৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
দশভুজার বাংলায় রাজনীতির টানাপোড়েন ও দুর্গাপুজোর শাশ্বত রূপ

রাজনীতির ঘেরাটোপে এবারের দুর্গাপুজো? ছবি - AI

দশভুজার বাংলায় রাজনীতির টানাপোড়েন ও দুর্গাপুজোর শাশ্বত রূপ

calender icon 2 ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

উৎসবের আকাশে আশঙ্কার মেঘ

‘দ্য প্রিন্ট’ (ThePrint)-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটির মূল নির্যাস হল—২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আহারের স্বাধীনতা (নিরামিষ বনাম আমিষ) ও বিভিন্ন প্রশাসনিক নির্দেশিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রবন্ধটি স্পষ্ট করে যে, দুর্গাপূজাকে ঘিরে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই বাংলায় নতুন নয়; ব্রিটিশ আমল, দীর্ঘ বাম জমানা এবং তৃণমূলের দশক পেরিয়ে এই উৎসব সবসময়ই টিকে থেকেছে। শাসক বা মতাদর্শ বদলালেও বাঙালির সর্বজনীন শারদোৎসব কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘেরাটোপে বন্দি না হয়ে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেই অমলিন থাকবে।

মূল বিষয়

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, তবে শরৎকালের এই কয়েকটি দিন যেন গোটা জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ। মহালয়ার ভোর থেকে শুরু করে বিজয়ার সিঁদুরখেলা পর্যন্ত বঙ্গজীবন এক অনন্য আবেগে ভেসে যায়। তবে ২০২৬ সালের শারদোৎসবে সেই চেনা আনন্দের আবহে যুক্ত হয়েছে তীব্র এক রাজনৈতিক গুঞ্জন। কলকাতার কফি হাউসের ধোঁয়া ওঠা কাপ থেকে শুরু করে  সম্প্রতি ‘দ্য প্রিন্ট’ (ThePrint)-এ প্রকাশিত একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ অবলম্বনে—সর্বত্রই একটি আলোচনা ঘুরেফিরে আসছে: বাংলার প্রাণস্পন্দন দুর্গাপূজা কি কোনো ‘গেরুয়া ঘেরাটোপে’ বন্দি হতে চলেছে?

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক তৎপরতাকে কেন্দ্র করে অনেকের মনেই শঙ্কা জেগেছে যে, দুর্গাপূজার চিরাচরিত ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন চরিত্রকে কি একটি নির্দিষ্ট হিন্দুত্ববাদী আধ্যাত্মিক ছাঁচে ঢালার চেষ্টা চলছে? তবে ইতিহাস সাক্ষী, এমন আশঙ্কা হয়তো অমূলক। কারণ বাঙালির দুর্গাপূজা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ছায়ায় বড় হয়নি; শতকের পর শতক ধরে চলা নানা মত, সংঘাত আর সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের মধ্য দিয়েই এটি তার শাশ্বত রূপ ধারণ করেছে।

বাগেশ্বর ধামের বিতর্ক এবং বাঙালির তীব্র প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক এই বিতর্কের সূত্রপাত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর কিছু নির্দেশিকা দিয়ে। তারা আহ্বান জানায়, পূজা মণ্ডপের আশপাশে যেন আমিষ খাবারের কেনাবেচা বন্ধ রাখা হয়। বিষয়টির তীব্রতা চরমে পৌঁছায় যখন বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী হাওড়ার এক ধর্মীয় সভায় ঘোষণা করেন যে, দুর্গাপূজার দিনগুলোতে আমিষ খাদ্য গ্রহণ করা ‘অপবিত্রতা’। তিনি রাজ্য সরকারের কাছে পূজা চলাকালীন মাংস ও মদের দোকান বন্ধের দাবি জানান এবং ভক্তদের মোবাইলের আলো জ্বেলে এই দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে বলেন।

এই মন্তব্য বঙ্গসমাজে ক্ষোভের সঞ্চার করে। বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা কোনো সংযম-কেন্দ্রিক ব্রত নয়, বরং এটি ঘরের মেয়ে উমার বাপের বাড়িতে ফেরার উৎসব—যেখানে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিতর্ক সামাল দিতে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বকেও ময়দানে নামতে হয়। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাফ জানিয়ে দেন, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী ‘অন্য দুনিয়া’র মানুষ এবং বাঙালি কী খাবে বা খাবে না, তা নির্ধারণ করার কোনো এক্তিয়ার বহিরাগত কারও নেই। স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মনে করিয়ে দেন: বাঙালির ঐতিহ্য স্পষ্ট—অষ্টমীতে যদি লুচি-খিচুড়ি হয়, তবে নবমীতে খাসির মাংসের ঝোল ছাড়া বাঙালির চলে না।

নতুন প্রশাসনিক নির্দেশিকা ও রাজনীতির মেরুকরণ

খাদ্যাভ্যাসের বিতর্কের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের নতুন কিছু প্রশাসনিক নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করেও আলোড়ন তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন:

১. মহাষ্টমীর দিন রাজ্যজুড়ে সমস্ত মদের দোকান ও পানশালা বন্ধ থাকবে।

২.উৎসব এবং ভাসানের শোভাযাত্রায় কোনোভাবেই ডিজে (DJ) বাজানো যাবে না।

৩.মহালয়া অর্থাৎ দেবীপক্ষ সূচনার আগে কোনো মণ্ডপের উদ্বোধন করা যাবে না।

৪.মণ্ডপ ও প্রতিমা নির্মাণে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় নান্দনিকতা রক্ষা করতে হবে।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয় বামপন্থী বুকস্টল সংক্রান্ত নির্দেশ নিয়ে। মণ্ডপের চত্বরে বাম দলগুলো যদি স্টলে ‘দুর্গাপূজা’ শব্দের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ হিসেবে ‘শারদোৎসব’ ব্যবহার করে, তবে তাদের স্টল করার অনুমতি না দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়। এর ফলে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে, সরকার পরিকল্পিতভাবে উৎসবের ঐতিহ্যবাহী বহুমাত্রিক চরিত্রকে ভেঙে একে কড়া ধর্মীয় শৃঙ্খলে বাঁধতে চাইছে।

ঔপনিবেশিক আয়না: নবাব, ব্রিটিশ ও জাতীয়তাবাদের দুর্গাপুজো

আরও পড়ুন
ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্রের জেরে বঙ্গে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ!
১৬ লক্ষ নাম ছাঁটাই: তোলপাড় বাংলা
শরতে স্মৃতির ক্যানভাস- দুর্গোৎসব ঘিরে বাঙালির নস্টালজিয়ার বহুস্বর

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, দুর্গাপূজাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা মোটেও নতুন নয়। গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, কলকাতার প্রথম ‘আধুনিক’ দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ শক্তির হাত ধরেই।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব রবার্ট ক্লাইভের সম্মানে এক জাঁকজমকপূর্ণ পূজার আয়োজন করেন। একদিকে মহিষাসুরমর্দিনীর রূপের সঙ্গে ক্লাইভের সামরিক বিজয়কে এক বন্ধনীতে রাখা হয়েছিল, অন্যদিকে সমাজে নবকৃষ্ণ দেবের রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করা হয়েছিল। জানা যায়, রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে নবকৃষ্ণ দেব নতুন স্থানে এই পূজার আয়োজন করেছিলেন, যেখানে নাচ-গান তো বটেই, এমনকি ইংরেজ অতিথিদের তুষ্ট করতে নিষিদ্ধ খাবার ও মদেরও বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল।

তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে এই পূজার চরিত্র আমূল বদলে যায়। ইংরেজদের প্রিয় উৎসবটিই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার:

বিপ্লবী আখড়া: বাগবাজার সর্বজনীন কিংবা সিমলা ব্যায়াম সমিতির মতো পূজাগুলোতে প্রকাশ্যেই শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ও ‘বীরাষ্টমী’র মাধ্যমে সশস্ত্র বিপ্লববাদের দীক্ষা দেওয়া হতো।

গুপ্ত জাতীয়তাবাদ: সরাসরি বিদ্রোহ করা যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’-এর দেশমাতৃকার ভাবাবেগ দেবীর মূর্তির রূপকল্পের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হতো। ব্রিটিশ পুলিশ সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখত এই মণ্ডপগুলোকে, কিন্তু পূজার ধর্মীয় আবরণের কারণে তা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সাহস তাদের ছিল না।

স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার রাজনৈতিক রূপান্তর 

বামফ্রন্ট জমানা: প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে শাসন করা কমিউনিস্টরা পূজার ধর্মীয় ভাবাবেগকে সরিয়ে একে রূপান্তরিত করেছিল এক বিশাল সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। তারা প্রতিমা পূজায় সক্রিয় অংশ না নিলেও মণ্ডপের ঠিক বাইরে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা প্রগতিশীল সাহিত্যের স্টল বসিয়ে নিজস্ব মতাদর্শের প্রচার চালিয়েছে। তাদের কাছে এটি ছিল বছরের সবচেয়ে বড় জনসংযোগ অভিযান।

তৃণমূল জমানা: ২০১১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গাপূজাকে এক বিশ্বজনীন ব্র‍্যান্ডে রূপ দেন। তবে এই পর্বে পূজা সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় বলেও সমালোচনা রয়েছে। ২০১৬ সালে চাকদহে স্বয়ং মমতার আদলে দশভুজা মূর্তি তৈরি, মহালয়ার আগেই ‘পিতৃপক্ষে’ শত শত মণ্ডপ উদ্বোধন, কিংবা ক্লাবে ক্লাবে সরকারি অনুদান বিলি—সবকিছুই দুর্গোৎসবকে তৃণমূলের রাজনৈতিক মহোৎসবে পরিণত করেছিল। এমনকি অতীতে মণ্ডপে সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে আজান বাজানো কিংবা মহরম ও ভাসানের দিনক্ষণ মেলানো নিয়েও কম আইনি ও রাজনৈতিক যুদ্ধ হয়নি।

কলকাতা বনাম জেলা: আড়ম্বর ও অন্তরের দূরত্ব

কলকাতার রাজপথে যখন মতাদর্শের লড়াই আর টিভি চ্যানেলে উত্তপ্ত তরজা চলে, বাংলার মফস্‌সল ও গ্রামাঞ্চলের ছবিটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। ইতিহাসবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুর্গাপূজার এই রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর পরিধি মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক।

শহরতলি, জেলা এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে দুর্গাপূজা কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের বা মেধার বিতর্কের জায়গা নয়। সেখানে এটি এখনো পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং আন্তরিক ভক্তির এক পবিত্র মিলনক্ষেত্র। কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাদ্যি সেখানে আজও কোনো সরকারি ফরমান বা বিরোধী স্লোগানের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব ছন্দে বেজে ওঠে।

শাশ্বত মিলনের জয়গান

যে উৎসব নবকৃষ্ণ দেবের ভোজের টেবিল থেকে শুরু করে চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লড়াই দেখেছে, যে উৎসব তিন দশকের বামপন্থী সাহিত্যের প্রভাব সামলেছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার রাজনৈতিক প্রদর্শনীকে অতিক্রম করেছে—সেই উৎসব কোনো নতুন রাজনৈতিক আবর্তে হারিয়ে যাবে না।

শাসক আসবে, শাসক যাবে। ক্ষমতার রঙ বদলাবে, কিন্তু দশভুজার শক্তি বা তাঁর সন্তানদের আনন্দকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডিতে বেঁধে রাখা অসম্ভব। বিতর্ক, প্রতিবাদ আর মতপার্থক্যকে নিজের বিশাল বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলাই বাংলার সংস্কৃতি। আর সেই কারণেই দুর্গাপূজা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির চিরন্তন স্বাধীন চেতনার এক অমর প্রতীক।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য