

আজকের মতো ফুড ডেলিভারি অ্যাপ, ফুড কোর্ট কিংবা এসি রেস্তরাঁ তখন ছিল না। ছবি - Google.
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
আজ ‘পাইস হোটেল’ নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভাত, ডাল, মাছের ঝোল। কিন্তু এই ‘পাইস’ আসলে কী? এক পয়সার খাবার? নাকি আরও বড় কোনও ইতিহাস? সকাল আটটা। শিয়ালদহ স্টেশনে তখন ট্রেন থেকে নেমে আসছে জেলার মানুষ। কারও হাতে লোহার ট্রাঙ্ক, কারও কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। কেউ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে, কেউ আদালতের কাজে, কেউ বা কলেজে ভর্তি হতে। শহরে পা রেখেই সবার প্রথম প্রশ্ন, "কম টাকায় কোথায় খাওয়া যাবে?"
আজকের মতো ফুড ডেলিভারি অ্যাপ, ফুড কোর্ট কিংবা এসি রেস্তরাঁ তখন ছিল না। কিন্তু ছিল এক আশ্চর্য ব্যবস্থা, পাইস হোটেল। এমন এক হোটেল, যেখানে পকেটে মাত্র কয়েকটি পয়সা থাকলেও দুপুরের ভাত জুটে যেত। এই হোটেলের জন্ম কোনও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থেকে নয়। জন্ম হয়েছিল প্রয়োজন থেকে।
আজকের প্রজন্মের কাছে 'পাইস' শব্দটা প্রায় অচেনা। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থায় 'পাই' ছিল সবচেয়ে ছোট এককগুলির একটি। সেই 'পাই' বা 'পয়সা' হিসেবেই খাবারের দাম ধার্য করা হত। এক থালা ভাতের দাম ধরা হত কয়েক পাই বা কয়েক পয়সা। মাছ, ডাল, তরকারি— প্রতিটির আলাদা দাম। খদ্দের যতটুকু খেতেন, ততটুকুরই দাম দিতেন। অর্থাৎ আজকের 'থালি' নয়, তখনকার খাবার ছিল অনেকটা 'পে পার আইটেম' ব্যবস্থা। এক প্লেট ভাত, এক বাটি ডাল, এক টুকরো মাছ, সবকিছুর আলাদা হিসাব। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নাম হয়ে যায়, 'পাইস হোটেল'।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বড় শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র। বন্দর, জুটমিল, আদালত, কলেজ, সরকারি অফিস প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজের জন্য শহরে আসতেন। তাঁদের অধিকাংশেরই পক্ষে বড় হোটেলে খাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার সারাদিন না খেয়ে কাজ করাও সম্ভব ছিল না। এই শূন্যস্থানই পূরণ করেছিল পাইস হোটেল। এ যেন শহরের প্রথম 'জনগণের রেস্তরাঁ'। এখানে কেউ অতিথি নয়, সবাই খদ্দের।
আজকের রেস্তরাঁয় মেনু আগে ছাপা হয়। পাইস হোটেলে উল্টো। ভোরে বাজারে যে মাছ সবচেয়ে ভালো মিলল, সেই মাছই দুপুরে রান্না।
কখনও পারশে, কখনও কাতলা, কখনও চিতল, কখনও মৌরলা। শীতকালে ফুলকপি, গ্রীষ্মে পটল, বর্ষায় কচুশাক। অর্থাৎ ঋতুই ঠিক করত দুপুরের থালা।
খাবারের এই সরলতাই তাকে আলাদা করেছে। কারণ এখানে রান্না হত বাড়ির জন্য যেমন হয়, ব্যবসার জন্য তেমন নয়। কলেজ স্ট্রিটের বুদ্ধিজীবী থেকে ট্রামচালক, একই টেবিলে দুপুরের ভাত! পাইস হোটেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই সামাজিক সমতা। একই বেঞ্চে বসে খাচ্ছেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক, বই বিক্রেতা, ট্রাম কন্ডাক্টর, আদালতের কেরানি, কলেজের ছাত্র। খাবারের টেবিলে পরিচয় ছিল না পদমর্যাদার। ছিল শুধু খিদে। এই কারণেই পাইস হোটেল শুধু খাবারের জায়গা নয়, কলকাতার সামাজিক ইতিহাসেরও এক অনন্য অধ্যায়।
কলেজ স্ট্রিটে একসময় অনেক পাইস হোটেল ছিল। কিন্তু সব ক'টি শতবর্ষের স্মৃতি নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। 'মহল'-এর বিশেষত্ব এখানেই। এটি শুধু একটি পাইস হোটেল নয়। এর অতীত জুড়ে রয়েছে বোর্ডিং হাউসের ইতিহাস, সাহিত্যিকদের স্মৃতি, আর উত্তর কলকাতার বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার দলিল। এখানে বসে ভাত খাওয়া মানে শুধু দুপুরের খাবার নয়— এক টুকরো ইতিহাসের সঙ্গে বসে থাকা।
শহর বদলেছে। পাঁচতারা হোটেল এসেছে। ফুড অ্যাপ এসেছে। তবু দুপুরে 'মহল'-এর সামনে লাইন পড়ে। কারণ মানুষ শুধু খাবার কিনতে আসে না। একটু পুরনো কলকাতা, একটু বাড়ির রান্না, আর একটু স্মৃতি! এই তিনটিই একসঙ্গে পাওয়া যায় এখানে। সম্ভবত সেই কারণেই এক পয়সার দর্শন আজও কোটি টাকার শহরে বেঁচে আছে।
(চলবে)
পরের পর্বে
রান্নাঘরের ভিতরের গল্প: কাঠের বেঞ্চ, কলাপাতা! পাইস হোটেলের অন্দরমহল
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।