

জুনাগড়ের নবাব তৃতীয় মহাবত খান রসুলখঞ্জির ভারত ত্যাগের প্রতীকী ছবি - AI
২রা অক্টোবর, ২০২৬
একসময় কুকুর আর সম্পদে বিমান এতটাই ভরে যায় যে নবাবের অন্দরমহলের সকল সদস্যের জায়গা হচ্ছিল না। চরম সঙ্কটের সেই মুহূর্তে নবাব তৃতীয় মহাবত খান এমন এক কাণ্ড করে বসেন যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল কেলেঙ্কারি হয়েই রয়ে যাবে। তিনি নিজের এক বেগম এবং সন্তানকে রানওয়েতেই ফেলে রেখে কুকুরদের নিয়ে উড়ে যান করাচির উদ্দেশ্যে!
সময়টা ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস। চারদিকে চরম আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলা। সদ্য স্বাধীন হয়েছে দেশ, কিন্তু সর্বাঙ্গে লেগে আছে দেশভাগের যন্ত্রণা। এরই মধ্যে আজকের গুজরাতের কাঠিয়াওয়াড় উপদ্বীপের একটি ছোট্ট দেশীয় রাজ্য জুনাগড়ে অস্থিরতা তুঙ্গে উঠেছে। কারণ ৮০% হিন্দু জনসংখ্যা বিশিষ্ট এই দেশীয় রাজ্যের শাসক ছিল মুসলমান। এদিকে সীমান্ত তিনদিকেই ভারতের স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত। তা সত্ত্বেও এখানকার নবাব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে সই করে দেন। আর তারপরই ক্ষেপে উঠে রাজ্যের সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে এগিয়ে আসে ভারত সরকার। অবরোধ শুরু হয় জুনাগড়ে।
সেই জুনাগড়ের কেশোদ বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছে একটি ব্যক্তিগত বিমান। যাতে করে নবাব তৃতীয় মহাবত খান রসুলখঞ্জি সপরিবারে পাকিস্তানে পালাবেন। এই অবস্থায় বিমানে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কিন্তু সবার আগে নবাবের বিমানে তোলা হয় নবাবের বহুমূল্য ধনসম্পদ আর তাঁর সবচেয়ে আদরের পোষা কুকুরদের! হ্যাঁ , ঠিকই পড়ছেন। বেগম বা রাজপুত্রদের বদলে পোষা কুকুরদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। একসময় কুকুর আর সম্পদে বিমান এতটাই ভরে যায় যে নবাবের অন্দরমহলের সকল সদস্যের জায়গা হচ্ছিল না। চরম সঙ্কটের সেই মুহূর্তে নবাব তৃতীয় মহাবত খান এমন এক কাণ্ড করে বসেন যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল কেলেঙ্কারি হয়ে রয়ে যাবে। তিনি নিজের এক বেগম এবং সন্তানকে রানওয়েতেই ফেলে রেখে কুকুরদের নিয়ে উড়ে যান করাচির উদ্দেশ্যে!
জুনাগড়ের শেষ নবাব তৃতীয় মহাবত খান রসুলখঞ্জির জীবন আর তাঁর দেশভাগের সময়ের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আজও ইতিহাসবিদদের অবাক করে।
নবাব মহাবত খানের জীবন ছিল অদ্ভুত সব খেয়ালিপনায় ভরা। তাঁর কাছে মানুষ বা প্রজাদের চেয়ে অনেক বেশি দামি ছিল পোষা কুকুররা। প্রাসাদে প্রায় ৮০০টি কুকুর ছিল। তাদের জন্য আলাদা আলাদা বিলাসবহুল ঘর, নিজস্ব পরিচারক, পশু চিকিৎসক এবং এমনকি আলাদা টেলিফোনের ব্যবস্থাও ছিল। কোনও কুকুর মারা গেলে জুনাগড়ে রীতিমত রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হত!
তবে সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর প্রিয় মাদি কুকুর 'রোশানা'র বিয়ের ঘটনাটি। মাংরোল রাজ্যের একটি পুরুষ কুকুর 'ববি'র সঙ্গে রোশানার বিয়ে ঠিক করেন নবাব। সেই বিয়েতে সেই যুগেই প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা উড়িয়েছিলেন! রাজকীয় হাতির পিঠে চাপিয়ে কুকুরের শোভাযাত্রা বেরিয়েছিল। দেড় লক্ষ অতিথিকে রাজকীয় ভোজ খাওয়ানো হয়েছিল। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইনকেও সেই বিয়েতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যদিও নবাবের এমন ক্ষ্যাপামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে লর্ড আরউইন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
১৯১১ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন মহাবত খান। ১৯২০ সালে তিনি পূর্ণ ক্ষমতা পান। কিন্তু রাজকার্য পরিচালনার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা বা সদিচ্ছা কোনটাই ছিল না। ঐতিহাসিক ভিপি মেনন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য স্টোরি অফ দ্য ইন্টিগ্রেশন অফ দ্য ইন্ডিয়ান স্টেটস' এবং রামচন্দ্র গুহ তাঁর 'ইন্ডিয়া আফটার গান্ধি' বইয়ে নবাব মহাবত খানকে একজন চরম দুর্বল, খামখেয়ালি এবং অযোগ্য শাসক হিসাবেই তুলে ধরেছেন।
রাজ্যের শাসনভার মূলত দেওয়ানদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। নবাব নিজে ব্যস্ত থাকতেন পশু-পাখি আর কুকুরদের নিয়ে। কুকুরের পেছনে তাঁর এই অন্ধ মোহ এবং বিপুল অপচয় জুনাগড়ের রাজকোষকে প্রায় নিঃশেষ করে তুলেছিল।
নবাবের এই প্রশাসনিক উদাসীনতার পুরো ফায়দা তুলেছিলেন জুনাগড়ে দেওয়ান স্যার শাহ নওয়াজ ভুট্টো। তিনি ছিলেন পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাবা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জুনাগড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন হিন্দু। ভৌগোলিকভাবে রাজ্যটি সম্পূর্ণ ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা ছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি কোনও স্থলসীমান্ত ছিল না।

তবুও দেওয়ান ভুট্টো নবাবকে বোঝান, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে মুসলিম রাজাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তিনি যুক্তি দেন, জুনাগড় সমুদ্রপথে করাচির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। ভুট্টোর এই প্ররোচনায় পা দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে সই করেন নবাব মহাবত খান।
পাকিস্তানভুক্তির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় জুনাগড়ে। সামলদাস গান্ধির নেতৃত্বে মুম্বইয়ে জুনাগড়ের একটি অস্থায়ী সরকার বা 'আরজি হুকুমত' গঠিত হয়। ভারত সরকার জুনাগড়ের উপর কড়া অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেয়। রাজ্যে কয়লা ও খাদ্যের চরম আকাল দেখা দেয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ভারতীয় সেনাবাহিনী জুনাগড়ের দিকে এগোতে শুরু করে।
এই প্রেক্ষাপটে কেশোদ বিমানবন্দরে সেই কলঙ্কিত পলায়নের ঘটনা ঘটে। ভয়ে আর আতঙ্কে নবাব কুকুর নিয়ে পালালেন। কিন্তু স্ত্রী-পুত্র পড়ে রইলেন রানওয়েতে! যদিও সেই বেগম পরে অন্য একটি ছোট বিমানে করে কোনক্রমে পাকিস্তানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিপদের মুখে নিজের পরিবারের বদলে কুকুরকে বেছে নেওয়ার এই ঘটনা নবাব মহাবত খানের চরিত্রে এক চিরস্থায়ী কালি লেপে দিয়েছে। নবাব পালিয়ে যাওয়ার পর দেওয়ান ভুট্টো আর প্রশাসন সামলাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে এক মাসের মধ্যে (৮ নভেম্বর, ১৯৪৭) তিনি ভারত সরকারকে চিঠি লিখে জুনাগড়ের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া গণভোটে জুনাগড়ের ৯৯.৯৫% মানুষ ভারত অন্তর্ভুক্তির পক্ষেই রায় দেয়।
একজন শাসক হিসেবে মহাবত খান চূড়ান্ত ব্যর্থ হলেও, এই একটি কাজের জন্য পরিবেশবিদরা আজও তাঁকে সম্মান করেন। তিনি শুধু কুকুর নয়, বন্যপ্রাণীও ভালোবাসতেন। সেই সময় গির অরণ্যে এশীয় সিংহের সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ডজনখানেকের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল। শিকারিদের হাত থেকে এই সিংহদের বাঁচাতে নবাব মহাবত খানই প্রথম গির অরণ্যে সিংহ শিকার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেন। কড়া হাতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। আজ ভারতে এশীয় সিংহের যে গর্বিত উপস্থিতি আমরা দেখি, তার একটা বড় কৃতিত্ব কিন্তু এই নবাবেরই।
অনেক আশা নিয়ে প্রচুর সোনাদানা আর কুকুর নিয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মহাবত খান। ভেবেছিলেন পাকিস্তান সরকার তাঁকে স্বাধীন শাসকের মতোই রাজকীয় মর্যাদা দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। করাচিতে তাঁকে কার্যত মোহভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়েই বাঁচতে হয়েছিল। শুধু পাকিস্তানের সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা পেতেন।
১৯৫৯ সালের ১৭ জুলাই করাচিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে আজও এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক পরিহাস রয়ে গেছে। পরিবারের দাবি তিনি হৃদরোগে মারা যান। কিন্তু অনেকেই বলেন, কুকুরের প্রতি তাঁর চরম আসক্তিই কাল হয়েছিল। শেষপর্যন্ত জলাতঙ্ক রোগেই নাকি তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তান সরকার জুনাগড় রাজপরিবারের ভাতা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এদিকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের বিরুদ্ধে কাজিয়ায় মেতে ওঠে। সবমিলিয়ে জুনাগড়ের শেষ খ্যাপা নবাবের পরিবারের পাকিস্তান যাপন পর্ব মোটেও সুখের হয়নি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
