

প্লাস্টিকে বিপন্ন মানুষ। ছবি - Google
একবার ব্যবহার, তারপরই আবর্জনা! প্লাস্টিকের এই অভ্যাস বদলাতে না পারলে বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হতে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা, শুধু সমুদ্র বা নদী নয়, প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে মাটি, বাতাস, বাস্তুতন্ত্র এবং মানুষের শরীরেও।
প্লাস্টিক ছাড়া আধুনিক জীবন প্রায় অচল। খাবার রাখার পাত্র থেকে পানীয়ের বোতল, বাজারের ব্যাগ থেকে চিকিৎসার সরঞ্জাম- প্রতিদিনের অসংখ্য কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার। কিন্তু সুবিধার আড়ালে জমছে বিপদের পাহাড়। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বড় অংশই পরিবেশে থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। ভেঙে তৈরি হচ্ছে অতি ক্ষুদ্র কণা, যা জল, মাটি, বাতাস এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থাগুলি। আশঙ্কা, এখনই উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড়সড় পরিবর্তন না আনতে পারলে আগামী কয়েক দশকে সংকট আরও গভীর হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে বছরে প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন টন নতুন প্লাস্টিক উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ২০৬০ সালের মধ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রায় তিন গুণ হয়ে যেতে পারে। ইউএনইপি-র হিসাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করা হলে একই সময়ের মধ্যে বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণও প্রায় তিন গুণ বেড়ে বছরে প্রায় ১২০ কোটি টনে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু কত প্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে, তা নয়; ব্যবহারের পর সেই বিপুল বর্জ্যের কী হবে, সেটাও বড় প্রশ্ন।
প্লাস্টিক দূষণের অন্যতম বড় কারণ একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বিপুল প্রচলন। পানীয়ের বোতল, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের ব্যাগ, স্ট্র, একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া পাত্র- এগুলির অনেকগুলিই অল্প সময়ের জন্য কাজে লাগে। কিন্তু ব্যবহারের পর ঠিকমতো সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ না হলে সেগুলি দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়।
ইউএনডিপি-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৭৯ শতাংশ ভাগাড়ে অথবা প্রাকৃতিক পরিবেশে জমা হয়েছে। প্রায় ১২ শতাংশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন করে কাজে লাগানো হয়েছে ১০ শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যা সমাধানে শুধু পুনর্ব্যবহারের উপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং বর্জ্য সংগ্রহ থেকে পুনর্ব্যবহার-পুরো ব্যবস্থাটিতেই বদল আনা প্রয়োজন।
প্লাস্টিক পুড়িয়ে বর্জ্য নষ্ট করার পদ্ধতিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। কী ধরনের প্লাস্টিক পোড়ানো হচ্ছে এবং কী প্রযুক্তিতে তা করা হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে বাতাসে ক্ষতিকর দূষক ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে খোলা জায়গায় প্লাস্টিক পোড়ানো মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে দৃশ্যমান ছবি সমুদ্রের বুকে ভাসতে থাকা বোতল, প্যাকেট, জাল ও অন্যান্য আবর্জনা। কিন্তু এর প্রভাব শুধু দৃশ্যমান বর্জ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামুদ্রিক প্রাণীরা অনেক সময় খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে। আবার পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও দড়িতে জড়িয়ে পড়ে আহত হয় বহু প্রাণী।
ইউএনইপি-র একটি বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক আবর্জনার অন্তত ৮৫ শতাংশই প্লাস্টিক। এই বর্জ্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে, প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করতে পারে। প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র কণাও জলের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জীবের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সমুদ্রের পাশাপাশি নদী, হ্রদ, জলাভূমি ও স্থলভাগেও প্লাস্টিকের দূষণ বাড়ছে। শহরের নিকাশি নালা আটকে যাওয়া, জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং বন্যার সময় বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যাতেও প্লাস্টিকের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এটি শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার বিষয় নয়; মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের আরও একটি বড় কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিকের বস্তু ভেঙে, ঘষা লেগে অথবা বিভিন্ন পরিবেশগত প্রক্রিয়ায় অতি ক্ষুদ্র কণা তৈরি হতে পারে। কিছু প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারের সময়ও ক্ষুদ্র কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বাতাসে ভেসে থাকা কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে। দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস এবং শরীরের অন্য কিছু নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তবে এই কণাগুলির উপস্থিতি এবং নির্দিষ্ট রোগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।
প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আবার প্লাস্টিক উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে সব ধরনের প্লাস্টিক একই রকম বিপজ্জনক নয়; ঝুঁকি নির্ভর করে প্লাস্টিকের ধরন, তাতে থাকা রাসায়নিক, সংস্পর্শের মাত্রা এবং অন্যান্য পরিস্থিতির উপর।
অর্থাৎ, প্লাস্টিক শরীরে পাওয়া গিয়েছে মানেই তা সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট রোগের কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। কিন্তু দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার প্রয়োজনও তত বাড়ছে।
প্লাস্টিক দূষণের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত প্লাস্টিকের বড় অংশ তৈরি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। সেই জ্বালানি উত্তোলন, প্লাস্টিক উৎপাদন, পরিবহণ এবং বর্জ্য পোড়ানোর বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হতে পারে। ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে জলবায়ু সংকটের চাপও বাড়তে পারে।
ইউএনডিপি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্লাস্টিক উৎপাদন ও পোড়ানোর ফলে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছিল, তা ১৮৯টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমনের সমতুল্য ছিল। এই হিসাব প্লাস্টিকের সম্পূর্ণ জীবনচক্রের পরিবেশগত প্রভাবকে সামনে আনে। ফলে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলার লড়াইকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্তরে আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। ২০২২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ পরিষদ প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্য, শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, প্লাস্টিকের উৎপাদন, নকশা, ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি- সমগ্র জীবনচক্রকে বিবেচনায় রেখে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একাংশ প্লাস্টিক উৎপাদন কমানো এবং পণ্যের নকশায় পরিবর্তনের পক্ষে। অন্যদের মতে, বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও উন্নত ব্যবস্থাপনার উপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। শিল্পের স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য—সব মিলিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের অগস্টে জেনেভায় দীর্ঘ আলোচনার পরও দেশগুলি চুক্তির খসড়া নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী বৈঠকে মূলত সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়; প্লাস্টিক চুক্তির মূল শর্ত নিয়ে আলোচনা তখনও চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে কার্যকর চুক্তি তৈরির পথ এখনও বাকি।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলে প্যাকেটজাত পণ্য, অনলাইন কেনাকাটা, খাবার সরবরাহ এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্রচলন বর্জ্যের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। অন্য দিকে, বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণের পরিকাঠামো সর্বত্র সমান নয়। ফলে প্লাস্টিকের একাংশ নালা, নদী, খাল এবং খোলা জায়গায় জমে থাকে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, অন্য দিকে বাড়ি থেকেই ভেজা ও শুকনো বর্জ্য আলাদা করা জরুরি। প্লাস্টিকের বর্জ্য নির্দিষ্ট সংগ্রহব্যবস্থায় জমা দেওয়া, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য বেছে নেওয়া এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদক সংস্থাগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে- পণ্যের প্যাকেজিং কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণে সহযোগিতা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় কোনও একটি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। শুধু প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি অন্য ধরনের প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েই চলে। আবার পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও কার্যকর হবে না, যদি বর্জ্য ঠিকমতো সংগ্রহ ও আলাদা করা না হয়। প্রয়োজন উৎপাদন কমানো, বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব নীতির সমন্বয়।
প্লাস্টিক আধুনিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে- বিশেষ করে চিকিৎসা, খাদ্য সংরক্ষণ ও নানা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে। তাই লক্ষ্য সব প্লাস্টিক একেবারে বন্ধ করা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তার মূল তাৎপর্য এখানেই। প্লাস্টিক দূষণ কোনও একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়। বাতাস, নদী ও সমুদ্রের মাধ্যমে এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন না আনলে আগামী প্রজন্মকে আরও দূষিত পরিবেশের মুখোমুখি হতে হবে। পৃথিবীকে প্লাস্টিকমুক্ত করার লড়াই তাই শুধু সরকারের নয়, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষেরও। এখনই অভ্যাস বদলানো না গেলে, সুবিধার জন্য তৈরি প্লাস্টিকই একদিন পরিবেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
