১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
দেরিতে বিয়ে ও কম সন্তান, বৃদ্ধদের দেশে পরিণত হওয়ার মুখে ভারত?

বয়স্কদের দেশ হয়ে উঠবে ভারত? ছবি - Google

দেরিতে বিয়ে ও কম সন্তান, বৃদ্ধদের দেশে পরিণত হওয়ার মুখে ভারত?

calender icon 2 ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এ দেশের বিপুল তরুণ প্রজন্মকে—যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ। তাত্ত্বিক সমীকরণটি বেশ সরল ছিল: কর্মক্ষম যুবশক্তির প্রাচুর্য দেশকে উৎপাদনের শিখরে পৌঁছে দেবে, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার বিস্ফোরণ ঘটাবে এবং দেশকে উন্নত অর্থনীতির কাতারে দাঁড় করাবে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে সমাজ ও অর্থনীতির অলিন্দে নীরবে ঘটে চলেছে এক আমূল রূপান্তর। ভারতীয়রা আগের তুলনায় অনেক দেরিতে বিয়ে করছেন, এমনকি বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার প্রবণতাও দ্রুত কমছে। সাম্প্রতিক জনতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারত হয়তো ধনী দেশ হওয়ার আগেই বুড়িয়ে যাওয়ার এক আশঙ্কাজনক ফাঁদের মুখে দাঁড়িয়েছে।

চাহিদার চরিত্রবদল ও বিবাহের নয়া ব্যাকরণ

অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের পরিবার-তত্ত্বে পরিবারকে দেখা হতো এক ধরনের ক্ষুদ্র উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে, যেখানে নারী-পুরুষের শ্রমের বিভাজনই ছিল দাম্পত্যের ভিত্তি। কিন্তু আজকের শহুরে ও উচ্চশিক্ষিত ভারতে সেই মডেলের আমূল বদল ঘটেছে। নারীশিক্ষার প্রসার এবং স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রথাগত বিয়ের ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। সরকারি সমীক্ষা বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবিবাহিত থাকার অনুপাত ক্রমাগত বাড়ছে এবং মহিলাদের কার্যকর বিয়ের গড় বয়স বেড়ে দাঁড়িয়েছে চব্বিশের কোঠায়।

আজকের তরুণ-তরুণীদের কাছে বিয়ে স্রেফ সংসার পাতা বা সন্তান উৎপাদনের সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়; বরং সমমনোভাবাপন্ন একজন সঙ্গীর সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়ার উপলব্ধি। শিক্ষা ও আর্থিক স্বাধীনতার এই বিস্তার যখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তখনই বিয়ের গড় বয়স পিছিয়ে যাচ্ছে এবং প্রজনন ক্ষমতার স্বাভাবিক সময়সীমা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের নিচে প্রজনন হার: অশনি সংকেত

পরিসংখ্যানগতভাবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হল দেশের মোট প্রজনন হার বা 'টোটাল ফার্টিলিটি রেট' (TFR)-এর দ্রুত পতন। জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’ ধরা হয় ২.১, অথচ ভারতে জাতীয় গড় ইতিমধ্যেই নেমে এসেছে প্রায় ১.৯-এ। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো তো বটেই, এমনকি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিত ও কর্মসংস্থানে যুক্ত অংশের মধ্যেও এক বা শূন্য সন্তানের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ‘ডাবল ইনকাম, নো কিডস’ (DINK) ধারণা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের একাংশে এখন আর কেবল বিকল্প নয়, সচেতন জীবনযাত্রার অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
ভেঙে যেতে পারে টাটা সন্স? নজিরবিহীন সংঘাতের নেপথ্যে
প্রেমিকাকে বিয়ের জন্য হিন্দু থেকে মুসলিম হন খোদ উপমুখ্যমন্ত্রী!
গৌরব ভাটিয়ার মামলা সৌরভের মূল প্রশ্নকে চাপা দিতে পারবে?

এখানেই লুকিয়ে রয়েছে মূল সংকটটি। পশ্চিমের উন্নত দেশগুলো কিংবা পূর্ব এশিয়ার জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া যখন এই ধরনের জনতাত্ত্বিক পতনের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তাদের মাথাপিছু আয় ছিল আকাশছোঁয়া, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল মজবুত। কিন্তু মাথাপিছু আয়ের নিরিখে ভারত এখনও উন্নয়নশীল বিশ্বের সারিতে দাঁড়িয়ে। ফলে সম্পদ সৃষ্টির চূড়ান্ত সুযোগ কাজে লাগানোর আগেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিতে এই ভাটা ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সামনে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে।

ভোগব্যয় নাকি অতিরিক্ত সঞ্চয়: অর্থনীতির রূপান্তর

ভারতের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় (Domestic Consumption)। পরিবার ছোট হওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা হ্রাসের অর্থ হল—ভবিষ্যতে গৃহস্থালির নিয়মিত ভোগ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা আসতে পারে। সন্তানহীন বা এক সন্তানের পরিবারগুলো নিজেদের অবসর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে ভোগ্যপণ্যে দেদার খরচের চেয়ে আর্থিক সঞ্চয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, একশ্রেণির তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ বা স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ কমিয়ে স্বল্পমেয়াদী বিলাসিতা বা অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক খরচে মন দিচ্ছে। এই ভারসাম্যহীনতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী শিল্পোৎপাদন ও কর সংগ্রহের কাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

বৃদ্ধ সমাজের ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সংকট

ভারতের বৃদ্ধ নাগরিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু তার সমান্তরালে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা, সার্বজনীন পেনশন এবং প্রবীণদের দেখভালের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো এখনও অত্যন্ত দুর্বল। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দাপটে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে পরিবার কাঠামো ভেঙে একাকী হয়ে পড়ছে মানুষ। শ্রমশক্তির জোগান কমলে মজুরি বৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে, যার ফলে উৎপাদন খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাও ভারত হারাতে পারে।

ভারত যখন উন্নত ভারতের স্বপ্ন বুনছে, তখন জনতাত্ত্বিক এই পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যান নয়, বরং এক কঠোর সতর্কবার্তা। কেবল সস্তা শ্রমের ভরসায় আর দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, মহিলাদের কাজের পাশাপাশি পরিবার সামলানোর উপযোগী সামাজিক পরিকাঠামো তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বাস্তবমুখী পদক্ষেপ না নিলে—বিশ্বকে তাক লাগানো ভারতের 'জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ' হয়তো স্বপ্নপূরণের আগেই ইতিহাসের পাতায় পরিণত হবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য