

মহাবংশের কাহিনী অনুযায়ী বঙ্গের সেই ব্যভিচারী রাজকন্যার প্রতীকী ছবি - AI
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বঙ্গের এক রাজকন্যা এতই ব্যভিচারী ছিলেন যে, রাজপ্রাসাদ থেকে পালিয়ে তিনি জঙ্গলে গিয়ে এক সিংহের সঙ্গে সহবাস করতেন। তাঁদের একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান হয়। সেই রাজকন্যার এক নাতির হাত ধরেই জন্ম হয় প্রাচীন সিংহলের, যা আজ শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত! শ্রীলঙ্কার প্রাচীন গ্রন্থ মহাবংশের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছে এই কাহিনী।
আজকের শ্রীলঙ্কার আদি নাম ছিল সিংহল। কিন্তু কীভাবে এবং কোথা থেকে এই সিংহল নামটি এসেছিল, তা নিয়ে বহু কাহিনী প্রচলিত আছে। কিন্তু এর শিকড় যে প্রাচীন বাংলার এক চরম কেলেঙ্কারি আর নিষিদ্ধ প্রেমের উপাখ্যানে লুকিয়ে আছে, তা অনেকেই জানেন না।
পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত শ্রীলঙ্কার পালি ভাষার মহাকাব্যিক ইতিবৃত্ত 'মহাবংশ'-এ এই কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে। এই কাহিনীতে একইসঙ্গে রয়েছে রোমাঞ্চ, নিষিদ্ধ প্রেম, পিতৃহত্যা এবং ভাই-বোনের বিবাহ বা ইনসেস্ট-এর মতো নিষিদ্ধ বিষয়। আধুনিক ফ্যান্টাসি সিরিজের গল্পকেও হার মানাতে পারে প্রাচীন বাংলার এই আদিম ও বন্য উপাখ্যান।
মহাবংশের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছে, প্রাচীন বঙ্গদেশের রাজার স্ত্রী ছিলেন কলিঙ্গের (আজকের ওড়িশা) রাজকন্যা। তাঁদের এক অসামান্য সুন্দরী কন্যাসন্তান ছিল। কিন্তু সেই মেয়ে রাজপ্রাসাদের ধরাবাঁধা রীতিনীতির তোয়াক্কা করত না। সে ছিল অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও বেপরোয়া স্বভাবের। বাধ্য হয়ে রাজপরিবারের সম্মান রক্ষার্থে তাকে অনেক সময়ই বন্দি করে রাখতে হত। কিন্তু একদিন রাজকন্যা প্রাসাদ থেকে পালিয়ে যায়। ভাগ্যান্বেষণে সে মগধগামী এক বণিকদলের সঙ্গে মিশে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়।
বণিকদলটি যখন রাঢ় দেশের এক গহীন অরণ্য পার হচ্ছিল, তখন এক বিশাল সিংহ তাদের আক্রমণ করে। প্রাণভয়ে বণিকদলের সবাই পালিয়ে যায়। কিন্তু বঙ্গদেশের রাজকন্যাটি পালাননি। তিনি নির্ভয়ে সেই পশুর সামনে গিয়ে দাঁড়ান। মহাবংশের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজকন্যার রূপ ও সাহসে সিংহটি মুগ্ধ হয়ে যায়। সে রাজকন্যাকে নিজের পিঠে চাপিয়ে জঙ্গলের মধ্যে এক গোপন গুহায় নিয়ে যায়। সেখানে শুরু হয় তাদের এক অবিশ্বাস্য ও নিষিদ্ধ সহবাস। রাজকন্যা এবং সিংহের মিলনে জন্ম নেয় এক জোড়া যমজ সন্তান। ছেলের হাত ও পা ছিল অবিকল সিংহের থাবার মতো। তাই তার নাম রাখা হয় সিংহবাহু। আর মেয়ের নাম রাখা হয় সিংহসীবলী।
সিংহটি তার পরিবারকে প্রচণ্ড ভালোবাসত। তাই শিকারে যাওয়ার সময় রোজ গুহার মুখে এক বিশাল পাথর চাপা দিয়ে যেত, যাতে তারা পালাতে না পারে। কিন্তু ছেলে সিংহবাহু যখন ১৬ বছরের যুবক হল, তখন একদিন সে তার মায়ের কাছে তাদের আসল পরিচয় জানতে পারে। মায়ের ধমনীতে রাজরক্ত বইছে জানার পর সিংহবাহুর মধ্যে মানুষের জগতে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। একদিন সিংহটি শিকারে গেলে সিংহবাহু নিজের অসীম শক্তি প্রয়োগ করে গুহামুখের পাথর সরিয়ে ফেলে। তারপর মা ও বোনকে নিয়ে লোকালয়ে পালিয়ে যায়।
বনের সীমান্তে এসে তাদের পরিচয় হয় বঙ্গদেশের এক সেনাপতির সঙ্গে। তিনি আবার সম্পর্কে ছিলেন রাজকন্যা, অর্থাৎ সিংহবাহু'র মায়ের এক তুতো ভাই। ওই সেনাপতি রাজকন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে বিবাহ করেন এবং তাদের আশ্রয় দেন।
এদিকে গুহায় ফিরে পরিবারকে না দেখতে পেয়ে সিংহটি পাগল প্রায় হয়ে যায়। স্ত্রী ও সন্তানদের খোঁজে সে রাঢ় ও বঙ্গদেশের জঙূ সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ব্যাপক তাণ্ডব চালাতে শুরু করে। সিংহের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে বঙ্গদেশের রাজা ঘোষণা করেন, যে এই সিংহকে হত্যা করতে পারবে তাকে বিপুল পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কারের লোভে এবং নিজের ক্ষমতা প্রমাণের নেশায় সিংহবাহু এগিয়ে যায়। সে তার জন্মদাতা পিতাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বনের ধারে ছেলের সঙ্গে সিংহের দেখা হয়। পুত্রকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সিংহটি ছুটে আসে ছেলেকে আলিঙ্গন করবে বলে। কিন্তু মনুষ্য সমাজে স্বীকৃতি পাওয়ার লোভে অন্ধ সিংহবাহু নির্মমভাবে তির ছুড়ে নিজের পিতাকেই হত্যা করে। প্রাচীন সাহিত্যে পিতৃহত্যার এমন নিষ্ঠুর উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায়।
পিতৃহত্যার পুরস্কার স্বরূপ সিংহবাহু বিপুল সম্পদ পান রাজার কাছ থেকে। কিন্তু সে বঙ্গদেশে না থেকে রাঢ়ের জঙ্গলে ফিরে যায়। সেখানে জঙ্গল কেটে সিংহপুর নামে এক নতুন নগরী ও রাজ্যের পত্তন করে। এরপর আসে কাহিনীর সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। রাজবংশের রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে রাজা সিংহবাহু তার নিজের যমজ বোন সিংহসীবলীকেই বিবাহ করেন। প্রাচীনকালে যেমনটা বহু রাজ পরিবারে হত। তাদের ষোলো জোড়া যমজ সন্তানের জন্ম হয়। এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন যুবরাজ বিজয়।
এই বিজয় ছিল অত্যন্ত উদ্ধত ও অত্যাচারী প্রকৃতির। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সিংহপুরের প্রজারা বিদ্রোহ করে। তারা বিজয়ের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। বাধ্য হয়ে রাজা সিংহবাহু ছেলে বিজয় এবং তার ৭০০ অনুগামীকে মাথা মুড়িয়ে একটি জাহাজে তুলে দেশ থেকে নির্বাসিত করে দেন। সেই জাহাজ ভাসতে ভাসতে গিয়ে পৌঁছায় লঙ্কা দ্বীপে।
গৌতম বুদ্ধ যেদিন পরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন, ঠিক সেই দিনটিতেই বিজয় লঙ্কায় পা রাখে। সেখানে যক্ষদের পরাস্ত করে বিজয় নিজের রাজত্ব স্থাপন করে। যেহেতু তিনি সিংহবাহুর পুত্র, তাই তার বংশধররা সিংহল নামে পরিচিত হয়। আর দ্বীপটির নাম হয় সিংহল দ্বীপ।
মহাবংশের এই কাহিনীকে কেবল একটি রূপকথা বা রোমাঞ্চকর গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বাংলার সমাজ ও রাজনীতির এক গভীর চালচিত্র। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীনকালে রাঢ় অঞ্চলে কোনও পশুর সঙ্গে মানুষের মিলনের বিষয়টি মোটেও সত্যি নয়। সম্ভবত, রাঢ় অঞ্চলের কোনও আদিবাসী বা শবর সম্প্রদায়ের দলপতির সঙ্গে বঙ্গ রাজকন্যার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। সেই আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রতীক বা টোটেম ছিল সিংহ। তা থেকেই আর্য প্রভাবিত মহাবংশের লেখক রাঢ়ের সেই অবৈদিক আদিবাসী দলপতিকে আক্ষরিক অর্থেই বন্য পশু বা সিংহ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
ভাই-বোনের বিবাহের এই ঘটনাটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন রাজবংশ স্থাপন করার পর নিজেদের রক্তের বিশুদ্ধতা ধরে রাখতে রাজপরিবারের অন্দরে অজাচার বা ইনসেস্ট মোটেও বিরল ঘটনা নয়। বরং মিশর বা ইনকা সভ্যতার মতো প্রাচীন বাংলায় বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও যে এমন প্রথা চালু ছিল এই কাহিনী তারই ইঙ্গিত দেয়।
এই উপাখ্যান থেকে আরও একটি ঐতিহাসিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে- প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গ ও রাঢ় অঞ্চলের সঙ্গে আজকের শ্রীলঙ্কার সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ ছিল। তাম্রলিপ্ত বন্দরের মতো কোনও প্রাচীন বন্দর দিয়েই হয়ত এই যাতায়াত চলত। মহাবংশের এই আখ্যান হয়ত অক্ষরে অক্ষরে সত্য নয়। কিন্তু এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বাংলার সমাজ, রাজনীতি আর মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলির প্রতিচ্ছবি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
