

ইছামতীতে প্রতিমা নিরঞ্জন। ছবি - Google
রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে মানচিত্র বদলাতে পারে। সীমানায় কড়া প্রহরার বন্দোবস্ত করতে পারে। কিন্তু মানুষের সাংস্কৃতিক শেকড় আর ফেলে আসা মাটির টান মুছে ফেলা অতটাও সহজ কাজ নয়। ফলে বিরহ থাকলেও ইছামতীর এই ভাসান আজও দুই বাংলার সেই নাড়ির টানেরই নীরব সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে।
ইছামতী কেবল নদী নয়। বহু স্মৃতি, বহু মিলন গাঁথা একইসঙ্গে অনেক বিরহের যন্ত্রণার সাক্ষী ইছামতী আজ ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সীমানা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এপারে উত্তর ২৪ পরগনার টাকি আর ওপারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সে।
বছরের বাকি সময়টা একরকম একই থাকে ইছামতীর জলধারা। কি শরতের শেষ দিকটা এলেই ছবিটা বদলে যায়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর দিন। এই দিনটিতে ইছামতীর বুকে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের যে দৃশ্য রচনা হয় তা সারা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।
দুই দেশের মধ্যেকার সীমানা এখানে মানুষের আবেগ ও উদ্দীপনার স্রোতে মিশে যায়। দুই বাংলার মানুষ নৌকায় চেপে মাঝনদীতে এসে একে অপরের দিকে হাত নাড়েন। তবে বহু শতকের সেই ঐতিহ্যে আজ যেন কেমন একটা শেকল পরানোর অবস্থা তৈরি হয়েছে।
ইছামতীর বুকে বিসর্জনের এই জাঁকজমকের শেকড় পোঁতা আছে অন্তত তিনশো বছরের পুরোনো জমিদারির ইতিহাসে। টাকির রায়চৌধুরী, ঘোষ এবং নন্দী পরিবারের মতো বনেদি জমিদার বাড়িগুলোর দুর্গাপুজো অত্যন্ত প্রাচীন। তখন বাংলা ছিল অখণ্ড। ইছামতীতে কোনও সীমান্ত বা বিভাজন ছিল না।
সেই সময় জমিদারদের মধ্যে উপর উপর সদ্ভাব থাকলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিটা বিষয় নিয়ে ছিল চরম রেষারেষি। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সেই প্রতিযোগিতা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করত। কার প্রতিমা কত বড় হবে, কার প্রতিমা কত বড় নৌকায় চড়ে বিসর্জনে যাবে, কার প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বেশি উন্মাদনা তৈরি হবে তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। আর তাই সেকালে বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে জোড়া নৌকায় প্রতিটি জমিদার বাড়ির প্রতিমা তুলে মাঝ নদীতে নিয়ে যাওয়া হত। একের পর এক জমিদারবাড়ির প্রতিমা বিসর্জনের উৎসবে মেতে উঠতে নদীর দুই পারের মানুষ একসঙ্গেই নৌকা ভাড়া করে ইছামতীর মাঝ নদীতে এসে হাজির হতেন। তখন এটি ছিল নিছকই একটি স্থানীয় উৎসব। এই ভাবেই প্রথার শুরু।
দুই বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরে ১৯৪৭ সালে। র্যাডক্লিফ লাইনের খসড়া অনুযায়ী ইছামতী নদী হয়ে দাঁড়াল ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা। নদীর পশ্চিম পারের টাকি রইল ভারতে। আর পূর্ব পারের শ্রীপুর বা সাতক্ষীরা চলে গেল পূর্ব পাকিস্তানে। দেশভাগ হল ঠিকই। কিন্তু দুই পারের মানুষের আত্মীয়তা আর নাড়ির টান তো এক দিনে মুছে যায় না।
দেশভাগের ফলে বহু মানুষ রাতারাতি ভিটেছাড়া হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন। এই ছিন্নমূল মানুষগুলোর কাছে বিজয়া দশমীর দিনটির তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারণ এই দিনটিতেই ওপারে ফেলে আসা আত্মীয়-স্বজন, আপনজনদের ইছামতীর মাঝ নদীতে খুব কাছ থেকে দেখতে, জড়িয়ে ধরতে পারতেন তাঁরা। তখন সীমানায় আজকের মতো কড়াকড়ি ছিল না। দশমীর দিন ওপার থেকে আত্মীয়স্বজন নৌকায় চেপে মাঝনদীতে আসতেন। এপার থেকেও নৌকায় চেপে যেত মানুষ। ভাসানের মূল আকর্ষণ তখন প্রতিমা দর্শনের থেকে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায় দুই পারের ছিন্নমূল মানুষদের কান্নাভেজা পুনর্মিলনে।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর ইছামতীর এই মিলনমেলা এক নতুন মাত্রা পায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সহযোগিতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উষ্ণ। সত্তরের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়টিকে এই উৎসবের স্বর্ণযুগ বলা যায়। তখন দশমীর দিন ইছামতীতে কোনও সীমান্ত থাকত না। দুই দেশের নৌকা একে অপরের পার অবধি চলে যেত। মাঝ নদীতে নৌকা কাছাকাছি এলে এক নৌকার মানুষ অনায়াসে লাফ দিয়ে অন্য নৌকায় উঠে পড়তেন। কোলাকুলি আর কান্নাকাটির পাশাপাশি চলত দেদার উপহার আদানপ্রদান। ওপারের নৌকা থেকে আসত পদ্মার ইলিশ। এপারের নৌকা থেকে যেত টাকির বিখ্যাত ছানাপোড়া। বাংলাদেশ থেকে আসত বিখ্যাত ঢাকাই জামদানি। ভারতের দিক থেকে আত্মীয়দের জন্য যেত শান্তিপুরী তাঁতের শাড়ি।
বিবাহিত মহিলারা নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দিতেন। নিরাপত্তারক্ষীদের নজরদারি থাকলেও তা ছিল শুধুই নামমাত্র। ফলে দুই বাংলার মানুষের এই মিলনমেলা খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চলত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা এই উৎসবের চেহারাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। একুশ শতকের শুরুতে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান এবং বেআইনি অনুপ্রবেশ মারাত্মক আকার ধারণ করে। উৎসবের এই শিথিলতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা ফায়দা লুটতে শুরু করে। বেশ কয়েকবার নৌকায় নৌকায় ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় ২০১২ সালের পর থেকে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিএসএফ এবং বিজিবি কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। আর তাই এখন উৎসব শুরু হওয়ার আগে নদীর ঠিক মাঝ বরাবর বয়া দিয়ে একটি কাল্পনিক সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়। বিসর্জনের দিন বিকেলবেলা দুই দেশের নৌকা নদীতে নামে। কিন্তু কেউ সেই সীমারেখা পার হতে পারে না। স্পিডবোটে করে দুই দেশের রক্ষীরা সারাক্ষণ কড়া টহল দেন। আকাশে ড্রোন উড়ে বেড়ায়। মাইকে সতর্কবার্তা বাজতে থাকে প্রতিনিয়ত।
এখন আর এক নৌকার মানুষ অন্য নৌকায় লাফিয়ে পড়েন না। ইলিশ বা মিষ্টির আদানপ্রদান আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নৌকায় ওড়া ভারতের তেরঙ্গা আর বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকাই এখন একমাত্র পরিচয়। মানুষ এখনও কাছাকাছি আসেন। কিন্তু মাঝখানে থাকে কয়েক গজের অলঙ্ঘনীয় জলপথের দূরত্ব। ফলে আগের মতো আর কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারেন না।
পুরোনো আমলের সেই বাঁধনহারা উন্মাদনা আজ প্রশাসনিক নিয়মের বেড়াজালে বন্দি। মিষ্টির প্যাকেট বা শাড়ি ছোঁড়ার বদলে এখন কেবল শূন্যে ভেসে আসে বিজয়ার শুভেচ্ছা। দূর থেকে হাত নেড়ে অথবা চিৎকার করে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমেই দশমীর বিকেলটা কেটে যায়। একটা অদৃশ্য দেওয়াল যেন দুই পাড়ের মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তবুও এই ক্ষণিকের জমায়েত আজও প্রমাণ করে একটা খুব সহজ সত্য। রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে মানচিত্র বদলাতে পারে। সীমানায় কড়া প্রহরার বন্দোবস্ত করতে পারে। কিন্তু মানুষের সাংস্কৃতিক শেকড় আর ফেলে আসা মাটির টান মুছে ফেলা অতটাও সহজ কাজ নয়। ইছামতীর এই ভাসান আজও দুই বাংলার সেই নাড়ির টানেরই নীরব সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
