

পৃথিবীর পেটেই লুকিয়ে জলভাণ্ডার! ছবি - Google
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পৃথিবীর নীচে কী আছে? যত নীচে নামা যায়, ততই যেন খুলে যায় অজানা এক পৃথিবী। আগ্নেয় শিলা, প্রচণ্ড চাপ, হাজার হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রা! আর তারই মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে বিপুল পরিমাণ জল। এ বার সেই রহস্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন গবেষণায় এমন দু’টি অজানা খনিজের সন্ধান মিলেছে, যেগুলি পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ জল ধরে রাখতে পারে। জায়গাটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৬০ থেকে ২,৯০০ কিলোমিটার নীচে, ম্যান্টল এবং তরল বহিঃকেন্দ্রের সীমান্তের কাছাকাছি। এই অঞ্চলের কিছু অস্বাভাবিক অংশকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ultralow velocity zones’—যেগুলির প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ধন্দ রয়েছে। তবে বিষয়টি কোনও ভূগর্ভস্থ সমুদ্র আবিষ্কারের গল্প নয়। বরং আরও চমকপ্রদ, পৃথিবীর গভীরে থাকা বিশেষ খনিজের রাসায়নিক কাঠামোর মধ্যে জল আটকে থাকতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Geoscience-এ।
পৃথিবীর পৃষ্ঠে সমুদ্র, নদী, হ্রদ! সব মিলিয়ে যে বিপুল জলভাণ্ডার আমরা দেখতে পাই, তার বাইরেও পৃথিবীর গভীরে জল থাকতে পারে, এই ধারণা নতুন নয়। কিন্তু এত গভীরে সেই জল কী ভাবে পৌঁছল? কী ভাবে সেখানে আটকে রইল? আর পৃথিবীর প্রথম দিককার ইতিহাসে এই জলের ভূমিকা কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষকদের নজর ম্যান্টলের গভীর অংশে।
পৃথিবীর ভূত্বকের নীচে রয়েছে ম্যান্টল। তার আরও নীচে তরল বহিঃকেন্দ্র। এই দুইয়ের সীমান্তের কাছে পরিবেশ এতটাই চরম যে সেখানে সাধারণ অবস্থার খনিজ টিকে থাকার কথা নয়। গবেষকদের নতুন পরীক্ষাই সেখানে খুলে দিয়েছে অন্য সম্ভাবনার দরজা।
গবেষণার অন্যতম চমক, নতুন খনিজগুলি তৈরি হতে খুব বেশি জলের প্রয়োজন হয়নি। অত্যন্ত উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রার পরিবেশ তৈরি করে পরীক্ষাগারে নমুনার উপর পরীক্ষা চালানো হয়। এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে diamond anvil cell দুই ক্ষুদ্র হীরের মধ্যে নমুনাকে প্রবল চাপে রেখে লেজারের সাহায্যে উত্তপ্ত করা হয়। এই ভাবে পৃথিবীর গভীর ম্যান্টলের পরিবেশের অনুকরণ করার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা।
সেখানেই তৈরি হয়েছে দু’টি আগে অজানা iron oxyhydroxide খনিজ। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ জল বা হাইড্রোজেন উপস্থিত থাকলেও এই খনিজগুলি স্থিতিশীল হতে পারে। কিছু পরীক্ষায় জলের উপস্থিতি ছিল ০.১ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ, পৃথিবীর গভীরে জল থাকার জন্য সেখানে বিশাল জলাধার বা তরল সমুদ্রের প্রয়োজন নেই। খনিজের গঠনের মধ্যেই বিপুল জল রাসায়নিক ভাবে বন্দি থাকতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর একেবারে প্রাথমিক পর্বের দিকে পরিস্থিতি ছিল আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। তখন পৃথিবী ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। এক সময় তার উপরিভাগে ছিল গলিত শিলার বিশাল স্তর, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘magma ocean’ বা ম্যাগমার সমুদ্র বলে থাকেন।
পৃথিবী ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার সময় বিভিন্ন খনিজ তৈরি হয়। নতুন গবেষণার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেই সময় তৈরি হওয়া লৌহ-অক্সিহাইড্রক্সাইড জাতীয় খনিজ ভারী হওয়ায় ধীরে ধীরে পৃথিবীর গভীর দিকে নেমে যেতে পারে।
তার সঙ্গে নীচে চলে যেতে পারে জলও। অর্থাৎ, আজকের ভূগর্ভস্থ গভীর অঞ্চলে জল থাকার গল্পের শুরু হতে পারে পৃথিবীর জন্মের একেবারে প্রথম অধ্যায়েই।
না, সম্ভবত নয়। এখানেই গবেষণার আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক। ম্যান্টলের পদার্থ যখন ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে আসে, তখন তার উপর চাপ কমে। সেই পরিবর্তনের ফলে গভীরে তৈরি হওয়া কিছু খনিজ ভেঙে যেতে পারে। তখন তাদের মধ্যে রাসায়নিক ভাবে আটকে থাকা জল মুক্ত হতে পারে।
সেই জল আরও উপরের দিকে উঠে শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর জলচক্র শুধু সমুদ্র থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি, এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। তার একটি অতি গভীর, ধীর এবং প্রায় অদৃশ্য ভূতাত্ত্বিক জলচক্রও থাকতে পারে।
জল পৃথিবীর পৃষ্ঠে জীবনের জন্য অপরিহার্য- এ কথা জানা। কিন্তু ম্যান্টলের গভীরেও জলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ম্যান্টলের শিলা কোটি কোটি বছর ধরে খুব ধীরে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহের সঙ্গে পৃথিবীর plate tectonics বা পাত-চলনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর প্লেট টেকটনিক্স পৃথিবীর ভূগঠন, আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুর বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
তাই গভীরে জল কী ভাবে সঞ্চিত হয় এবং কী ভাবে আবার উপরে ফিরে আসে- তা বোঝা মানে শুধু জলের উৎস বোঝা নয়। পৃথিবী কী ভাবে ‘কাজ করে’, সেই রহস্যেরও একটি অংশ বোঝা।
এখানে সাবধান হওয়া জরুরি। ‘পৃথিবীর নীচে সমুদ্র আবিষ্কার’, শুনতে যতটা চমকপ্রদ, গবেষণাটি ঠিক ততটা সরল দাবি করছে না। এখানে কোনও বিশাল ফাঁকা গুহা নেই, যার মধ্যে সমুদ্রের মতো তরল জল জমে আছে। বরং নির্দিষ্ট খনিজের রাসায়নিক কাঠামোর মধ্যে জল বা হাইড্রোজেন আটকে থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
গবেষকেরাও এখনও তার সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেননি। গভীর ম্যান্টলের খনিজগুলি বাস্তবে কতটা জল ধরে রাখতে পারে এবং সেই জল কত দ্রুত আবার পৃথিবীর উপরে ফিরে আসে, এখনও তার উত্তর খোঁজা বাকি।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন খনিজগুলি পৃথিবী কী ভাবে জল পেয়েছে এবং কী ভাবে সেই জল ধরে রেখেছে—এই দীর্ঘদিনের রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
University of Leeds-এর ভূবিজ্ঞানী Alfred Wilson এই আবিষ্কারকে পৃথিবীর জল পাওয়ার ও ধরে রাখার রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, বিশেষ করে এই খনিজগুলিতে মোট কত জল থাকতে পারে এবং সেই জল কত সময় নিয়ে আবার পৃষ্ঠে পৌঁছতে পারে।
Bayreuth University-এর mineral physicist Leonid Dubrovinsky-র পর্যবেক্ষণও তাৎপর্যপূর্ণ, অত্যন্ত সামান্য হাইড্রোজেনের উপস্থিতিই এই অত্যন্ত hydrated iron compounds-কে স্থিতিশীল করতে পারে।
পৃথিবীর জল কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা তত্ত্ব রয়েছে। একটি ধারণা হল, পৃথিবী তৈরির সময় জলসমৃদ্ধ গ্রহাণু বা asteroid-এর মাধ্যমে জলের উপাদান এসেছিল। অন্য একটি ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাথমিক ম্যান্টল তুলনামূলক শুষ্ক ছিল এবং পরে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সেখানে জল ঢুকেছে।
নতুন গবেষণা এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেছে, পৃথিবীর জল শুধু তার পৃষ্ঠের গল্প নয়; গ্রহটির গভীরতম অংশগুলির ইতিহাসের সঙ্গেও তার যোগ থাকতে পারে। আর সেই যোগের কিছুটা হয়তো লুকিয়ে আছে হাজার হাজার কিলোমিটার নীচে, পাথরের শরীরের ভিতরে।
আমরা যে পৃথিবীকে চিনি, তার উপরিভাগটুকুই আসলে আমাদের নাগালের মধ্যে। তার নীচে কয়েকশো কিলোমিটার গেলেই শুরু হয় এমন এক জগত, যেখানে মানুষের পক্ষে সরাসরি পৌঁছনো অসম্ভব। সেই অন্ধকার, প্রচণ্ড চাপ ও তাপের জগতেই হয়তো পৃথিবীর জল, আগ্নেয়গিরি, প্লেট টেকটনিক্স এবং গ্রহটির প্রাচীন ইতিহাসের বহু উত্তর লুকিয়ে আছে।
নতুন দুই খনিজ সেই বন্ধ দরজায় আরও একটি ছোট ফাঁক খুলেছে। পৃথিবীর ভিতরে সমুদ্র নেই, কিন্তু সমুদ্রের মতো বিপুল জলের স্মৃতি হয়তো বন্দি রয়েছে পাথরের শরীরে। আর সেই জল কখনও গভীর থেকে উঠে এসে আগ্নেয়গিরির পথে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের পায়ের নীচের পৃথিবী হয়তো শুকনো নয়। সে জল ধরে রেখেছে, পাথরের শরীরে, কোটি কোটি বছর ধরে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
