

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৯৭৬-এর ইংল্যান্ড সফর। ছবি - Google
১লা অক্টোবর, ২০২৬
সিরিজ শুরুর আগে ইংল্যান্ড দলনেতা টনি গ্রেগ বলেছিলেন, “I intend to make them GROVEL.” বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘‘আমি ক্যারিবিয়ানদের হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করব।” গ্রেগের এই মন্তব্য ঘিরে নানা বিতর্ক হয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের কাছে ওই সিরিজ শুধু সিরিজ থাকেনি, পরিণত হয়েছিল আত্মসম্মানের রক্ষার লড়াইয়ে।
আইসিসি বর্তমানে স্লেজিং নিয়ে খুব কড়া। ক্রিকেট মাঠে ম্যাচ চলার সময় দু’দলের কেউ যদি কাউকে গালি দেন, কিংবা বর্ণবিদ্বেষী কথা বলেন, তা হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পিছপা হয় না। কিন্তু আগে ৭০-৮০-র দশকে প্রতি ক্রিকেট সিরিজে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলত। বডিলাইন সিরিজ তো তার আগে, সেইসময় কথা নয়, পেসারদের হাত থেকে বেরতো গোলা-বারুদ, তাঁদের পেস বোলিং সামলাতে নাজেহাল হতে হয়েছে প্রায় সব দলকেই, ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।
১৯৭৬ সাল, ইংল্যান্ডের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে গিয়েছে। ক্যারিবিয়ান দল সেইসময় বড় শক্তি বিশ্ব ক্রিকেটে। অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বে দলে ছিলেন মাইকেল হোল্ডিং, অ্যান্ডি রবার্টস, ওয়েন ড্যানিয়েল, ভিভিয়ান রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ ও আলভিন কালীচরণের মতো তারকারা। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক সেইসময় ছিলেন টনি গ্রেগ। বডিলাইন সিরিজের পর থেকেই ব্রিটিশ ক্রিকেটারদের মধ্যে একটা অহংবোধ কাজ করত। তাঁরা মনে করতেন, বাকিরা তাঁদের সবাই পদানত, ক্রিকেটে শেষ কথা বলবেন তাঁরাই।
সেবারও সিরিজ শুরুর আগে ইংল্যান্ড দলনেতা টনি গ্রেগ বলেছিলেন, “I intend to make them GROVEL.” বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘‘আমি ক্যারিবিয়ানদের হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করব।” গ্রেগের এই মন্তব্য ঘিরে নানা বিতর্ক হয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের কাছে ওই সিরিজ শুধু সিরিজ থাকেনি, তারচেয়েও জড়িয়ে গিয়েছিল আত্মসম্মানের বিষয়।
লর্ডসে সেবার প্রথম টেস্ট ড্র হয়েছিল, পরের টেস্টে অবশ্য ক্যারিবিয়ানদের দাপট ছিল দেখার মতোই। দ্বিতীয় টেস্টে মাইকেল হোল্ডিং ও অ্যান্ডি রবার্টসের পেস আক্রমণে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা দারুণ চাপে পড়ে যান। হোল্ডিংয়ের অসাধারণ গতি ও নিখুঁত বোলিং এবং রবার্টসের আগ্রাসী পেস বোলিং ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপকে তছনছ করে দিয়েছিল। কেন ক্যারিবিয়ান পেস ব্যাটারি তখন বিশ্বের সেরা ছিল, তাঁরা প্রতি ম্যাচে বুঝিয়েছিলেন।
পাশাপাশি ব্যাট হাতে ভিভিয়ান রিচার্ডসও ছিলেন অনবদ্য, ক্লাসিক। তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ইংল্যান্ডের বাঘা বাঘা বোলারদের ওপর নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ড্রাইভ, কাট, পুল - সব ধরনের শটে রিচার্ডস সেই সফরে দুরন্ত ছিলেন, তিনি মোট ৮২৯ রান করেছিলেন, তারমধ্যে চারটি সেঞ্চুরি ছিল। আর গর্ডন গ্রিনিজও নিজের দক্ষতা তুলে ধরেছিলেন।
প্রথম টেস্ট ড্র হওয়ার পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিপক্ষের মাঠে এসে ইংল্যান্ডকে পরের তিনটি টেস্টে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যান তারা। মাইকেল হোল্ডিং চারটি টেস্টে ২৮টি উইকেট নেন এবং অ্যান্ডি রবার্টস ২৮টি উইকেট নেন ৫টি টেস্ট খেলে। সিরিজের সেরা হন ভিভই, তাঁর ব্যাটিং নৈপুন্যের জন্য।
পঞ্চম টেস্টে ওভালে নাটকীয় একটি ঘটনা ঘটেছিল। দেখা যায়, ব্রিটিশ অধিনায়ক টনি গ্রেগ যখন ব্যাটিং করতে নামছেন, সেইসময় গ্যালারি থেকে বিদ্রুপ করতে শোনা যায়, সবাই চিৎকার করছিল, Grovel-Grovel.. মানে তুমি এবার হাঁটু গেড়ে বসো আমাদের সামনে! গ্রেগকেও দেখা যায় দর্শকদের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে ব্যাটিং করতে নামছেন। তিনি যে তাঁর নিজের কথার জন্য অনুশোচনায় দগ্ধ সেটি তিনি বুঝিয়ে দেন।
ক্রিকেট এমনই, কখন নিজের কথা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে, কেউ জানে না। ওই সফরে ক্যারিবিয়ানরা পালটা কথা বলতে যাননি, তাঁরা শুধু মাঠে নেমে নিজেদের কাজটি ঠিকঠাক করেছিলেন, সেটাতেই ফুল ফুটেছে। রিচার্ডস, গ্রিনিজের দুর্দান্ত ব্যাটিং, ক্লাইভ লয়েডের কুশলী অধিনায়কত্ব ও হোল্ডিং ও রবার্টসের বোলিংই সিরিজে পার্থক্য গড়ে দেয়। আর অহংবোধে শেষ হয়ে যায় ইংল্যান্ড দল। বিশ্ব ক্রিকেটে সেবার ব্রিটিশদের দর্পচূর্ণ লাল কালিতে লেখা রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
