১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ!

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব মস্তিষ্ক স্থাপনের পর। ছবি - Google

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ!

calender icon 2 ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

মানুষের মস্তিষ্ক, বিজ্ঞানের কাছে এখনও সবচেয়ে দুর্বোধ্য রহস্যগুলির একটি। জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের ভিতরের কোষ কী ভাবে বেড়ে ওঠে, কী ভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে, কোন পর্যায়ে গিয়ে ভুলের শুরু হয়- তা সরাসরি পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভবের কাছাকাছি পৌঁছতেই এ বার অভিনব পথ নিলেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের তৈরি মস্তিষ্কের কোষের একটি অংশ বসানো হল ইঁদুরের মস্তিষ্কে। আর সেই মানব কোষ শুধু টিকে থাকল না, ইঁদুরের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগও তৈরি করল।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সের্গিউ পাসকার নেতৃত্বাধীন গবেষকদল এই পরীক্ষা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা Nature-এ। বিজ্ঞানীদের দাবি, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্নায়বিক রোগ বোঝার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি নতুন একটি পরীক্ষামূলক দরজা খুলে দিতে পারে।

মানুষের পুরো মস্তিষ্ক নয়

শুনতে যতটা চমকপ্রদ, বিষয়টি ততটা সরল নয়। বিজ্ঞানীরা কোনও মানুষের মস্তিষ্ক বা সম্পূর্ণ মানব মস্তিষ্ক ইঁদুরের শরীরে বসাননি। মানুষের ত্বক বা রক্তের কোষ থেকে প্রথমে স্টেম সেল তৈরি করা হয়। সেই স্টেম সেল থেকে গবেষণাগারে তৈরি করা হয় ত্রিমাত্রিক brain organoid অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষ ও গঠন অনুকরণ করা একটি ক্ষুদ্র জৈব কাঠামো।

এর পর সেই মানব মস্তিষ্কের টিস্যু সদ্যোজাত জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করা হয়। ইঁদুরগুলির ক্ষেত্রে এমন ভাবে জিনগত পরিবর্তন করা হয়েছিল যাতে তাদের মস্তিষ্কের cerebral cortex এবং hippocampus-এর স্বাভাবিক বিকাশ অনেকটাই বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে সেখানে মানব কোষের বেড়ে ওঠার জন্য জায়গা তৈরি হয়।

তার পরেই চমক

মানব কোষগুলি শুধু জায়গাটি দখল করেই থেমে থাকেনি। কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিস্থাপিত টিস্যু প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে ওঠে এবং তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গার ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ দখল করে নেয় বলে Nature জানিয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মানব কোষগুলি ইঁদুরের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। তাদের স্নায়ু-তন্তু ইঁদুরের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ এমনকি স্পাইনাল কর্ডের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ গবেষণাগারের পাত্রে রাখা একটি ‘মিনি-ব্রেন’ নয়, জীবন্ত প্রাণীর শরীরের ভিতরে মানব স্নায়ুকোষের বিকাশ ও কাজকর্ম পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বুদ্ধিমান ইঁদুর তৈরি হয়নি

এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা। এই পরীক্ষার ফলে কোনও ‘অর্ধেক মানুষ’ বা অতিবুদ্ধিমান ইঁদুর তৈরি হয়নি।

গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, প্রাণীগুলির স্নায়ুতন্ত্র মূলত ইঁদুরেরই। তাদের শরীরে মানুষের cortical tissue রয়েছে, যা বেড়ে উঠে ইঁদুরের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। পরীক্ষায় এমন কোনও প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে মানব টিস্যু ইঁদুরগুলিকে অস্বাভাবিক ভাবে বেশি বুদ্ধিমান করে তুলেছে। তাই ‘human brain mouse’ বা ‘মানুষের মস্তিষ্কের ইঁদুর’ কথাটি আকর্ষণীয় হলেও বৈজ্ঞানিক ভাবে পুরোপুরি যথাযথ নয়। গবেষকেরা এই প্রাণীগুলিকে xenocortical mice বলছেন।

লক্ষ্য অটিজম, মৃগী থেকে ডিমেনশিয়া

এই গবেষণার আসল গুরুত্ব এখানেই। মানুষের মস্তিষ্কের রোগের বড় অংশের শিকড় লুকিয়ে থাকে মস্তিষ্কের বিকাশের একেবারে গোড়ার পর্যায়ে। কিন্তু মানুষের ভ্রূণ বা জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে সেই পর্যায় সরাসরি পরীক্ষা করা যায় না।

আরও পড়ুন
চাঁদ ছিল শুক্রেরও! ‘গিলে’ ফেলেছিল নিজের উপগ্রহ
মোবাইল নয়, ঘুমের আসল শত্রু ‘আলো’!
উটায় ১০০ কোটি টন জলের ‘গোপন ভাণ্ডার’-এর হদিস

নতুন এই মডেলের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মানুষের স্নায়ুকোষ কী ভাবে বেড়ে ওঠে, কী ভাবে অন্য কোষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে এবং জিনগত পরিবর্তনের ফলে সেই প্রক্রিয়ায় কী ধরনের সমস্যা হয়, তা আরও কাছ থেকে দেখতে পারবেন।

গবেষকদের নজরে রয়েছে অটিজম, মৃগী, সিজোফ্রেনিয়া, cerebral palsy এবং frontotemporal dementia-র মতো রোগ। ভবিষ্যতে এই মডেল ব্যবহার করে সম্ভাব্য ওষুধের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা যেতে পারে।

অক্সিজেনের অভাবে মানুষের কোষের কী হয়?

গবেষণায় ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হয়েছে। জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি হলে মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে, বিশেষ করে cerebral palsy-এর সঙ্গে এমন আঘাতের সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষকেরা ইঁদুরগুলির অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেখেন, মানব স্নায়ুকোষে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে। অথচ একই পরিস্থিতিতে ইঁদুরের নিজস্ব স্নায়ুকোষের ক্ষতির ধরন ছিল আলাদা। অর্থাৎ মানুষের স্নায়ুকোষ এবং ইঁদুরের স্নায়ুকোষ একই পরিবেশে থেকেও কী ভাবে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেই পার্থক্য পরীক্ষা করার সুযোগ মিলছে।

ডিমেনশিয়ার ‘সন্দেহভাজন’ কোষও তৈরি

আরও একটি কারণে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিস্থাপিত মানব টিস্যুতে von Economo neuron নামে বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষ তৈরি হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কে পাওয়া এই বিরল কোষগুলি সামাজিক আচরণ ও উচ্চতর মস্তিষ্কীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। একই সঙ্গে frontotemporal dementia-এর মতো কিছু neurodegenerative রোগে এই কোষগুলি বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে গবেষণায় আগ্রহ রয়েছে। অর্থাৎ এত দিন যে ধরনের মানব স্নায়ুকোষকে জীবন্ত শরীরের পরিবেশে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন ছিল, এই মডেল সেই গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে নৈতিক প্রশ্নও সামনে

মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু অন্য প্রাণীর মস্তিষ্কে বসানো, বিষয়টি বৈজ্ঞানিক ভাবে যতটা আকর্ষণীয়, নৈতিক ভাবে ততটাই সংবেদনশীল। ইঁদুরের আচরণে এমন কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, যাতে মানুষের মতো কোনও জটিল বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে—সেই প্রশ্নও উঠেছে।

গবেষকদল এই বিষয়টি মাথায় রেখে স্নায়ুবিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং রোগী-প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে বলে জানিয়েছে। বিজ্ঞানীদের যুক্তি, ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের কোষের পরিমাণ সীমিত এবং মানুষ ও ইঁদুরের বিবর্তনগত দূরত্বও বিপুল। ফলে মানুষের মতো জটিল চেতনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত সীমিত।

তবে একই ধরনের পরীক্ষা যদি ভবিষ্যতে মানুষের আরও কাছাকাছি কোনও প্রাণী, বিশেষ করে বানরের মতো প্রজাতিতে করার কথা ওঠে, তখন নৈতিক প্রশ্ন অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠবে। Nature-এর প্রতিবেদনে এই সম্ভাবনাই বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মানুষের মস্তিষ্ককে বুঝতে ইঁদুরই নতুন জানলা

মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, গবেষণাগারে তৈরি organoid মানুষের মস্তিষ্কের সব বৈশিষ্ট্যকে পুরোপুরি পুনরুত্পাদন করে না, আবার জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে সরাসরি পরীক্ষা করাও সম্ভব নয়। এই দুই সীমাবদ্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন xenocortical mouse মডেলটি একটি সম্ভাব্য সেতু তৈরি করেছে।

এখন দেখার, সেই সেতু দিয়ে বিজ্ঞানীরা কত দূর এগোতে পারেন। যদি এই পদ্ধতির মাধ্যমে অটিজম, মৃগী, cerebral palsy বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের শুরু এবং বিকাশ আরও পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায়, তা হলে আজকের এই অদ্ভুত পরীক্ষা আগামী দিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য