৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ইঁদুর তাড়াতে আনা ৫ বিড়াল খেয়ে ফেলল সাড়ে ৪ লক্ষ পাখি!

ম্যারিয়ন দ্বীপের সেই পাঁচ বিড়াল। ছবি - Google

ইঁদুর তাড়াতে আনা ৫ বিড়াল খেয়ে ফেলল সাড়ে ৪ লক্ষ পাখি!

calender icon 2 ২রা অক্টোবর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

ভুলের মাশুল দিতে হল প্রকৃতিকেই, বিপন্ন সামুদ্রিক পাখিরাও

ইঁদুরের উৎপাত ঠেকাতে ১৯৪৯ সালে ম্যারিয়ন দ্বীপে আনা হয়েছিল পাঁচটি বিড়াল। কয়েক দশকে তাদের সংখ্যা বেড়ে হাজারে পৌঁছয়। বছরে প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার সামুদ্রিক পাখি শিকার করতে শুরু করে তারা। ১৯৯১ সালে বিড়াল নির্মূলের পর ফের বাড়ে ইঁদুরের সংখ্যা। এবার পাখির ডিম ও ছানাই হয়ে ওঠে তাদের শিকার।

মূল বিষয়

একটা দ্বীপে ইঁদুরের উৎপাত। তা থেকে বাঁচতে বাইরে থেকে আনা হল মাত্র পাঁচটি বিড়াল। উদ্দেশ্য ছিল সহজ, ইঁদুরের সংখ্যা কমানো। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের পরিকল্পনা মতো চলল না। কয়েক দশকের মধ্যে সেই পাঁচ বিড়ালই বেড়ে দাঁড়াল হাজারে। আর ইঁদুরের বদলে তাদের প্রধান শিকার হয়ে উঠল দ্বীপের সামুদ্রিক পাখি। বছরে প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার পাখি তাদের হাতে মারা যেতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত সেই বিড়ালও নির্মূল করতে হল। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের ম্যারিয়ন দ্বীপের এই ঘটনা এখন পরিবেশবিদদের কাছে মানুষের হস্তক্ষেপে প্রকৃতির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ইঁদুর ঠেকাতেই ‘পাঁচ অতিথি’

১৯৪৮-৪৯ সালে ম্যারিয়ন দ্বীপে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হওয়ার পর সেখানে ইঁদুরের সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। গবেষকদের মতে, মানুষের যাতায়াতের সূত্র ধরেই বহু আগে দ্বীপে পৌঁছেছিল ইঁদুর। দ্রুত বংশবৃদ্ধির ফলে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

সমস্যার সমাধান করতে ১৯৪৯ সালে দ্বীপে আনা হয় মাত্র পাঁচটি বিড়াল। ধারণা ছিল, বিড়াল ইঁদুর শিকার করবে এবং স্বাভাবিক ভাবেই কমে যাবে ইঁদুরের সংখ্যা। কিন্তু তখন কেউ ভাবেননি, ওই পাঁচ বিড়ালই এক দিন দ্বীপের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হবে।

পাঁচ থেকে কয়েক হাজার

ম্যারিয়নের মতো দ্বীপে বিড়ালের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের অভাব ছিল না। প্রথমে ইঁদুরই ছিল তাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শিকার হিসেবে তারা বেছে নেয় দ্বীপে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক পাখিকেও।

১৯৭০-এর দশকে দ্বীপে প্রায় ২ হাজার বন্য বিড়াল ঘুরে বেড়াত বলে পরিবেশ সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অন্য গবেষণায় ১৯৭৭ সালে সংখ্যাটি প্রায় ৩,৪০০-তে পৌঁছেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে শিকারের পরিমাণ।

রাত নামলেই শুরু হত শিকার

ম্যারিয়ন দ্বীপের সামুদ্রিক পাখিদের একটা বড় অংশ মাটির নীচে গর্ত করে বাসা বানায়। ডিম পাড়তে এবং বাচ্চা বড় করতে তারা সেই গর্তের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওই গর্তের কাছেই অপেক্ষা করত বন্য বিড়াল। পাখিরা বাসায় ফিরলেই শুরু হত শিকার।

বিশেষ করে উড়তে না-পারা বা সদ্য ডানা মেলা বাচ্চারা ছিল সবচেয়ে অসহায়। ধীরে ধীরে সামুদ্রিক পাখির বিপুল সংখ্যক ডিম, ছানা এবং পূর্ণবয়স্ক পাখি বিড়ালের শিকার হতে থাকে। একসময় হিসাব করে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার সামুদ্রিক পাখি বিড়ালের হাতে মারা যাচ্ছে।

চার প্রজাতি হারিয়ে গেল দ্বীপ থেকে

পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ম্যারিয়ন দ্বীপে স্থানীয় ভাবে কয়েকটি সামুদ্রিক পাখির প্রজাতি আর দেখা গেল না। চার প্রজাতির স্টর্ম-পেট্রেল এবং ডাইভিং-পেট্রেল দ্বীপ থেকে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বলে পরিবেশ সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, ইঁদুর ঠেকাতে যে প্রাণীকে আনা হয়েছিল, সেই প্রাণীকেই এবার দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সরাতে হবে।

আরও পড়ুন
শ্রীলঙ্কার বিস্ময়কর দুর্গ সিগিরিয়া-এর নেপথ্যে পিতৃহত্যার ইতিহাস!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির হাত ধরে পর্যটনের নতুন দিগন্ত
মার্কিন বিচারবিভাগের ‘হল অফ ফেম’-এ ১৯ বছরের বঙ্গসন্তান!
সেক্সের নেশায় রানি থেকে সিরিয়াল কিলার!

শুরু হল ‘বিড়াল তাড়ানোর’ অভিযান

১৯৭৭ সালে বন্য বিড়াল নির্মূলের উদ্যোগ শুরু হয়। প্রথম দিকে ব্যবহার করা হয়েছিল feline panleukopenia virus। তার প্রভাবে বিড়ালের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। এর পর শুরু হয় আরও দীর্ঘ অভিযান। ফাঁদ পাতা, শিকার এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সাহায্যে ধাপে ধাপে বিড়ালের সংখ্যা কমানো হয়।

১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে হাজার হাজার ঘণ্টা ধরে অভিযান চালিয়ে শত শত বন্য বিড়ালকে নির্মূল করা হয়। অবশেষে ১৯৯১ সালে ম্যারিয়ন দ্বীপ থেকে বন্য বিড়াল সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। মনে হয়েছিল, এ বার বোধ হয় বাঁচল দ্বীপের পাখিরা। কিন্তু গল্প তখনও শেষ হয়নি!

বিড়াল নেই, ফের মাথাচাড়া ইঁদুরের

বিড়াল চলে যাওয়ার পর প্রকৃতির ভারসাম্যে ফের পরিবর্তন দেখা দিল। যে ইঁদুরের উৎপাত কমাতেই এক দিন বিড়াল আনা হয়েছিল, তারাই আবার দ্রুত বংশবৃদ্ধি শুরু করল। এ বার ইঁদুর শুধু খাবারের সন্ধানে ঘুরছিল না। তারা সামুদ্রিক পাখির ডিম এবং ছানার উপরও হামলা শুরু করল।

অ্যালবাট্রসের মতো বড় সামুদ্রিক পাখির বাচ্চারাও রেহাই পেল না। ২০০৩ সালে Wandering Albatross-এর ছানার উপর ইঁদুরের হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি প্রজাতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা সামনে আসে। অর্থাৎ, যে সমস্যা থেকে বাঁচতে বিড়াল আনা হয়েছিল, বিড়াল নির্মূলের পর সেই সমস্যাই আবার ফিরে এল, আর এ বার তার শিকার পাখিরাও।

প্রকৃতির ভারসাম্য নিয়ে বড় শিক্ষা

ম্যারিয়ন দ্বীপের ঘটনা তাই শুধু বিড়াল আর ইঁদুরের গল্প নয়। এটি মানুষের হাতে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যে হস্তক্ষেপের পরিণতিরও উদাহরণ।

একটি প্রাণীকে অন্য একটি প্রাণী নিয়ন্ত্রণের জন্য বাইরে থেকে কোনও বাস্তুতন্ত্রে ঢোকানো হলে তার প্রভাব কোথায় গিয়ে থামবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। নতুন পরিবেশে সেই প্রাণীর খাদ্য, বংশবৃদ্ধি এবং শিকারের ধরন বদলে যেতে পারে।

ম্যারিয়নে সেটিই হয়েছিল। পাঁচটি বিড়াল দিয়ে শুরু হয়েছিল একটি ছোট ‘পরীক্ষা’। কয়েক দশক পরে তা পরিণত হয়েছিল হাজার হাজার প্রাণীর বাস্তুতান্ত্রিক সংকটে।

এখন লক্ষ্য ইঁদুর নির্মূল

বিড়াল নির্মূলের পরও ম্যারিয়নের সমস্যা মেটেনি। বরং এখন পরিবেশবিদদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ, ইঁদুর নির্মূল করে সামুদ্রিক পাখিদের রক্ষা করা। দ্বীপে বিপুল সংখ্যক সামুদ্রিক পাখির অস্তিত্ব এখনও রয়েছে। তাদের প্রজনন এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে ইঁদুরের দৌরাত্ম্য কমানো জরুরি হয়ে উঠেছে। 

একসময় পাঁচটি বিড়ালকে মনে হয়েছিল সমস্যার সহজ সমাধান। পরে সেই বিড়ালই হয়ে উঠেছিল আরও বড় সমস্যা। আর তাদের সরিয়ে দেওয়ার পর পুরনো শত্রু ইঁদুর ফিরে এসে নতুন করে বিপদ তৈরি করেছে। প্রকৃতির ক্ষেত্রে তাই ‘সহজ সমাধান’ বলে কিছু নেই, ম্যারিয়ন দ্বীপের পাঁচ বিড়ালের গল্প সেই কথাই ফের মনে করিয়ে দিল।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য