

রাজা মহেন্দ্র ও রানি রত্না। ছবি - Google
১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে প্রেম ও তা নিয়ে টানাপড়েন, রাজনীতি এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই প্রেম যখন রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়, তখন তা ইতিহাসের পাতায় পাকাপাকি জায়গা করে নেয়। নেপালের রাজা মহেন্দ্র এবং রানি রত্নার প্রেমকাহিনী ঠিক এমনই এক অধ্যায় ছিল।
সেই প্রেমের পরিণতি সত্যি করতে রাজপরিবারের আভিজাত্য আর রাজনৈতিক সমীকরণের জটিল বাঁকে দাঁড়িয়ে এক নারীকে নিতে হয়েছিল চরম সিদ্ধান্ত। যুবরাজকে বিয়ে করার জন্য নিজের মাতৃত্বের সম্ভাবনাকে চিরতরে বিসর্জন দিয়েছিলেন রত্না! ইতিহাসবিদদের মতে, রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার নিষ্কণ্টক রাখতে এবং একই সঙ্গে প্রেমকে পরিণতি দিতে এই ভয়ঙ্কর আত্মত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।
কাহিনীর শুরুটা হয়েছিল অন্যরকমভাবে। মহেন্দ্র তখন নেপালের যুবরাজ। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ইন্দ্রা রাজ্য লক্ষ্মী দেবী। ইন্দ্রা ছিলেন নেপালের প্রবল পরাক্রমশালী রানা পরিবারের মেয়ে। তখনও নেপালকে রানা পরিবার শাসন করছে। রাজারা তাদের হাতের পুতুল। তেমন সময়েই এই বিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫০ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ইন্দ্রা রাজ্য লক্ষ্মী দেবী হঠাৎই প্রয়াত হন। রেখে যান তিন পুত্র এবং তিন কন্যাকে।
স্ত্রীর মৃত্যুতে যুবরাজ মহেন্দ্র স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু শোকের এই আবহের মাঝেই রাজপ্রাসাদে এক নতুন প্রেমের জন্ম হয়। তিনি গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেন প্রয়াত স্ত্রীর ছোট বোন রত্নাকে। রত্নাও মহেন্দ্রের প্রেমে সাড়া দেন। কিন্তু এই সম্পর্ক মেনে নিতে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না নেপালের রাজপরিবার এবং ১৯৫২ সালে সদ্য গঠিত গণতান্ত্রিক সরকার। ততদিনের রানা পরিবার নেপালের ক্ষমতা হারিয়েছে। তাদের বেশ কোণঠাসা অবস্থা। শুরু হয় এক চরম রাজনৈতিক টানাপড়েন।
নেপালের তৎকালীন রাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী কৈরালা এই বিয়ের প্রবল বিরোধিতা করেন। এবং গোটা কারণটাই ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক, কোনরকম ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের নয়।
নেপালের ইতিহাসে রানা পরিবার ছিল এক আতঙ্কের নাম। ১৮৪৬ সালের রক্তক্ষয়ী 'কোট' হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে নেপালে রানা শাসনের সূচনা হয়েছিল। এরপর টানা ১০৪ বছর ধরে রাজাদের কার্যত বন্দি করে রেখে দেশ শাসন করেছে এই পরিবার। রানা স্বৈরাচারীদের হারেমে ছিল অগণিত বিবাহিত স্ত্রী এবং উপপত্নী। তাদের অবাধ বহুগামিতা, কেচ্ছা এবং দুর্নীতির কাহিনি তখন নেপালের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরপাক খেত।
১৯৫১ সালে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং গণঅভ্যুত্থানের পর রাজা ত্রিভুবন ও নেপালি কংগ্রেস এই রানা স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলেন। তাই সদ্য অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত হওয়া দেশে রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে আবার এক রানা কন্যার প্রবেশ কেউই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। রাজা ত্রিভুবনের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, রত্নার হাত ধরে রানা পরিবার আবার রাজক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করবে।
কিন্তু যুবরাজ মহেন্দ্র তাঁর প্রেমকে পরিণতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন। রত্নাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে তিনি কিছুতেই রাজি ছিলেন না। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক এবং পারিবারিক চাপের মুখে পড়ে তিনি এক চূড়ান্ত পদক্ষেপ করেন। রাজা ত্রিভুবনকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রত্নাকে বিয়ে করতে না দিলে তিনি যুবরাজের পদ ছেড়ে দেবেন। এমনকি ভবিষ্যৎ সিংহাসনের দাবিও তিনি চিরতরে ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
এই একটি ঘোষণায় নেপালের রাজনীতিতে রীতিমত ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। যুবরাজ সিংহাসন ছাড়লে পরবর্তী উত্তরাধিকারী হবেন তাঁর প্রথম পক্ষের জ্যেষ্ঠ পুত্র বীরেন্দ্র। কিন্তু তিনি তখন নিছকই শিশু। সদ্য রানা শাসন থেকে মুক্ত হওয়া এক অস্থির দেশে একজন শিশু রাজাকে সিংহাসনে বসালে যে চরম অরাজকতা তৈরি হবে, তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন রাজা এবং প্রধানমন্ত্রী।
এই পরিস্থিতিতে যুবরাজের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া রাজা ও মন্ত্রিসভার সামনে আর কোনও রাস্তা ছিল না। কিন্তু রানা পরিবার যাতে আর ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য শুরু হয় এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক দরকষাকষি। রাজপরিবার এবং সরকার শেষ পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি দিতে রাজি হয়, তবে চাপিয়ে দেয় এক অমানবিক শর্ত।
ইতিহাসবিদদের রেকর্ড এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক দলিল অনুযায়ী, সরকার শর্ত দেয় যে, রত্নার গর্ভে কোনও রানা রক্তধারী সন্তানের জন্ম হতে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই সন্তান ভবিষ্যতে সিংহাসন দাবি করলে দেশে গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার কেবল মহেন্দ্রের প্রথম পক্ষের সন্তানদের হাতেই সুরক্ষিত রাখতে হবে।
প্রেমের জন্য এই কঠিন শর্ত হাসিমুখে মেনে নেন রত্না। বিয়ের আগেই তিনি স্বেচ্ছায় চিকিৎসকদের ছুরিকাঁচির নিচে নিজেকে সমর্পণ করেন। সন্তান জন্মদানে চিরতরে অক্ষম হওয়ার জন্য তিনি বন্ধ্যাকরণ অস্ত্রোপচার বা স্টেরিলাইজেশন করান। এ একজন নারীর কাছে কতটা যন্ত্রণার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
এক্ষেত্রে একটা বিষয় বলার, মহেন্দ্রর প্রথম পক্ষের তিন পুত্র ও তিন কন্যার দেহেও রানা পরিবারের রক্ত আছে। কারণ তাঁর প্রথম স্ত্রী ইন্দ্রা রানা পরিবারেরই সদস্য ছিলেন। কিন্তু সেটা রানা শাসনের হাত থেকে নেপালের মুক্ত হওয়ার আগের পর্যায়ের ঘটনা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজার ত্রিভুবন মনে করেছিলেন, ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য রত্নাকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে স্বেচ্ছাচারী রানারা। সেখান থেকেই এত জটিলতার শুরু।
১৯৫২ সালে অত্যন্ত গোপনীয়তা এবং সাদামাটা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে মহেন্দ্র ও রত্নার বিয়ে সম্পন্ন হয়। রাজা ত্রিভুবনের আপত্তির কারণে এই বিয়েতে কোনও রাজকীয় জাঁকজমক ছিল না। এমনকি কোনও বিদেশি অতিথিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে এই অপমানের কথা যুবরাজ মহেন্দ্র সম্ভবত ভোলেননি।
১৯৫৫ সালে রাজা ত্রিভুবনের মৃত্যুর পর মহেন্দ্র নেপালের রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসেন। আর তাঁর জেদের ফসল রত্না হন নেপালের রানি। রাজা হওয়ার পরেই মহেন্দ্র যেন তাঁর প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো গণতান্ত্রিক নেতাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তিনি এক আকস্মিক রাজকীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে বরখাস্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী কৈরালাকে কারাবন্দি করেন। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রকে বাতিল করে দিয়ে রাজার পূর্ণ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনেন এবং দেশে একনায়কতান্ত্রিক 'পঞ্চায়েত ব্যবস্থা' কায়েম করেন। যে গণতন্ত্র তাঁর প্রেমের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, রাজা হয়ে তিনি সেই গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
