

আদিত্য করিকালানের শেষ পর্যায়ের প্রতীকী ছবি - AI
২রা অক্টোবর, ২০২৬
চোল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট প্রথম রাজরাজ চোলের হয়ত সিংহাসনেই বসা হত না যদি তাঁর সুযোগ্য দাদা আদিত্য করিকালান জীবিত থাকতেন। সর্বদিক থেকে যোগ্য হলে,ও স্রেফ এক হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছিল চোল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ যুবরাজকে।
সময়টা ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ। তখন চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কদম্বুর প্রাসাদের একটি রুদ্ধদ্বার প্রকোষ্ঠে অপেক্ষা করছেন এক মহাবীর। তিনি আর কেউ নন, তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ভাবী সম্রাট আদিত্য করিকালান। চোল বংশের যুবরাজ। তাঁর শৌর্য আর বীরত্বের কথা তখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তা ভারত মহাসাগর পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে সিংহলে।
সেই তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি ওই বদ্ধ ঘরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চিত মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর জাল বুনেছে এক অসামান্যা সুন্দরী নারী। এই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের আগুন একটা গোটা সাম্রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যে কাহিনী সিনেমা কেউ হার মানাতে পারে।
সেটা দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। দক্ষিণ ভারতে তখন ক্ষমতার লড়াই তুঙ্গে। একদিকে চোল সাম্রাজ্য, অন্যদিকে মাদুরাইয়ের পাণ্ড্য রাজবংশ। তক্কোলামের যুদ্ধে হেরে গিয়ে চোলরা তখন কিছুটা ব্যাকফুটে। এই সুযোগে পাণ্ড্য রাজা বীরপাণ্ড্য বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন যে 'চোলান্তক' বা চোলদের যম উপাধি ধারণ করেন।
কিন্তু তাঁর এই আস্ফালন বেশিদিন টেকেনি। এর কারণ তৎকালীন চোল রাজা সুন্দর চোলের জ্যেষ্ঠ পুত্র তথা সাম্রাজ্যের যুবরাজ আদিত্য করিকালানের প্রবল প্রতাপ।
চোলদের হারানো সম্মান ফেরাতে আদিত্য করিকালান মরিয়া ছিলেন। এর থেকেই বীরদর্পে চেভুরের প্রান্তরে তিনি বাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হন পাণ্ড্য রাজা বীরপাণ্ড্যর। আদিত্যের যুদ্ধরীতি এবং আগ্রাসী আক্রমণের সামনে পাণ্ড্য বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে বীরপাণ্ড্য জঙ্গল ঘেরা একটি গুহায় আশ্রয় নেন। তৎকালীন প্রথা ভেঙে আদিত্য তাঁকে খুঁজে বের করে অত্যন্ত নির্মমভাবে মাথা কেটে হত্যা করেন।
এরপর পরাজিত পাণ্ড্য রাজার কাটা মাথা নিয়ে মাদুরাইয়ের রাস্তায় রীতিমতো উল্লাস করেছিলেন আদিত্য। তিনি নিজেকে 'বীর পাণ্ড্যন তালাই কোন্দা' বা যিনি বীরপাণ্ড্যের মাথা নিয়েছেন এমন উপাধিতে ভূষিত করেন। একজন পরাজিত রাজাকে এমন নারকীয়ভাবে অপমান করাটা সেকালের যুদ্ধের নিয়মে ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটি কাজ। আর ঠিক এই অহঙ্কারই আদিত্যের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দেয়।
প্রাচীন তামিল রাজাদের নিজস্ব কিছু আত্মঘাতী দেহরক্ষী বাহিনী থাকত। পাণ্ড্যদের এই বিশেষ বাহিনীর নাম ছিল 'তেন্নাভান আপাত্তুদবিগল'। এই নামের অর্থ হল- বিপদের দিনে পাণ্ড্য রাজার সঙ্গী। এরা রাজার সাথে এক পাত্রে খাবার খেয়ে রক্তের শপথ নিত। রাজার প্রাণ বাঁচানোই ছিল এদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
কিন্তু চেভুরের যুদ্ধে আদিত্যের আক্রমণের তীব্রতা এতটাই ভয়ানক ছিল যে রণক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পালানোর সময় রাজা বীরপাণ্ড্য তাঁর নিজস্ব রক্ষীদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে তিনি যখন গুহায় লুকিয়ে ছিলেন তখন কার্যত একা ছিলেন। রাজাকে বাঁচাতে না পারার এই চরম ব্যর্থতা আর গ্লানি রক্ষীবাহিনীর বেঁচে থাকা সদস্যদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সেই গ্লানি থেকে জন্ম নেয় এক ভয়ানক জেদ- রাজাকে তো বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু রাজার খুনিকে আমরা ছাড়ব না। এরপরই শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং নিখুঁত ষড়যন্ত্র। যা চোল সাম্রাজ্যের যুবরাজের মৃত্যু কারণ ছিল।
পাণ্ড্য গুপ্তচররা ভালো করেই জানত আদিত্য করিকালানকে সরাসরি যুদ্ধে হারানো অসম্ভব। তাই তারা বেছে নেয় ছলনা এবং কূটনীতির পথ। এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে ছিল এক নারী। প্রখ্যাত তামিল লেখক কল্কি কৃষ্ণমূর্তির কালজয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাস 'পোন্নিইন সেলভান'-এ তাকে 'নন্দিনী' বলা হলেও, ইতিহাসে তার আসল পরিচয় আজও এক রহস্য হয়ে থেকে গিয়েছে। তিনি হয়ত বীরপাণ্ড্যের প্রেমিকা বা খুব কাছের কেউ ছিলেন।
এই অসামান্যা সুন্দরীকে প্রেমের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে পাণ্ড্য গুপ্তচররা চোলদের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ে। গুপ্তচরদের প্রধান রবীদসন খুব সহজেই চোলদের আস্থা অর্জন করে তাদের প্রাসাদের একজন বিশ্বাসভাজন কর্মী হয়ে ওঠেন।
যখন ঘটনাটা ঘটে, সেই সময় আদিত্য কাঞ্চিপুরমে ছিলেন। কদম্বুরের সামন্ত রাজা এক বিশেষ উৎসবের আয়োজন করেন। সেখানে যুবরাজ আদিত্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বোন অর্থাৎ চোল রাজা সুন্দরের কন্যা কুন্দভাই দাদা আদিত্যকে বারবার ওই সামন্ত রাজার আমন্ত্রণে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু অকুতোভয় আদিত্য কাউকে পাত্তা না দিয়ে সামান্য কয়েকজন রক্ষী নিয়ে কদম্বুর প্রাসাদে পৌঁছান। সেখান রাতের অন্ধকারে যখন যুবরাজ একদম অরক্ষিত ছিলেন, ঠিক সেই সময় রবীদসন এবং তার সঙ্গীরা তাঁর ঘরে ঢুকে পড়ে। বীরপাণ্ড্য হত্যার চরম প্রতিশোধ নিতে চোলদের ভবিষ্যৎ সম্রাটকে অত্যন্ত কাপুরুষের মতো সেই রাতে নৃশংস ভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়।
যুবরাজের মৃত্যু সংবাদ চোল সাম্রাজ্যে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দেয়। পুত্রশোকে ভগ্নহৃদয় রাজা সুন্দর চোল কিছুদিন পরেই মারা যান। নিয়ম অনুযায়ী সিংহাসনে বসার কথা আদিত্যের ছোট ভাই অরুলমোঝি বর্মনের। কিন্তু এখানে ছিল আরেক কাঁটা। আদিত্যের কাকা উত্তম চোল বা মধুরান্তক অনেকদিন ধরেই সিংহাসনের লোভে বসেছিলেন। আদিত্যের মৃত্যুর পেছনে তাঁর প্রচ্ছন্ন মদত থাকার সম্ভাবনাও অনেকে উড়িয়ে দেন না। কারণ আদিত্য বেঁচে থাকলে উত্তমের রাজা হওয়ার কোনও আশাই ছিল না।
জনগণ এবং মন্ত্রীরা অরুলমোঝিকে রাজা হিসেবে চাইলেও তিনি চরম রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি জানতেন, সিংহাসনে বসতে গেলেই উত্তম চোল বিদ্রোহ করবেন। ফলে সাম্রাজ্যে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। সদ্য যুবরাজকে হারানো চোল সাম্রাজ্য সেই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। তাই অরুলমোঝি এক চুক্তির বিনিময়ে নিজের প্রাপ্য সিংহাসন উত্তম চোলকে ছেড়ে দেন। চুক্তি অনুযায়ী উত্তম চোল যতদিন বাঁচবেন তিনিই সম্রাট থাকবেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কোনও সন্তান সিংহাসনে বসতে পারবে না এবং পরবর্তী রাজা হবেন অরুলমোঝি স্বয়ং। এই একটি সিদ্ধান্তের হাত ধরে চোল সাম্রাজ্য ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।
উত্তম চোল ১৫ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি কিন্তু আদিত্য করিকালানের খুনিদের টিকিটিও ছোঁননি। ঘাতকরা বুক ফুলিয়ে চোল সাম্রাজ্যেই ঘুরে বেড়াত। অবশেষে ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে উত্তম চোল প্রয়াত হলে চুক্তি মেনে অরুলমোঝি সিংহাসনে বসেন। পরবর্তীতে তিনি প্রথম রাজরাজ চোল নামে দক্ষিণ ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট হিসেবে পরিচিত হন।
রাজা হয়েই রাজরাজ চোল দাদার খুনিদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। তামিলনাড়ুর উডায়ারগুডি মন্দিরের শিলালিপি আজও সেই সুবিচারের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজরাজ চোল ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড দেননি ঠিকই। কিন্তু রবীদসন, সোমন এবং পরমেশ্বরন নামের ওই তিন প্রধান ঘাতকের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং তাদের সপরিবারে চোল সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য বিষয় হল, একদিকে আদিত্য করিকালানের অন্ধ আক্রোশ ডেকে এনেছিল তাঁর নিজের মৃত্যু। আর অন্যদিকে তাঁরই ছোট ভাইয়ের অসম্ভব ঠান্ডা মাথার রাজনীতি শুধু সাম্রাজ্যকে বাঁচায়নি, পনেরো বছর পর অক্ষরে অক্ষরে আদায় করে নিয়েছিল দাদাকে হত্যার প্রতিশোধ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
