

ছবি - AI
২০শে আগস্ট, ২০২৬
কী-বোর্ডে আঙুল ছোঁয়ানোর দরকার নেই। মুখে বলারও প্রয়োজন নেই। শুধু হাত, মুখ এবং শরীরের ভঙ্গিতে নিজের কথা বললেই তা বুঝে নেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সেই ইশারাকে লিখিত ভাষায় বদলে দিয়ে করা যাবে Google-এ সার্চ, পাঠানো যাবে মেসেজ, তৈরি করা যাবে নথি, এমনকি AI-কেও দেওয়া যাবে প্রশ্ন বা নির্দেশ। শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং শ্রবণশক্তি কম এমন মানুষের ডিজিটাল যোগাযোগকে আরও সহজ করার লক্ষ্যেই এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে Google DeepMind। প্রযুক্তিটির নাম SL2T—Sign Language to Text।
ভাবুন, স্মার্টফোন হাতে নিয়ে কোনও তথ্য খুঁজছেন। এত দিন কিবোর্ড খুলে টাইপ করতে হত। অথবা ব্যবহার করতে হত ভয়েস কমান্ড। কিন্তু SL2T-এর ভাবনা কার্যকর হলে ক্যামেরার সামনে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজে প্রশ্ন করলেই চলবে। AI সেই অঙ্গভঙ্গি বিশ্লেষণ করে তাকে লিখিত ভাষায় রূপান্তর করবে। তার পর সেই লেখা দিয়েই ওয়েবে সার্চ। একই ভাবে মেসেজ লেখা, নথি তৈরি কিংবা কোনও AI-কে নির্দেশ দেওয়ার কাজও করা সম্ভব হতে পারে।
তবে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজকে বোঝা মোটেই সহজ কাজ নয়। শুধু হাতের নড়াচড়া দেখলেই তার অর্থ বোঝা যায় না। আঙুলের অবস্থান, হাতের গতি, মুখের অভিব্যক্তি, মাথার নড়াচড়া, শরীরের ভঙ্গি ! সব মিলিয়েই তৈরি হয় একটি অর্থ। সামান্য ভঙ্গির পরিবর্তনেও বদলে যেতে পারে পুরো বাক্যের মানে। সেই জটিলতাই AI-কে শেখানোর চেষ্টা করেছে DeepMind।
এখানেই প্রযুক্তিটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, গোপনীয়তা। ক্যামেরার সামনে সাইন করার অর্থ স্বাভাবিক ভাবেই ব্যবহারকারীর ভিডিয়ো রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। DeepMind-এর প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মডেলটি ভিডিয়োর পরিবর্তে ব্যবহারকারীর শরীরের বিভিন্ন অংশের pose landmarks বা অবস্থানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে সাইন বোঝার চেষ্টা করে। সংস্থার দাবি, মূল ভিডিয়ো দ্রুত মুছে ফেলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে প্রযুক্তিটি কোন ডিভাইসে এবং কী ভাবে ব্যবহৃত হবে, তার উপরই গোপনীয়তার প্রশ্নটি অনেকটাই নির্ভর করবে।
এই AI তৈরির পিছনে রয়েছে বিপুল প্রশিক্ষণ-তথ্য। DeepMind জানিয়েছে, ৫০টিরও বেশি সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের ১ লক্ষ ঘণ্টার বেশি ডেটা ব্যবহার করে মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যার উল্লেখযোগ্য অংশ American Sign Language বা ASL। কারণ পৃথিবীর সব জায়গায় সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ এক নয়। ভাষাভেদে শব্দ, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন এবং প্রকাশের ধরন বদলে যায়। ফলে একটি ভাষায় তৈরি প্রযুক্তিকে অন্য ভাষায় সরাসরি ব্যবহার করা কঠিন।
আর এখানেই SL2T-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সাইন ল্যাঙ্গোয়েজকে প্রথমে কোনও কৃত্রিম ‘গ্লস’-এ বদলে তার পর ইংরেজিতে অনুবাদ করার বদলে সরাসরি লিখিত ভাষায় রূপান্তরের চেষ্টা করছে এই ব্যবস্থা। এতে সাইনের অর্থ, প্রসঙ্গ এবং ভাষার সূক্ষ্মতা আরও ভাল ভাবে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাস্তব ব্যবহারের সমস্যার কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। সব সময় দু’হাত খালি থাকে না। ফোন হাতে নিয়েই হয়তো কাউকে সাইন করতে হবে। সেই পরিস্থিতিতে এক হাতের ব্যবহার নিয়েও প্রযুক্তিকে কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে। বাঁ-হাতি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও মডেলকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এখানেই এখনই উচ্ছ্বাসে লাগাম টানছে DeepMind। প্রযুক্তি এখনও নিখুঁত নয়। দ্রুত আঙুলের বানান, বিরল বা অপ্রচলিত সাইন, জটিল ব্যাকরণ কিংবা পর্যাপ্ত প্রসঙ্গের অভাবে ভুল অনুবাদ হতে পারে। অর্থাৎ মানুষের সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ দোভাষীর সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে যাওয়ার জায়গায় এখনও পৌঁছয়নি AI।
প্রযুক্তি তৈরির সময়ে Deaf community-র মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে DeepMind। গবেষক, সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির সঙ্গে কাজ করে বাস্তব জীবনের সমস্যা এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ গবেষণাগারে একটি মডেল যতই নিখুঁত হোক, মানুষের স্বাভাবিক সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের বৈচিত্র্য ধরতে না পারলে তার বাস্তব উপযোগিতা সীমিতই থেকে যাবে।
তবু সম্ভাবনাটা বড়। এত দিন ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের কথা পৌঁছে দিতে অনেকেরই কিবোর্ড বা অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হত। SL2T সেই ব্যবধানটাই কমানোর চেষ্টা করছে। বিষয়টা এরকম:
ইশারা → লেখা → সার্চ।
ইশারা → লেখা → মেসেজ।
ইশারা → লেখা → AI-কে নির্দেশ।
প্রযুক্তিটি যদি বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে, তা হলে স্মার্টফোনে ‘কথা বলার’ সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে। কারণ তখন ডিজিটাল দুনিয়ায় যোগাযোগের জন্য শুধু মুখের ভাষা বা কিবোর্ডের ভাষা নয়, নিজের সাইন ল্যাঙ্গোয়েজও হয়ে উঠতে পারে সরাসরি ইনপুটের ভাষা। আর সেখানেই SL2T-এর আসল তাৎপর্য । এটি শুধু নতুন কোনও AI প্রযুক্তি নয়; প্রযুক্তিকে মানুষের ভাষার কাছে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
