৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্রের জেরে বঙ্গে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ!

সেই ব্যাঙ্গচিত্র ও সম্রাট অশোক। প্রতীকী ছবি - AI

ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্রের জেরে বঙ্গে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ!

calender icon 2 ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

ব্যঙ্গচিত্রের জেরে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোক' হওয়া সম্রাট অশোক?

পুণ্ড্রবর্ধনে বসবাসকারী এক অ-বৌদ্ধ ব্যক্তি একটি ছবি আঁকেন। ছবিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্র। সেখানে দেখানো হয়, গৌতম বুদ্ধ একজন নগ্ন সন্ন্যাসীর পায়ে মাথা নত করে প্রণাম করছেন। এই নগ্ন সন্ন্যাসী ছিলেন চব্বিশতম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর। এই ঘটনা জানতে পেরে সম্রাট অশোক নাকি ক্ষেপে গিয়ে আবার 'চণ্ডাশোক'-এর মূর্তি ধারণ করে পুণ্ড্রবর্ধনের ১৮,০০০ মানুষের গর্দান কেটে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন!

মূল বিষয়

ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন নিয়ে আজকের পৃথিবীতে বিতর্ক ও রক্তপাতের শেষ নেই। খবরের কাগজ বা ডিজিটাল মিডিয়ার পাতা খুললেই আজকাল হামেশা চোখে পড়ে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগার খবর। মহানবী মহম্মদকে নিয়ে স্রেফ ব্যঙ্গচিত্র আঁকার অপরাধে শিল্পীকে প্রাণ হারাতে হয়। প্যারিসের শার্লি হেবদোর দফতরে ঢুকে উন্মত্ত বন্দুকবাজরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়।

ধর্ম এবং শিল্পের এই সংঘাতকে অনেকেই একেবারে আধুনিক যুগের একটি সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এই অসহিষ্ণুতার শেকড় অনেক গভীরে পোঁতা। প্রায় দুহাজার বছরেরও বেশি সময় আগে প্রাচীন বাংলার বুকেই ঠিক এমনটা ঘটেছিল। একটি ব্যঙ্গচিত্রের জেরে একদিনে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়েছিল! আর আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ভয়াবহ নির্দেশ দিয়েছিলেন শান্তির পূজারি বলে পরিচিত স্বয়ং সম্রাট অশোক।

আধুনিক অসহিষ্ণুতার প্রাচীন কেন্দ্র সেদিনের পুণ্ড্রবর্ধন

মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনকাল চলছে তখন। বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেই সময় সরাসরি মগধের অধীনে। এই ঘটনার মূল কেন্দ্রস্থল ছিল প্রাচীন বাংলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এবং বাণিজ্যিক শহর পুণ্ড্রবর্ধন। আজকের দিনের মানচিত্রে খুঁজলে এর অবস্থান হবে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় এবং তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেযুগে এই পুণ্ড্রবর্ধন নগরীতে হিন্দু এবং বৌদ্ধদের পাশাপাশি জৈন এবং আজীবিক সম্প্রদায়ের মানুষেরাও প্রচুর সংখ্যায় বসবাস করতেন। সেখানেই এমন ভয়াবহ কাণ্ড ঘটেছিল বলে অশোকাবদান-এ উল্লেখ করা আছে।

একটি বিতর্কিত ছবি এবং অশোকের রোষানল

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ দিব্যাবদান-এর একটি বিশেষ অংশ হল অশোকাবদান। এই গ্রন্থেই পুরো ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তাতে বলা আছে, পুণ্ড্রবর্ধনে বসবাসকারী এক অ-বৌদ্ধ ব্যক্তি একটি ছবি আঁকেন। ছবিটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্র। সেখানে দেখানো হয়েছিল, গৌতম বুদ্ধ একজন নগ্ন সন্ন্যাসীর পায়ে মাথা নত করে প্রণাম করছেন। এই নগ্ন সন্ন্যাসীকে গ্রন্থে 'নির্গন্থ জ্ঞাতিপুত্র' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্গন্থ জ্ঞাতিপুত্র আসলে চব্বিশতম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর। যিনি মহাবীর জৈন নামে অধিক সমাদৃত।

এই ব্যঙ্গচিত্র আঁকার খবর খুব দ্রুত মগধের রাজধানী পাটলিপুত্রে পৌঁছায়। স্বয়ং বুদ্ধকে এইভাবে অবমাননা করা হয়েছে শুনে সম্রাট অশোক ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি এতটুকু সময় নষ্ট করেননি। পুণ্ড্রবর্ধনের রাজকর্মচারীদের কাছে সরাসরি সম্রাটের ফতোয়া এসে পৌঁছায়। নির্দেশ দেওয়া হয় যারা এই অবমাননার সঙ্গে যুক্ত তাদের যেন চরম শাস্তি দেওয়া হয়। রাজকীয় সেনারা সেই নির্দেশ পালন করতে পুণ্ড্রবর্ধনে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। একদিনে ১৮,০০০ মানুষের ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দেয়!

কার গর্দান গেল- জৈন নাকি আজীবিক?

ইতিহাসের এক অদ্ভুত ধাঁধা লুকিয়ে আছে ঠিক এই জায়গাতেই। ছবিটি যিনি এঁকেছিলেন তিনি ছিলেন একজন নির্গন্থ বা জৈন ধর্মাবলম্বী। কিন্তু অশোকাবদান গ্রন্থ অনুসারে সম্রাট অশোক নির্দেশ দেন, পুণ্ড্রবর্ধনের সমস্ত আজীবিকদের হত্যা করতে। অপরাধ করল জৈনরা আর শাস্তি পেল আজীবিকরা! এমনটা কেন হল তার এক নিখুঁত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এ এল ব্যাশাম।

আরও পড়ুন
বঙ্গের এক স্ক্যান্ডাল থেকে জন্ম সিংহলের?
শরতে স্মৃতির ক্যানভাস- দুর্গোৎসব ঘিরে বাঙালির নস্টালজিয়ার বহুস্বর
‘মৃত্যুভোজ’ নিয়ে বদলাচ্ছে সমাজের পুরনো ভাবনা
“রাস্তার নাম পালটায় একদিন”

তাঁর বিখ্যাত বই হিস্ট্রি অ্যান্ড ডকট্রিনস অফ দ্য আজীবিকাস গ্রন্থে ব্যাশাম এই বিভ্রান্তির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভারতবর্ষের যে সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম রাজ অনুগ্রহ পেয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে, সেই সময় তাদের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিল জৈন এবং আজীবিক সম্প্রদায়। এই দুই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরাই নগ্ন থাকতেন এবং চরম কৃচ্ছ্রসাধন করতেন। পরবর্তীকালে আজীবিক সম্প্রদায়ের প্রভাব ক্রমশ কমে আসে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সম্রাট অশোকের মা নিজে আজীবিক সম্প্রদায়ের ছিলেন।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের দিকে যখন বৌদ্ধ লেখকরা অশোকাবদান সঙ্কলন করছেন, তখন তাঁদের কাছে সম্ভবত জৈন এবং আজীবিকদের মধ্যকার পার্থক্য খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে সেই সময়ের গোঁড়া বৌদ্ধ লেখকরা অজ্ঞতাবশত তাঁদের সমস্ত বিরোধী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে একই সারিতে ফেলে বিচার করতেন। সেই ঐতিহাসিক বিভ্রম থেকেই সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ লেখক নির্গন্থের অপরাধের শাস্তির জায়গায় আজীবিকদের নাম লিখে ফেলেছিলেন।

চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক হয়েও এ কেমন নিষ্ঠুরতা?

এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিচার করতে বসে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হল, সম্রাট অশোকের ভূমিকা। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত দেখে যিনি মর্মাহত হয়েছিলেন, তিনি কীভাবে এমন গণহত্যা ঘটাতে পারেন, তা নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক প্রশ্ন তুলেছেন। ততদিনে তো তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোক'-এ পরিণত হয়েছেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং অহিংসার বাণী প্রচার করছেন। তাহলে কেন এই চরম নিষ্ঠুরতা।

ওই গ্রন্থে দেখানো হয়েছে, বুদ্ধের প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তি থেকেই অশোক নাকি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই যুক্তির সঙ্গে ঐতিহাসিকদের একাংশ সহমত নন। রোমিলা থাপারের মতো ঐতিহাসিকদের মতে, অহিংসার পূজারি এক সম্রাটের পক্ষে স্রেফ একটি ছবির জন্য একদিনে ১৮,০০ মানুষকে হত্যা করার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং স্ববিরোধী।

মিথ বনাম বাস্তব: ঐতিহাসিকরা কে কী বলছেন?

ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই গণহত্যার কাহিনীকে আক্ষরিক অর্থে সঠিক বলে মানতে রাজি নন। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার তাঁর গবেষণায় স্পষ্ট দেখিয়েছেন, সম্রাট অশোক তাঁর শিলালিপিগুলোতে বারবার সব ধর্মের প্রতি সহনশীলতার কথা প্রচার করেছেন। সপ্তম এবং দ্বাদশ শিলালিপিতে তিনি বলেছেন, নিজের ধর্মের প্রতি অনুরাগ দেখাতে গিয়ে অন্য ধর্মকে ছোট করা মারাত্মক অপরাধ। যিনি স্বয়ং আজীবিক সন্ন্যাসীদের বসবাসের জন্য বারবারাবর পাহাড়ে সুন্দর গুহা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, তিনি হঠাৎ তাঁদের কচুকাটা করবেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে যখন অশোকাবদান লেখা হচ্ছে, তখন উগ্র বৌদ্ধ সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সম্রাট অশোক যে বৌদ্ধধর্মের সম্মানের জন্য কতটা কঠোর হতে পারেন, সেই ভীতিকর ভাবমূর্তি তৈরি করার জন্যই এই অতিরঞ্জিত গল্পটি ফাঁদা হয়েছিল বলে এই ঐতিহাসিকরা মনে করেন।

অশোক হয়ত সত্যিই এমন কিছু করেননি। কিন্তু ব্যঙ্গচিত্রের জেরে হত্যার এই আখ্যান প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং শিল্পের কন্ঠরোধ করার মানসিকতা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের মজ্জায় মিশে আছে। আর তার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য