

সুখের সময়ে চন্দ্রমোহন ও অনুরাধা বালি। ছবি - Google
১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রাজনীতি আর প্রেম। দুটোতেই প্রবল নেশা। কিন্তু এই দুইয়ের ককটেল যখন তৈরি হয়, তখন তার পরিণতি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে তা ভারতীয় রাজনীতি বারবার দেখেছে। ২০০৮ সালের তেমনই একটি ঘটনা দেশের তাবড় রাজনীতিকদ থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার সকলকে চমকে দিয়েছিল।
ঘটনাটি নিছক এক বিবাহ বহির্ভূত প্রেমের গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মধ্যে ছিল হঠাৎ এক রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, ধর্মান্তর, চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাজনীতির প্রায় শীর্ষাসনে অবস্থান করা থেকে একেবারে তলিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর কাহিনী। এই কাহিনীর কুশীলবদের একাংশ আজও দিব্যি বেঁচে আছেন। এর নায়ক যদি হন হরিয়ানার তৎকালীন উপমুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রমোহন, তবে নায়িকা ছিলেন দুঁদে আইনজীবী অনুরাধা বালি।
চন্দ্রমোহনকে চেনার জন্য তাঁর বাবা ভজনলালকে সবার আগে চিনতে, বুঝতে হবে। ভজনলাল ভারতীয় রাজনীতির এক অতি বর্ণময় চরিত্র। কিন্তু আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁদের পরিচয় একটু ফিকে হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তার জন্যই এই ভূমিকার দিকটি ছুঁয়ে যাওয়াটা জরুরি।
হরিয়ানার রাজনীতিতে ভজনলালকে বলা হত চাণক্য। শুধু হরিয়ানাই নয়, সমগ্র উত্তর ভারতের রাজনীতিতেই তাঁর প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। ভারতীয় রাজনীতিতে 'আয়া রাম গয়া রাম'-এর যে কুখ্যাত সংস্কৃতি আজ দুরারোগ্য ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে, ভোটারদের রায়দানকে অমর্যাদা করে ভূলুণ্ঠিত করছে, তার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন এই ভজনলালই। ১৯৭৯ সালে হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনে জনতা পার্টির টিকিটে জিতে তিনি তাদের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে ভারতীয় রাজনীতিতে আবার ইন্দিরা গান্ধির কামব্যাক ঘটলে ভজনলাল রাতারাতি তাঁর দলের ৩৭ জন বিধায়ককে নিয়ে দলবদল করে কংগ্রেসে যোগ দেন। এর ফলে জনতা পার্টির বদলে তিনি কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী হন। ভোটে না হেরেও রাতারাতি হরিয়ানার ক্ষমতা হারায় জনতা পার্টি। মোট তিনবার হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজীব গান্ধির মন্ত্রিসভায় দেশের কৃষি ও পরিবেশমন্ত্রী হয়েছিলেন ভজনলাল। কিন্তু ২০০৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হরিয়ানায় জেতার পর কংগ্রেস তাঁর বদলে জাঠ নেতা ভূপেন্দের সিংহ হুডাকে মুখ্যমন্ত্রী করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০০৭ সালে ভজনলাল কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং নিজের নতুন দল 'হরিয়ানা জনহিত কংগ্রেস (বিএল)' গঠন করেন। ২০০৯ সালে তিনি এই দলের হয়েই হিসার থেকে লোকসভা সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি এই দলের সভাপতি পদে ছিলেন।
এমন একজন ঝানু রাজনীতিক, যিনি অনায়াসে সরকার ফেলতে বা গড়তে পারতেন, তিনি হয়ত স্বপ্নেও ভাবেননি তাঁর নিজের সাজানো রাজনৈতিক দুর্গ একদিন তাঁরই ছেলের প্রেমের কেলেঙ্কারিতে কলঙ্কিত হয়ে যাবে।
২০০৫ সালে কংগ্রেস ভজনলালকে মুখ্যমন্ত্রী না করলেও, তাঁকে শান্ত রাখতে বড় ছেলে চন্দ্রমোহনকে হুডা মন্ত্রিসভার উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এমনকি ২০০৭ সালে ভজনলাল নিজের আলাদা দল গঠন করলেও বড় ছেলে চন্দ্রমোহন কংগ্রেসই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে হরিয়ানার উপমুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রমোহন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। রাজ্য প্রশাসনে রীতিমত হুলস্থুল পড়ে যায়। পুলিশ যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে, ঠিক তখনই ডিসেম্বরের শুরুতে তিনি জনসমক্ষে আসেন। তবে তিনি আর তখন চন্দ্রমোহন নন, চাঁদ মহম্মদ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর প্রেমিকা অনুরাধা বালি ততদিনে হয়ে গেছেন ফিজা!
চন্দ্রমোহন আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। তাঁর সন্তানও ছিল। হিন্দু আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স না দিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ অপরাধ। তাই আইনি ফাঁদ এড়াতে দু'জনেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিকাহ করেন।
এমন মুচমুচে খবর ঝড়ের গতিতে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য একটি রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রীর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রাতারাতি ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলছেন, এমন নজির ভারতীয় রাজনীতিতে অতীতে ছিল না। ফলে দেশের রাজনৈতিক মহল হতবাক হয়ে যায়। রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তি স্রেফ প্রেমের টানে নিজের ধর্ম, পরিবার এবং পরিচয় বিসর্জন দিচ্ছেন, এমন ঘটনা দেশের রাজনীতিতে সত্যিই বিরল।
কিন্তু এই প্রেমের আয়ু ছিল খুবই সামান্য। রাজনৈতিক চাপ আর পরিবারের রোষানলে পড়ে চন্দ্রমোহন খুব দ্রুত বুঝতে পারেন তিনি কী হারিয়েছেন। ক্ষুব্ধ ভজনলাল প্রকাশ্যেই ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন। এই কেলেঙ্কারি হরিয়ানার মতো রক্ষণশীল রাজ্যে সামগ্রিক দলের উপর ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বুঝেই কংগ্রেস হাইকমান্ড এক মুহূর্ত দেরি না করে চন্দ্রমোহনকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে। সব মিলিয়ে চন্দ্রমোহন ওরফে চাঁদ মহম্মদ একঘরে হয়ে পড়েন। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই নাটকীয় মোড় নেয় ফিজার সঙ্গে সম্পর্ক। ২০০৯ সালের শুরুর দিকেই ফিজাকে ছেড়ে চন্দ্রমোহন হঠাৎ লন্ডনে পাড়ি দেন।
ফিরে এসে টেলিফোনে ফিজাকে তালাক দেন চন্দ্রমোহন। তারপর আবার ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের পুরনো ধর্ম অর্থাৎ হিন্দু ধর্মে ফিরে আসেন তিনি। পুরোনো স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে ক্ষমাও চান। ক্ষুব্ধ ফিজা প্রতারণার মামলা করেন। কিন্তু ২০১২ সালে মোহালিতে নিজের ফ্ল্যাট থেকে রহস্যজনকভাবে ফিজার পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ জানায়, মধ্যপান এবং ডিপ্রেশনের ওষুধ একত্রে সেবন করার কারণে শরীরে কোনও বিষক্রিয়া ঘটে ফিজার মৃত্যু হয়েছে।
তবে এই কেচ্ছার অভিঘাতে চিরতরে শেষ হয়ে যায় চন্দ্রমোহনের রাজনৈতিক কেরিয়ার।
ইউরোপের দিকে তাকালে চন্দ্রমোহন ও অনুরাধা বালির ঘটনাকে খুব একটা অন্যরকম বলে মনে হবে না। নিছকই ব্যক্তিগত জীবনের একটি রঙিন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই যেমন ফ্রান্সে ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ যখন দেশের রাষ্ট্রপতি, তখন তিনি মাঝরাতে স্কুটারে চেপে তাঁর প্রেমিকাদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। বরিস জনসনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলো পাতার পর পাতা লিখেছে। ইতালির সিলভিও বার্লুসকোনির 'বুঙ্গা বুঙ্গা' পার্টির কেলেঙ্কারি তো বিশ্বজুড়ে চর্চিত বিষয়। কিন্তু এদের তো কারোরই রাজনৈতিক কেরিয়ার ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির জন্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়নি।
ইউরোপের মানুষ বা সেখানকার ভোটাররা রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন আর প্রশাসনিক দায়িত্বকে সম্পূর্ণ আলাদা চোখে দেখেন। তাঁদের কাছে নেতার চারিত্রিক স্খলন আর রাজনৈতিক ব্যর্থতা দুটো একেবারেই আলাদা বিষয়।
কিন্তু ভারতবর্ষের মাটির রসায়ন একেবারেই আলাদা। এখানে ভোটাররা তাঁদের যাবতীয় গোঁড়ামিকে সম্বল করে নেতাদের মধ্যে একটি আদর্শ নৈতিক প্রতিমূর্তির সন্ধানে থাকেন। তাই দুর্নীতির দায়ে জেল খাটা নেতাকে এদেশের মানুষ হাসিমুখে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেয়। কারণ দুর্নীতি ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।কিন্তু কোনও রাজনীতিকের জীবনে নারীঘটিত ঘটনা বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সামনে এলে সমাজ সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
চন্দ্রমোহনের রাজনৈতিক কেরিয়ার চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়াটা তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বাবা ভজনলালের বিশাল প্রভাব বা নিজের চারবারের বিধায়ক হওয়ার রেকর্ড, কোনও কিছুই তাঁকে আর রাজনীতিতে ফেরাতে পারেনি। পরিবারের উত্তরাধিকার চিরকালের মতো চলে যায় ছোট ভাইয় কুলদীপ বিষ্ণোইয়ের হাতে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
