

উৎসবকে বদলে দিচ্ছে AI! ছবি - AI
বাস্তব হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উৎসবের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন কারোর কাছে খুব হ্যাপেনিং মনে হতে পারে, আবার কেউ এর মাধ্যমে প্রাণের স্পন্দনহীন ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতির ষড়যন্ত্র দেখতে পারেন। এর কোনটাই ভুল নয়। তবে আয়রনি হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত এবং পথ ধরে উৎসবের ধরণ ও আবেগে আগামীদিনে এক বড়সড় সামগ্রিক পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
উৎসব মানেই বাঁধভাঙা আনন্দ আর মানুষের ঢল। কিন্তু আনন্দঘন এই বিশাল উন্মাদনার নেপথ্যে থাকে বিপুল ঝক্কি। তা কুম্ভমেলা হোক বা কলকাতার দুর্গাপুজো বা স্পেনের টমেটো ছোঁড়া, সর্বত্রই উৎসবের দিনগুলোতে আমজনতার উন্মাদনা অন্য সময়ের থেকে অনেক বেশি ব্যাপক ও লাগামহীন হয়ে ওঠে। তার ফলে আনন্দের সঙ্গেই অনেক সময় ধেয়ে আসে নানান জটিলতা, সমস্যা ও যন্ত্রণা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর হাত ধরে আমজনতার উৎসবে মেতে ওঠার অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে শুরু করেছে।
এই বাঙালির কথাই ধরুন। দুর্গাপুজোয় একসময় মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাটাই যেন ছিল নিয়ম। প্রচণ্ড গরমে ঘাম ঝরিয়ে তবেই মিলত প্রতিমা দর্শনের সুযোগ। সেই ছবিটা এখন বদলাচ্ছে। এখন ফেস্টিভ্যাল ম্যানেজমেন্টের একেবারে গভীরে ঢুকে পড়েছে এআই। উৎসবের অভিজ্ঞতা বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কাজ করছে সেটা দেখা যাক।
যে কোনও বড় উৎসবে পদপিষ্ট হওয়ার ঝুঁকি একটা মারাত্মক চিন্তার বিষয়। দুর্গাপুজোর সময় কলকাতার ম্যাডক্স স্কোয়ার বা শ্রীভূমির মতো জায়গায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। এই বিপুল ভিড় সামলাতে এখন এআই চালিত স্মার্ট ক্যামেরার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। মেলা প্রাঙ্গণ বা প্যান্ডেলের চারপাশের ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত থাকছে অত্যন্ত উন্নত একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। রিয়েল টাইমে ভিড়ের ঘনত্ব মাপতে পারে এই প্রযুক্তি। ফলে কোনও একটি নির্দিষ্ট গেটে বা রাস্তায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষের জমায়েত হলেই কন্ট্রোল রুমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল সঙ্কেত চলে যায়। বিপদ বুঝে পুলিশ দ্রুত সেই এলাকার ট্রাফিক অন্য রাস্তায় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় থাকে না বললেই চলে।
মেলায় বা ভিড়ে বাচ্চা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে খুবই পরিচিত। আগে এমনটা হলে মেলার মাইক বা পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম থেকে নিরুদ্দেশ ঘোষণা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা ছাড়া বাবা-মা বা পরিজনদের কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু এখন ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির সাহায্যে কাজটা অবিশ্বাস্যরকম সহজ হয়ে গিয়েছে। হারিয়ে যাওয়া শিশু বা বয়স্কদের ছবি সিস্টেমে আপলোড করলেই প্রযুক্তি পুরো মেলা প্রাঙ্গণের হাজার হাজার ক্যামেরার লাইভ ফিড স্ক্যান করতে শুরু করে দেয়। ভিড়ের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট মুখের আদল পাওয়া মাত্রই নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে সঠিক লোকেশন পৌঁছে যায়। চোখের পলকে হারিয়ে যাওয়া মানুষটি ফিরে আসেন আপনজনের কাছে।
দীপাবলি বা বিশ্বজুড়ে নববর্ষের উদযাপনের সময় আতশবাজির কারণে ভয়াবহ বায়ুদূষণ হয়। শব্দ দানবের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মানুষ। এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে হাজার হাজার ড্রোনের সমন্বয়ে তৈরি লাইট শো। এখন ক্রিসমাস বা হ্যালোউইনের মতো বিদেশি উৎসবে আতশবাজির বদলে আকাশ জুড়ে ড্রোনের সাহায্যে আলোর ম্যাজিক ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। আকাশে হাজার হাজার ড্রোন একসঙ্গে উড়ে সান্তা ক্লজ বা ড্রাগনের থ্রি ডি ছবি তৈরি করছে। বাতাসের গতিবেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিটি ড্রোন নিজের অবস্থান নিখুঁতভাবে বজায় রাখে। এর ফলে শব্দ ও ধোঁয়াহীন এক অভূতপূর্ব উৎসবের অভিজ্ঞতা পান দর্শকরা। এভাবে শব্দ ও বায়ু দূষণ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই মিলছে।
উৎসব আর খাওয়া দাওয়া যেন একে অপরের পরিপূরক। দুর্গাপুজোর অষ্টমীর রাত হোক বা ঈদের দুপুর, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় হঠাৎ করে খাবারের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলো এখন স্মার্ট ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো শহরের চাহিদার একটা পূর্বাভাস তৈরি করে নেয়। শহরের ঠিক কোন পাড়া থেকে রাত দুটোর সময় সবচেয়ে বেশি বিরিয়ানি বা রোলের অর্ডার আসতে পারে তা আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারে তারা। সেই অনুযায়ী ডেলিভারি পার্টনারদের ওই নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে আগে থেকেই মোতায়েন রাখা হয়। ফলে উৎসবের চরম ব্যস্ততা এবং যানজটের মধ্যেও মানুষের কাছে গরম খাবার ঠিক সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
বিশ্বের বড় বড় মিউজিক ফেস্টিভ্যাল বা হাই প্রোফাইল ডান্ডিয়া নাইটগুলোতে প্রবেশের জন্য এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট দেখানোর প্রয়োজন হয় না। দর্শকদের বায়োমেট্রিক বা ফেস ডেটা আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে রেজিস্টার করা থাকে। গেটের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় স্মার্ট সেন্সর চোখের পলকে পরিচয় যাচাই করে নেয়। ফলে টিকিট পরীক্ষা করার জন্য কারওরই আলাদা করে দাঁড়ানোর দরকার পড়ে না। এই বাধাহীন প্রবেশের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি থেকে মানুষ পুরোপুরি মুক্তি পেয়েছেন।
যাঁরা কর্মসূত্রে বাংলা বা ভারতের বাইরে থাকেন তাঁদের উৎসবের আনন্দ অনেক ক্ষেত্রেই সোশ্যাল মিডিয়ার ছবিতে আটকে থাকে। কিন্তু এখন অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং স্পেশিয়াল অডিওর মাধ্যমে এমন ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যেখানে প্রবাসীরা ভিআর হেডসেট পরে একদম লাইভ মণ্ডপের ভেতরে থাকার অনুভূতি পান। ঢাকের আওয়াজ ঠিক কত দূর থেকে আসছে বা মণ্ডপের কোন দিকটায় ভিড় বেশি সেই পারিপার্শ্বিক শব্দগুলো একেবারে নিখুঁতভাবে তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঠিক এমন নানান উপায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎসবের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন কারোর কাছে খুব হ্যাপেনিং মনে হতে পারে, আবার কেউ এর মাধ্যমে প্রাণের স্পন্দনহীন ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতির ষড়যন্ত্র দেখতে পারেন। এর কোনটাই ভুল নয়। কিন্তু রূঢ় বাস্তব হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত এবং এই পথ ধরে উৎসবের ধরন ও আবেগে আগামীদিনে এক বড়সড় সামগ্রিক পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
