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেন। তারা নিজেদের 'দেবরাজ' বা ঈশ্বরের মর্ত্যের রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি অলৌকিক কাহিনী মনে হলেও, এর পেছনে ছিল তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক চাল। খেমার বিশ্বাস অনুযায়ী, ওই নাগিনী ছিল সাম্রাজ্যের ভূমির বা মাটির প্রকৃত মালিক এবং আধ্যাত্মিক রক্ষাকর্তা। সাধারণ মানুষকে এটা বোঝানো হত যে, খেমার মাটির এই দেবীর সাথে কেবল রাজারই সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা আছে। ফলে রাজাই যে ওই ভূমির প্রকৃত অধিকারী এবং তার শাসন স্বয়ং ঈশ্বরের দ্বারা অনুমোদিত, সেটা সাধারণ প্রজাদের কাছে সহজেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হত।
এর আরেকটি বড় সুবিধা ছিল। সাম্রাজ্যে কখনও খরা বা বন্যা হলে, সাধারণ মানুষ রাজাকে দোষ দিত না। তারা ভাবত সর্পদেবী হয়ত কোনও কারণে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এতে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যেত। এটি ছিল এক ধরনের 'সেফটি ভালভ'।
খেমার রাজাদের হারেম ছিল অকল্পনীয় বিশাল। প্রায় প্রত্যেক রাজার হারেমে বা অন্তরমহলে তিন থেকে পাঁচ হাজার নারী থাকতেন। প্রধান রানি থেকে শুরু করে হাজার হাজার উপপত্নী এবং দাসী, সবাই রাজার নিজস্ব সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতেন।
এই সর্পদেবীর মিথটি হারেমের নারীদের মধ্যেও রাজার প্রতি একটি ঐশ্বরিক ভয় ও ভক্তি তৈরি করত। তারা বিশ্বাস করত, রাজা কোনও সাধারণ মানুষ নন। তিনি সাক্ষাৎ দেবীর শয্যাসঙ্গী। এই ভক্তি ও ভয় তাদের রাজকীয় অনুশাসনের মধ্যে বেঁধে রাখত।
ইতিহাসবিদরা যুক্তিসঙ্গতভাবেই মনে করেন, সোনার টাওয়ারে কোনও সর্পদেবী ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে খেমার রাজারি সেখানে কী করতে যেতেন?
অনেকের মতে, রাজারা হয়ত সেখানে গভীর রাতে কোনও গোপন তান্ত্রিক আচার পালন করতেন। সেই প্রকোষ্ঠে হয়ত হিন্দু বা বৌদ্ধ কোনও তান্ত্রিক দেবী বা শিবলিঙ্গ ছিল।
আরেকটি চাঞ্চল্যকর তত্ত্ব হল, মন্দিরের পুরোহিতরা হয়ত প্রতিদিন রাতে নতুন কোনও কুমারী মেয়ে বা মন্দিরের অপ্সরাকে সেই প্রকোষ্ঠে পাঠাতেন। এদেরকেই নাগিনীর পার্থিব রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হত। সেক্ষেত্রে এটি ছিল ধর্মের মোড়কে রাজার লালসা চরিতার্থ করার একটি ব্যবস্থা।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দেয়, প্রাচীনকালে ক্ষমতা বজায় রাখতে রাজারে কীভাবে বিভিন্ন অবাস্তব ধার্মিক কাহিনী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিত।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
