

ব্যালন ডি’অর কেনের। ছবি - Google
ছোটকালে হ্যারি ছিলেন বেঁটে, খানিকটা মোটাও। তারমধ্যে ছিল না তেমন অ্যাথলেটিসিজম, ছিল না স্পিড, গায়েও তেমন শক্তিও ছিল না। আর্সেনাল অ্যাকাডেমি থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হল স্রেফ মোটা হওয়ার কারণে। সেখানকার কোচ বলে দিলেন, হ্যারি, তোমার দ্বারা আর যাইহোক ফুটবল খেলা হবে না।
হ্যারি কেন স্টেজে উঠলেন, পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে তখন প্রাণবন্ত সেলিব্রেশন, জয়ধ্বনি- “হ্যা..রি! হ্যা..রি!”
আচমকা মনে হবে, লন্ডনের সেই ছোট্ট ছেলেটা- যাকে খাটো, দুর্বল, খানিকটা মোটা হওয়ায় এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে সবাই একসময় ছুড়ে ফেলে দিত, সেই মানুষটাই আজ লন্ডনের প্রিন্স। দ্য "রিয়েল প্রিন্স", যে দীর্ঘ ২৫ বছর পরে একজন ইংলিশম্যান হিসেবে ব্যালন ডি’অরটা তাঁর ম্যাঞ্চেস্টারের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন!
হ্যারি কেন মানুষটিও বেশ আবেগপ্রবণ। অ্যাওয়ার্ড হাতে নিয়ে প্রথমে ওপরের দিকে তাকালেন, হয়তো সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালেন। এরপর একে একে নিজের প্রতিটা টিমমেট, নিজের দেশ, নিজের ক্লাব, প্রতিটা কোচ যাদের অধীনে খেলেছেন, তাঁর জীবনে যাঁরা তাঁকে এতদূর টেনে এনেছেন, তাঁদের কথাই হয়তো মনে করে টানা বলে গেলেন।
নিজের মা-বাবার অগাধ সমর্থন। তাঁদের আত্মত্যাগের কথা বলতে গিয়ে গলাটা যেন ধরে এল। নিজেকে কোনোভাবে সামলে এরপর তাঁর শৈশব থেকে যিনি গার্লফ্রেন্ড ছিলেন, বর্তমানে তিনিই হ্যারি কেনের স্ত্রী। হ্যারি চোখ মুছে বলছিলেন, ‘‘এই অ্যাওয়ার্ড আমি জিতিনি, আমরা জিতেছি, আমাদের সকলের ত্যাগের পুরস্কার এই স্বীকৃতি।’’ এমনকী তাঁর ছোটবেলার ক্লাব টটেনহাম হটস্পারকেও ধন্যবাদ জানাতে ভুলল না। এই ক্লাব ছাড়া আজকে এতদূর আসতে পারতেন না, সেকথাও খুব কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করলেন।
ছোটকালে হ্যারি ছিলেন বেঁটে, খানিকটা মোটাও। তারমধ্যে ছিল না তেমন অ্যাথলেটিসিজম, ছিল না স্পিড, গায়েও তেমন শক্তিও ছিল না। আর্সেনাল অ্যাকাডেমি থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হল স্রেফ মোটা হওয়ার কারণে। সেখানকার কোচ বলে দিলেন, হ্যারি, তোমার দ্বারা আর যাইহোক ফুটবল খেলা হবে না। ছেলেটি মাথা নিচু করে চলে এসেছিল, দেখতে নাদুসনুদুস হলে কী হবে, বুকের ভেতর যে আগুনটা ছিল, সেটি কোচ দেখতে পাননি সেদিন।
১১ বছর বয়সে যখন টটেনহাম হটস্পারে ট্রায়াল দিতে যান, সেখানেও তাঁকে বাতিল করা হয়। এরপর সেই হ্যারিই ওয়াটফোর্ড ক্লাবের হয়ে সেই টটেনহামের বিরুদ্ধেই যখন একটা যুব ম্যাচে হ্যাটট্রিক করলেন, সেদিন হটস্পারের কোচ তাঁকে ডেকে গাল টিপে দিয়েছিলেন। তারপর হ্যারি হটস্পারেই ভর্তি হলেন, কিন্তু হ্যারিকে তারা শুধুই অন্য ক্লাবে লোনে পাঠিয়েছে, তাতেও বিরক্তি ছিল না তাঁর। লেটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়ালের হয়ে ডিভিশন ওয়ান, চ্যাম্পিয়নশিপ- এসব লোয়ার টায়ার ডিভিশনেই তাঁকে খেলতে হয়েছে প্রথমদিকে। এরপর প্রিমিয়ার লিগে নরউইচ সিটির হয়ে শুরু করলেও পায়ের চোটে এমন অবস্থা হয় যে তিনি যে আবার মাঠে নামতে পারবেন কেউ ভাবতে পারেননি। সেইসময় ক্রাচ নিয়ে মাঠে অনুশীলন দেখতে আসতেন হ্যারি।
হ্যারি কেনকে চিনেছিলেন সেইসময় টটেনহ্যামের ম্যানেজার টিম শেরউড, যিনি ব্যালন ডিঅর অনুষ্ঠানে ছিলেন। তিনি সেইসময় সব কোচদের জানিয়েছিলেন, হ্যারির মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা হয়তো নেই, কিন্তু যেটা রয়েছে, বাকিদের মধ্যে সেটা দেখা যায় না। হ্যারি মুহূর্তের মধ্যে চকিতে শট নিতে পারে, আর নমনীয়তা এতটাই ভাল সারা মাঠ ঘুরে দেখে পাস দিতে পারে, এই গুণ বাকিদের মধ্যে দেখা যায় না। আর ওর জিনে সবাই দীর্ঘকায়, তাই হ্যারিও দ্রুত লম্বা হবে।
সেই কারণেই অনুষ্ঠানে হ্যারি আবেগরুদ্ধ, বলেও দিয়েছেন, ‘‘আমার কাজটি সহজ ছিল না, কারণ আমাকে বহুবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমি তারপরেও হাল ছাড়িনি, কারণ জানতাম লেগে থাকলে সফলতা আসবেই। এমনকী যখন তোমাকে কেউ পাত্তাও দেবে না, সেদিনও তুমি অনুশীলন করে যাও, ওই প্রস্তুতিই তোমাকে শক্তিশালী করবে, আগামী দিনের পথ দেখাবে।’’ বলার সময় হ্যারিকে দেখা গেল প্রিয়জনদের একবার করে দেখছেন!
অনেকেই ভাবেন, হ্যারি শুধু গোলের পর গোলই দেন। কিন্তু আজকের এই হ্যারি কেন শুধু গোটা মরশুমে ৭৩টি গোলই দেন না, এই হ্যারি কেন মাঝমাঠে গিয়ে নিজের সতীর্থদের লম্বা লম্বা পাস বাড়ান ডিফেন্স লাইন ব্রেক করে, আবার চিতার মতো ডি-বক্সে হঠাৎ হাজির হয়ে পুরো গেমের স্কোরলাইন লন্ডভন্ড করে দেন। অসম্ভব সব অ্যাঙ্গেল থেকে নিজের এলিট শুটিং অ্যাবিলিটি দিয়ে জাল ছিন্ন করে দেন, কর্নার থেকে আসা বলে সবচেয়ে উঁচু হেডার দিয়ে গোলটা তাঁর মাথাতেই আসে।
চলতি মরশুমে ৭৩টি গোল, ৮টি তাঁর পাস থেকে গোল এসেছে। বিশ্বকাপে এবার ছ’টি গোল করার সঙ্গে একা একটা দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন সেমিতে। তাই হ্যারির নামের পাশে যোগ্য কথাটি বেমানান লাগবে না। তাই তো পুরস্কারের পরেই পেপ গুয়ার্দিয়লার বার্তা সকলের চোখ টেনেছে, "হ্যারি, ইউ আর প্রিন্স, ইয়েস রিয়েল প্রিন্স, ইউ আর কমপ্লিট স্ট্রাইকার, কনগ্র্যাটস ব্রাদার।"
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
