

অনন্ত আম্বানির বনতারা নিয়ে বিতর্ক। ছবি - Google
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সম্প্রতি ব্রাজিলের সাও পাওলোর গুয়ারুলহোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন নাগরিক টনি সিলভাকে একাধিক ফোন ও ল্যাপটপ সহ আটক করে ব্রাজিলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। এই ব্যক্তিই নব্বইয়ের দশকে বিরল ও বিপন্ন পাখি পাচারের দায়ে আমেরিকায় জেল খেটেছেন। সেই তদন্তেই উঠে এসেছে, জামনগরে আম্বানিদের বনতারার জন্য বন্যপ্রাণী জোগাড় করার নেপথ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছিলেন এই সিলভা। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে বিতর্ক।
বিশ্বের বৃহত্তম পশু পুনর্বাসন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা অনন্ত আম্বানির স্বপ্নের প্রকল্প ‘বনতারা’ (Vantara) এখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলির আতশকাঁচের নিচে। গুজরাটের জামনগরে ৩,৫০০ একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই মেগা চিড়িয়াখানায় একদিকে রয়েছে হাতিদের জন্য বিলাসবহুল সুইমিং পুলের মতো বন্দোবস্ত, অন্যদিকে জমছে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। বন্যপ্রাণী প্রেম নাকি আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের নেটওয়ার্ককে পুনর্বাসনের মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা—এই তর্ক যখন আন্তর্জাতিক মহলে তুঙ্গে, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে নয়া জল্পনা: রাজ্যে কি পা রাখছে বনতারা?
সম্প্রতি ব্রাজিলের সাও পাওলোর গুয়ারুলহোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক মার্কিন নাগরিকের একাধিক ফোন ও ল্যাপটপ বাজেয়াপ্ত করে ব্রাজিলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। জানা যায়, ব্যক্তিটি আর কেউ নন—টনি সিলভা। নব্বইয়ের দশকে বিরল ও বিপন্ন পাখি পাচারের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে জেল খাটা এই পক্ষীবিশারদের বিরুদ্ধেই এবার ব্রাজিলের সোনালী সিংহ তামারিন (Golden Lion Tamarin) ও অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী পাচারের তদন্ত চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, জামনগরের বনতারার জন্য বন্যপ্রাণী জোগাড় করার নেপথ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছিলেন এই সিলভা। যদিও বনতারা কর্তৃপক্ষ যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, টনি সিলভা তাদের কর্মী নন; কেবল খাঁচার গঠন ও পুষ্টি বিষয়ক সীমিত পরামর্শের জন্য একটি স্বাধীন ঠিকাদার সংস্থা তাঁকে নিযুক্ত করেছিল। সিলভার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় বনতারার নয় বলেই দাবি তাদের।
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্যত্র। থাইল্যান্ডের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সিলভাকে বনতারার সংরক্ষণ শাখার শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা এবং ভেনিজুয়েলা ও হাইতি থেকে হাজার হাজার বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী বনতারায় স্থানান্তরের নথিপত্র কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে বড়সড় সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্ক ক্রমশ জোরালো হতেই সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রককে চিঠি দিয়ে এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে বনতারা। তারা ঘোষণা করেছে, আগামী এক বছরের জন্য বিদেশ থেকে কোনো জীবিত বন্যপ্রাণী তারা আমদানি করবে না। বিশেষ করে গ্রেট এপস (শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং), বাঘ-সিংহের মতো বড় বিড়াল বা সাইটিস (CITES) অ্যাপেন্ডিক্স-১ তালিকাভুক্ত অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির কোনো প্রাণী বাইরের দেশ থেকে নেওয়া হবে না।
যদিও বনতারা একে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছার নিদর্শন বলে দাবি করেছে, বন্যপ্রাণ গবেষকদের একাংশের মতে এটি মূলত চোখ ঘোরানোর চেষ্টা। গবেষকদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাইটিসের তদন্তের মুখে পড়েই নিজেদের তৈরি নিয়মের খোলসে আত্মরক্ষার রাস্তা খুঁজছে এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বন্য পরিবেশ ধ্বংস করে প্রাণী এনে খাঁচায় পুরে রাখার পর এমন "স্বেচ্ছাসেবী প্রতিশ্রুতি" দিয়ে আসল সত্য আড়াল করা যায় না।
আন্তর্জাতিক এই বিতর্কের ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। সেন্ট্রাল জু অথরিটির (CZA) সরকারি পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলেই ধরা পড়ে এক অবিশ্বাস্য গরমিল। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে আলিপুর চিড়িয়াখানার খাতার শেষ হিসেবে যেখানে প্রাণীর সংখ্যা ছিল ৬৭২, ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ২০২৪-২৫-এর সূচনার নথিতে দেখা যাচ্ছে তা এক ধাক্কায় নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৫১-এ!
এক রাতের ব্যবধানে ৩২১টি বন্যপ্রাণী সরকারি খাতা থেকে কীভাবে ‘উধাও’ হয়ে গেল, তা নিয়ে এখনো কোনো সদুত্তর নেই। শুধু আলিপুর নয়, নিউ টাউনের হরিণালয় পার্ক বা বর্ধমান জু-তেও একই ধরনের অসঙ্গতি চোখে পড়ছে।
নথি বলছে, ২০২৩-২৪ সালে আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে মেছো বিড়াল, ময়াল, ঘড়িয়াল এবং মণিপুরের অত্যন্ত বিপন্ন সংগাই হরিণ সহ অন্তত ৫১টি প্রাণী জামনগরের বনতারায় পাঠানো হয়েছিল। দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু জু থেকেও রেড পান্ডা এবং স্নো লেপার্ড পাড়ি জমিয়েছে গুজরাটে। উদ্ধার হওয়া বন্যপ্রাণীকে কেন নিজেদের বনে ফিরিয়ে না দিয়ে এমন এক সুদূর বেসরকারি চিড়িয়াখানায় হস্তান্তর করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলার বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ তিয়াসা আঢ্য। সরকারি ও উদ্ধারকেন্দ্রের তকমা ব্যবহার করে বন্যপ্রাণীর এই অবাধ হস্তান্তর আদতে একপ্রকার 'লিগ্যালাইজড ট্র্যাফিকিং' কি না, সেই সন্দেহ তীব্র হচ্ছে।
আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রাণী হস্তান্তর এবং হাজার হাজার নথিভুক্ত গরমিলের মাঝেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি খবর তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—পশ্চিমবঙ্গে নাকি নিজস্ব শাখা খুলতে চলেছে বনতারা, এবং এই মর্মে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথাবার্তাও অনেক দূর এগিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ এবং পরিবেশপ্রেমীদের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের তরফে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি চুক্তি বা সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, আলিপুরের প্রাণী বদল এবং বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির ফলেই এই ধরনের জল্পনা সমাজমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিষয়টি নিছক গুজব, নাকি ভেতরে ভেতরে কোনো আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে—সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত ধোঁয়াশা কাটেনি।
যেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানকে রক্ষা করা এবং বনাঞ্চলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া, সেখানে বিপুল পুঁজির জোরে হাজার হাজার বন্যপ্রাণীকে এক ছাদের তলায় জড়ো করার এই প্রবণতা ভারতের সামগ্রিক পরিবেশ নীতিকেই এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
