

রাতের পাহাড়ে বন্য জন্তুর আনাগোনা রুখতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা। ছবি:AI
পাহাড়ে রাতে ক্যাম্পিং করার আগে জানুন জরুরি mountain camping safety tips। হাইপোথার্মিয়া, বন্য জন্তু ও তাঁবু খাটানোর মারাত্মক ভুল থেকে বাঁচতে রইল বিশেষজ্ঞ পরামর্শ।
ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আর খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর স্বপ্ন কার না থাকে? সোশ্যাল মিডিয়ায় বনফায়ার আর পাহাড়ের রাতে ক্যাম্পিংয়ের রঙিন রিলস দেখে অনেকেই হঠাৎ পরিকল্পনা করে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তবে ছবির সেই রোম্যান্টিসিজম আর পাহাড়ের খামখেয়ালি বাস্তবের মাঝে বিরাট ব্যবধান থাকে। পর্যটকদের অসতর্কতার কারণে এমন অ্যাডভেঞ্চার মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। পাহাড়ে রাত কাটানোর আগে তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল mountain camping safety tips। প্রথমবার যারা পাহাড়ে ক্যাম্পিং করতে যাচ্ছেন, তাঁদের ঠিক কোন কোন বিপদ সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া দরকার?
সমতলে বসে পাহাড়ের রাতের ঠান্ডার তীব্রতা আঁচ করা অসম্ভব। সূর্য ডোবার সাথে সাথে পাহাড়ি উপত্যকার তাপমাত্রা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নামতে শুরু করে। প্রথমবার ট্রাভেল করতে যাওয়া বহু পর্যটক সাধারণ জ্যাকেট নিয়ে পাহাড়ে ক্যাম্পিং করতে গিয়ে চরম বিপদে পড়েন।
শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমে গেলে শুরু হয় ‘হাইপোথার্মিয়া’। এর প্রাথমিক লক্ষণ হল হাত-পা অবশ হয়ে আসা, অসংলগ্ন কথা বলা এবং চূড়ান্ত বিভ্রান্তি।
এই বিপর্যয় এড়াতে লেয়ারিং বা স্তরে স্তরে পোশাক পরার নিয়ম মানতেই হবে। সুতির পোশাক আর্দ্রতা ধরে রেখে শরীর ঠান্ডা করে দেয়, তাই সুতির বদলে থার্মাল ইনার ও উইন্ডপ্রুফ জ্যাকেট ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে খেয়াল রাখতে হবে স্লিপিং ব্যাগের রেটিং যেন পাহাড়ি মাইনাস তাপমাত্রার সাথে মানানসই হয়।
তাঁবু খাটানোর সঠিক জায়গা নির্বাচন করতে না পারাই পাহাড়ি ক্যাম্পিংয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনে। রোমাঞ্চের লোভে ভুল জায়গা বেছে নিলে রাতারাতি প্রাণ সংশয় হতে পারে:

পাহাড়ে ক্যাম্পিং করার সময় অনেকে তাঁবুর ভেতরেই খাবার নিয়ে ঢুকে পড়েন। এটি এক মারাত্মক ভুল। গভীর রাতে খাবারের গন্ধ পাহাড়ি শেয়াল, ভাল্লুক, কিংবা বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়কে তাঁবুর দিকে টেনে নিয়ে আসে।
খাবার সবসময় সিল করা এয়ারটাইট ব্যাগে তাঁবু থেকে অন্তত ২০-৩০ ফুট দূরে কোনও সুরক্ষিত জায়গায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে। তাছাড়া ক্যাম্প সাইটের আশপাশে খাবারের এঁটো বা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা যাবে না।
রাতে শোওয়ার আগে জুতো বা বুট সবসময় তাঁবুর ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতে হবে। বাইরে পড়ে থাকা জুতোর উষ্ণতার খোঁজে রাতে বিষাক্ত বিছে বা পাহাড়ি পোকা ঢুকে পড়ার ঘটনা আকছার ঘটে। পাহাড়ি রুটে নিরাপদে হাঁটাচলার জন্য আরও পড়ুন আমাদের পাহাড়ি রাস্তায় হাইকিংয়ের জুতো ও পোশাক নির্বাচন এবং ট্রেকিংয়ের সময় ফার্স্ট এইড কিটের জরুরি তালিকা।
উঁচু পাহাড়ে ক্যাম্পিং করতে গেলে ‘অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস’ বা এএমএস (AMS)-এর ঝুঁকি থেকেই যায়। রাতে শুয়ে থাকার সময় অনেকেরই শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা তীব্র বমি বমি ভাব হতে পারে।
পাহাড়ে রাত বাড়লে বেশিরভাগ সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি গায়েব হয়ে যায়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে কারো সাথে যোগাযোগ করা বা উদ্ধারকারী দল ডাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাই ক্যাম্প সাইট সবসময় স্থানীয় গ্রাম বা লোকালয় থেকে খুব বেশি দূরে তৈরি করা উচিত নয়। অন্তত একজন স্থানীয় গাইড সাথে রাখা আবশ্যক, যিনি পাহাড়ি আবহাওয়া এবং ভূপ্রকৃতির মেজাজ ভালো বোঝেন।

পাহাড়ের রাতে ক্যাম্পিং কোনো সাধারণ হোটেল বা রিসর্টের ছুটি কাটানো নয়। এটি প্রকৃতির সাথে সরাসরি যুঝবার এক রোমাঞ্চকর পরীক্ষা। পাহাড় যতটা সুন্দর ও মোহময়, ততটাই নির্দয় হতে পারে যদি তার নিয়মকে অবহেলা করা হয়। অপরিকল্পিত প্রস্তুতি আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস পাহাড়ের মাটিতে সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনে। তাই সঠিক সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড এবং ভূপ্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পা বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। সাবধানতা অবলম্বন করলে তবেই রাতের পাহাড়ে তাঁবুর আলো আর তারার মেলা আজীবন মনে রাখার মতো এক রূপকথা হয়ে থাকবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
