

তৃণমূল আমলে তৈরি দিঘার জগন্নাথ মন্দির। ছবি - Google
২রা অক্টোবর, ২০২৬
বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে সরকারি অর্থে দেদার মন্দির নির্মাণ ও ধর্মাচরণের প্রতিযোগিতার শুরু করে। স্থায়ী কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর মতো মৌলিক অর্থনৈতিক সংকটগুলোকে আড়াল করতে উৎসব আর ধর্মীয় উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার শুরু হয় যা দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে অনেকেই দেখেছিলেন দেশের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার এক বিরাট জয় হিসেবে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিজেপি-কে রুখে দেওয়া নিঃসন্দেহে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু এই নির্বাচনী সাফল্যের অন্তরালে যে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক বদলটি ঘটতে শুরু করেছে, তা গভীর উদ্বেগের। আপাতদৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও রাজ্যের তৎকালীন শাসক দল ধীরে ধীরে ধর্মাচরণের এক চরম প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। বিজেপির ঘোষিত ধর্মীয় রাজনীতির বিপরীতে তৃণমূলের এই কৌশলটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা সমান বিপজ্জনক। সংস্কৃতি ও পর্যটনের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ঢালার শুরুয়াৎ হয় ধর্মীয় পরিকাঠামো নির্মাণে। আড়াইশো কোটি টাকার রাজকোষের অর্থে দিঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি এর অন্যতম বড় উদাহরণ। দুর্গাপূজা বা কালীপূজার চেনা পরিসর পেরিয়ে এখন রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী কিংবা বারাণসীর আদলে গঙ্গা আরতির মতো আয়োজনও রাজ্য প্রশাসনের রাজনৈতিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
বাংলায় এখন এমন এক আবহ তৈরি হচ্ছে যাকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী ‘ধর্মীয় ডিজনিল্যান্ড’ বলে অভিহিত করছেন। যেখানে সংস্কৃতি হয়ে উঠছে মেকি, ইতিহাস কেবল অনুকরণ আর ধর্মীয় বিশ্বাস দাঁড়িয়েছে এক ধরনের অভিনয়ের ওপর। কলকাতার লেক টাউনে বিগ বেনের রেপ্লিকা বানানোর মতো করেই যেন দিঘার মন্দিরটি তৈরি হয়েছে— রামমন্দির রাজনীতির এক দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। রাজ্যের শাসনকাঠামোয় আজ প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে প্রচারমুখী চমক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় নতুন মন্দির বা ‘আমদানি করা’ আচার-অনুষ্ঠানের ঢাকঢোল এখন কর্মসংস্থানের জরুরি আলোচনাগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিচ্ছে। পর্যটন বাড়ানোর নামে এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বা পরিকাঠামো উন্নয়নের কোনো তাগিদ চোখে পড়ে না। যে আড়াইশো কোটি টাকা মন্দিরে গেল, তা দিয়ে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর জন্য অন্তত ৫০,০০০ কম্পিউটার কেনা যেত, কিংবা ধুঁকতে থাকা হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাণ ফেরানো যেত।
রাজ্যের অর্থনৈতিক চিত্রটি লক্ষ্য করলে এই ধর্মীয় উদযাপনের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট হয়। সরকারি নথিতে (PLFS ও NSSO) পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের হার মাত্র ৩.১ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তব চিত্রটি একেবারেই আলাদা। এটি মূলত এক ধরনের 'গোপন শ্রম' বাজার। কারণ রাজ্যের প্রায় ৫৯.১ শতাংশ কর্মরত মানুষ তথাকথিত ‘স্বনিযুক্ত’ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে যুক্ত। যাকে অনেকেই ‘চপশিল্প’ বলে ব্যঙ্গ করেন, তা আসলে এক ধরনের ছদ্ম-বেকারত্ব বা অতি-নিম্ন আয়ের অনিশ্চিত জীবন। স্থায়ী কাজের অভাব, সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা মানুষকে এই অনিশ্চিত জীবিকার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। প্রকৃত মজুরি বাড়েনি, মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। উৎসবের অর্থনীতি দিয়ে কিছু অস্থায়ী উপার্জনের পথ তৈরি করে এই সার্বিক দৈন্যকে ভুলিয়ে রাখার এক অদ্ভুত সামাজিক চুক্তি যেন জারি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল, তথাকথিত উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বিজেপিকে ঠেকানোর অজুহাতে তৃণমূলের এই ‘সরকারি ধর্মাচরণ’-কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছেন বা সমর্থন দিচ্ছেন। এর বিরুদ্ধে কথা বললেই রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। অথচ বাস্তব সত্য হল, ধর্মীয় প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মানুষের মৌলিক ক্ষোভ, পেটের ক্ষুধা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। যখন রাজ্যের মাত্র ১৭.৫ শতাংশ স্কুলে ইন্টারনেটের সুবিধা রয়েছে, শিক্ষাঙ্গনগুলো সংকটে, তখন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিকল্প হিসেবে ধর্মকে সামনে আনা কোনো প্রগতিশীল রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ধর্মকে ‘লাস ভেগাস’-এর মতো বিনোদনে রূপান্তর করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র দুটোকেই ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। বিজেপিকে আক্রমণ করার জন্য যদি সেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদেরই অনুকরণ করতে হয়, তবে তাকে গণতন্ত্রের সত্যিকারের জয় বলা যায় না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
