

বিদ্রোহী রানি চূড়ামণির প্রতীকী ছবি - AI
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইতিহাসের পাতায় বাংলার নারীশক্তির কথা উঠলেই রানি ভবানী বা রানি রাসমণিদেথ নাম সবার আগে মনে আসে। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাঢ়বঙ্গে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল, যার কুশীলব ছিলেন এক নারী। তাঁর সেই প্রবল লড়াই ও জেদ সেভাবে জনপ্রিয় ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি। তিনি হলেন মল্লভূমের রানি চূড়ামণি।
এই হিন্দু বিধবা নারী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, বর্ধমানের প্রবল প্রতাপশালী মহারাজা এবং নিজেরই পরিবারের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। রানি চূড়ামণির এই লড়াই নিছক জমিজমার মামলা ছিল না। এটি ছিল স্বাধীন মল্লভূমের অস্তিত্ব রক্ষার এক মরিয়া চেষ্টা।
হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঁকুড়া ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে মল্ল রাজবংশের দাপট ছিল প্রশ্নতীত। কিন্তু আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই গৌরবে ভাটা পড়তে শুরু করে। মল্ল রাজা গোপাল সিংহের সময় ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গিরা হানা দিয়েছিল। তাদের সেই লুঠপাট, অরাজকতায় মল্লভূমের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে যায়।
কিন্তু ধাক্কা সেখানেই থেমে থাকে নি। এরপর পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলার দেওয়ানি লাভ মল্ল সাম্রাজ্যের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দিয়েছিল। কারণ আরও বেশি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য এরপর ব্রিটিশদের নজরে এসে পড়ে কিছুটা প্রান্তিক জঙ্গল ঘেরা এলাকায় থাকা এই রাজ্যের দিকে। ফলে একসময়ের স্বাধীন মল্লভূম পরিণত হয় রাজস্ব শোষণের নতুন চারণভূমিতে।
এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেই রাজপরিবারের অন্দরে শুরু হয় এক কুৎসিত ক্ষমতার লড়াই। তৎকালীন রাজা চৈতন্য সিংহ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং শিল্পানুরাগী গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজা হিসেবে ছিলেন চরম উদাসীন। একের পর এক বিপর্যয়ে রাজ্যের কোষাগার তখন একেবারে শূন্য। অথচ সেই অবস্থাতেও তিনি দেবসেবা আর ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি দানের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর এই এই চরম প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নেন তাঁরই জ্ঞাতি ভাই দামোদর সিংহ।
সিংহাসনের লোভে দামোদর সিংহ'র ষড়যন্ত্র কেবল পরিবারের অন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি সোজা মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে গিয়ে দরবার করেন। পরে ব্রিটিশদের কাছে হাজির হন।
ইংরেজরা বরাবরই সুযোগসন্ধানী ছিল। তাদের সময় পুরনো রাজ্যগুলোতে অধিকার নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব মানেই হল ব্রিটিশদের পা রাখার জায়গা করে দেওয়া। মল্লভূমের ক্ষেত্রেও তাই হয়। দামোদরের আবেদনে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশরা মধ্যস্থতার ছুতোয় আসরে নামে। সুকৌশলে বিষ্ণুপুর এস্টেটকে চৈতন্য ও দামোদরের মধ্যে ভাগ করে দেয়। অর্থাৎ গোড়াতেই তারা প্রাচীন মল্লভূম রাজ্যকে বিভাজিত করে দেয়। সেই সঙ্গে শর্ত চাপায়, রাজত্ব ধরে রাখতে হলে বছর বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মেটাতে হবে। এই দ্বৈত শাসন আর অন্তর্দলীয় কোন্দল মল্লভূমকে পুরোপুরি দেউলিয়া করে দিয়েছিল।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চালু করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং কুখ্যাত সূর্যাস্ত আইন। ইংরেজদের দাবি মতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মেটাতে না পারায়, বিষ্ণুপুরের মতো সুবিশাল এস্টেট কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও সূর্যাস্ত আইনের যাঁতাকলে পড়ে নিলামে উঠতে শুরু করে। বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র সেই সুযোগে নামমাত্র মূল্যে বিষ্ণুপুরের একের পর এক পরগনা কিনে নিতে থাকেন।
এই টালমাটাল সময়েই দামোদর সিংহের অকাল মৃত্যু হয়। তাঁর বিধবা স্ত্রী রানি চূড়ামণিকে সম্পত্তির সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। রাজপরিবারের বাকি সদস্যরা এই পরিস্থিতিতে ভাগ্যের হাতে আত্মসমর্পণ করে অন্দরমহলের অন্ধকারে নিজেদের গুটিয়ে নেন। কিন্তু রানি চূড়ামণি তাঁদের একেবারে উল্টো পথে হাঁটেন।
রানি চূড়ামণি সরাসরি ময়দানে অবতীর্ণ হন। তৎকালীন সময়ের একজন পর্দানশীন বিধবা নারীর পক্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব বোর্ড এবং খোদ সদর দেওয়ানি আদালতে হাজির হয়ে একের পর এক মামলা দায়ের করা চাট্টিখানি কথা ছিল না। ব্রিটিশদের অন্যায্য রাজস্ব নীতি এবং বর্ধমান রাজের চক্রান্তের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এল. এস. এস. ও'ম্যালির লেখা 'বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার' ঘাঁটলে এই আইনি লড়াইয়ের বিশদ প্রমাণ পাওয়া যায়। কোম্পানির সর্বোচ্চ আইনি দফতরে গিয়ে ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এই চেষ্টা সেকালে ছিল কল্পনাতীত এক দুঃসাহস।
তবে রানি চূড়ামণির লড়াইটা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কোম্পানির অতিরিক্ত করের চাপে স্থানীয় কৃষক এবং মল্ল রাজাদের প্রাক্তন সেনানি অর্থাৎ পাইকরা তখন ফুঁসছে। ঐতিহাসিকদের মতে, রানি চূড়ামণি অত্যন্ত সুকৌশলে এই পাইক ও চুয়াড়দের ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন। ১৭৯৮ সালের ভয়াবহ চুয়াড় বিদ্রোহের নেপথ্যে তাঁর এই প্রচ্ছন্ন সমর্থন এক বিরাট অনুঘটকের কাজ করেছিল। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, কোম্পানির ভিত নাড়াতে গেলে শুধু আদালত নয়, জনতার প্রতিরোধও সমান জরুরি।
শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের পক্ষপাতদুষ্ট আইনি ব্যবস্থায় রানি চূড়ামণিকে দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হয়। বিষ্ণুপুর এস্টেট চিরতরে খণ্ডিত হয়ে বর্ধমান রাজের কুক্ষিগত হয়। আইনের দরবারে তিনি হয়ত ন্যায় বিচার পাননি। কিন্তু প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এক নিঃসঙ্গ নারীর এই অসম লড়াই বাংলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
