

দুর্গোৎসব ঘিরে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত বাঙালি। ছবি - Google
২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শরৎকালের আকাশ-বাতাস যেন আগাম জানান দিতে শুরু করে পুজো আসছে। এই পুজো ঘিরেই বছরভর বাঙালি প্রতীক্ষায় থাকে। তাকে কেন্দ্র করে কত নস্টালজিয়া! স্মৃতিমেদুর বাঙালি নস্টালজিয়ায় ভুগবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাঙালি হলেই কি পুজোকে ঘিরে সবার একইরকম নস্টালজিয়া থাকে? না। পরিবেশ, পরিস্থিতি, আর্থিক অবস্থা বহু কিছু পাল্টে দেয়। পুজোকে ঘিরে বাঙালির নস্টালজিয়ার সেই বহুস্বর নিয়েই এই প্রতিবেদন।
শরতের নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ জমতে শুরু করলেই বাঙালির অবচেতনে একটা সুইচ অন হয়ে যায়। বাতাসে শিউলির গন্ধ আর দূরে কোথাও বেজে ওঠা ঢাকের আওয়াজ জানান দেয় উৎসবের। যার শুরুটা মোটামুটি বিশ্বকর্মা পুজো দিয়ে হয়ে যায়। অবশ্য আজকাল অনেক জায়গায় গণেশ চতুর্থী দিয়ে শুরু হচ্ছে।
এই আবহের এর সঙ্গেই মনে এসে হানা দেয় এক গভীর স্মৃতিকাতরতা। আমরা যাকে সহজ ভাষায় নস্টালজিয়া বলি। কিন্তু এই অনুভূতি কি সব বাঙালির ক্ষেত্রে একরকম? একটু তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, বাংলার ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও আর্থসামাজিক কাঠামোর মতো দুর্গাপুজো ঘিরে বাঙালির নস্টালজিয়াও বহুধা বিভক্ত। মানুষের অবস্থান, শ্রেণি, অর্থনীতি এবং মনস্তত্ত্ব ঠিক করে দেয় উৎসবের দিনগুলোতে তার স্মৃতির রং কেমন হবে।
শহুরে বাঙালির কাছে দুর্গাপুজোর নস্টালজিয়া মূলত এক ধরনের মানসিক এসকেপিজম বা পলায়নবৃত্তি স্বরূপ। কংক্রিটের জঙ্গল আর কর্পোরেটের ইঁদুর দৌড়ে ক্লান্ত শহুরে বাঙালি এই সময়টায় একটু হাঁফ ছাড়তে চায়। তাদের স্মৃতিকাতরতায় থাকে নব্বইয়ের দশকের পাড়ার পুজো, নতুন জামার গন্ধ কিংবা বনেদি বাড়ির সাবেকিয়ানা। আধুনিক জীবনের একাকিত্ব থেকে বাঁচতে তারা অতীতের এক রোমান্টিক আশ্রয়ে ফিরে যেতে চায়। সেটা অন্তত মানসিকভাবে হলেও।
অন্যদিকে গ্রাম বাংলার ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে পুজো মানে থিমের চাকচিক্য নয়। শরৎকাল ও দুর্গাপুজো কেন্দ্রিক গ্রামের মানুষের নস্টালজিয়া আবর্তিত হয় অপেক্ষার মনস্তত্ত্ব ঘিরে। জীবিকার তাগিদে যে সন্তান শহরে বা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে, এই সময় তাদের ফিরে আসার আশায় প্রহর গোনেন গ্রামের বয়স্ক মানুষগুলো। তাদের কাছে উৎসবের স্মৃতি মানেই হল শূন্য ভিটেয় আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাওয়া। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি এক ধরনের এমপটি নেস্ট সিনড্রোমের উপশম।
ভৌগোলিক অবস্থান কীভাবে নস্টালজিয়াকে বদলে দেয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদ। বাঘ আর কুমিরের সঙ্গে নিত্য লড়াই করা এই মানুষগুলোর কাছে মা দুর্গা কেবল আরাধনার দেবী নন। তিনি রক্ষাকর্ত্রী। তাদের নস্টালজিয়ায় মিশে থাকে এক গভীর ট্রমা এবং বেঁচে থাকার লড়াই। আয়লা বা আমফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে সব হারানোর স্মৃতি তাদের তাড়া করে ফেরে। তাদের কাছে পুজোর নস্টালজিয়া মানে এমন এক নিরাপদ অতীতের খোঁজ, যখন প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাদের উৎসবের আনন্দ কেড়ে নেয়নি। বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎসবের কটা দিন তাদের কাছে এক পরম স্বস্তির স্মৃতি হিসেবে ফিরে আসে।
তবে এর চেয়েও পুজো ঘিরে নস্টালজিয়ার মর্মান্তিক রূপ দেখা যায় মালদহের ভুতনির চর বা মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের নদী ভাঙনে বিপর্যস্ত এলাকাগুলোতে। গঙ্গা করাল গ্রাসে যাদের ভিটেমাটি তলিয়ে গেছে তাদের কাছে উৎসবের দিনগুলো বড্ড নিষ্ঠুর। পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ তাদের মনে আনন্দ জাগায় না, বরং উস্কে দেয় এক বুক চেরা হাহাকার। তলিয়ে যাওয়া পৈতৃক ভিটে আর নদীগর্ভে বিলীন হওয়া চণ্ডীমণ্ডপের স্মৃতি তাদের কাছে এক দীর্ঘায়িত শোক বা প্রলংড গ্রিফ। এদের নস্টালজিয়ায় কোনও রোমান্টিসিজম নেই। এটি কেবলই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার প্রতি এক অন্তহীন শূন্যতাবোধ।
ভৌগোলিক সীমানার জেরে নস্টালজিয়ার রং বদলে বদলে যায়। দক্ষিণবঙ্গে পুজোর স্মৃতিতে মিশে থাকে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বনেদি ইতিহাস এবং নদীর ধারের প্রাচীন জনপদগুলোর সাবেকি ঐতিহ্য। সেখানে উৎসবের আয়তন বিশাল এবং সর্বজনীন। বিপরীতে উত্তরবঙ্গের নস্টালজিয়া তৈরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন উপাদানে। হিমালয়ের পাদদেশ, চা বাগানের শান্ত পরিবেশ আর রাজবংশী লোকায়ত সংস্কৃতির মেলবন্ধনে সেখানকার পুজো অনেক বেশি স্নিগ্ধ।
উত্তরের বাতাসে পুজো আসার আগেই যে শিরশিরে ঠান্ডা ভাব তৈরি হয়, তা সেখানকার মানুষের মনে এক অদ্ভুত মায়াবী স্মৃতিকাতরতা তৈরি করে। পাহাড় বা ডুয়ার্সের চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে উৎসবের দিনগুলো দৈনন্দিন কঠিন শ্রম থেকে ক্ষণিকের মুক্তি হিসাবে দেখা দেয়। তাদের নস্টালজিয়ায় থাকে সহজ সরল গ্রামীণ আড্ডা আর নিজেদের মাটির কাছাকাছি থাকার এক অনাবিল শান্তি।
দেশ বা রাজ্যের সীমানা পেরোলে নস্টালজিয়ার চরিত্র আবার নতুন রূপ নেয়। বেঙ্গালুরুর আইটি হাব থেকে শুরু করে সুদূর নিউ জার্সির বুকে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো হল আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রবাসের মাটিতে তাদের নস্টালজিয়া মূলত এক ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় থেকে জন্ম নেয়।
প্রবাসীরা হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও উইকেন্ডের পুজোয় একটুকরো কলকাতাকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করেন। তাদের স্মৃতিকাতরতা আবর্তিত হয় পরবর্তী প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানোর তাগিদ ঘিরে। ঢাকের শব্দ বা ভোগের খিচুড়ি প্রবাসীর কাছে কেবলই উৎসবের অঙ্গ নয়। এগুলো হল তাদের ফেলে আসা দেশ আর বর্তমান ঠিকানার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের এক অত্যন্ত জরুরি মনস্তাত্ত্বিক সেতু।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
