

ডাইনোসর। পুরনো জীবাশ্মে খুলছে পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। ছবি - The Fourth Axis
৩রা আগস্ট, ২০২৬
একটা সময় পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। পাখিদের কিচিরমিচির শোনা যেত না। ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠও ছিল না। পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ জুড়ে ছিল এক বিশাল সুপারকন্টিনেন্ট- গন্ডোয়ানা। বর্তমান আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ভারত, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া তখন একই ভূখণ্ডের অংশ। সেই পৃথিবীতেই প্রায় ২১ কোটি বছর আগে, ট্রায়াসিক যুগের শেষভাগে বিচরণ করত পৃথিবীর প্রথম দিকের ডাইনোসররা।
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ডাইনোসরের এক নতুন প্রজাতি- Musango matusadonaensis। দেখতে হয়তো বিশালাকার টি-রেক্সের মতো নয়, কিংবা সিনেমার দীর্ঘ গলার দৈত্যাকার ডাইনোসরের মতোও নয়। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাসে এই প্রাণীটির গুরুত্ব অসামান্য।
উত্তর জিম্বাবোয়ের লেক কারিবা সংলগ্ন মাটিতে ২০১৮ সালে খননকার্যের সময় কয়েকটি হাড় উদ্ধার হয়। ছিল উরুর হাড়, পায়ের নীচের অংশ এবং গোড়ালির কিছু অংশ।
প্রথমে গবেষকদের ধারণা ছিল, এগুলি হয়তো পরিচিত কোনও ডাইনোসরের জীবাশ্ম। কিন্তু পরে সিটি স্ক্যান, থ্রি-ডি মডেলিং এবং বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত জীবাশ্মের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, হাড়গুলির গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। তারপরই নিশ্চিত হন বিজ্ঞানীরা, এটি আগে কখনও নথিভুক্ত না হওয়া এক নতুন প্রজাতি।
গবেষকদের মতে, Musango matusadonaensis ছিল Sauropodomorpha গোষ্ঠীর সদস্য। এই গোষ্ঠী থেকেই কোটি কোটি বছর পরে বিবর্তিত হয় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণীরা- ব্র্যাকিওসরাস, ডিপ্লোডোকাস, আর্জেন্টিনোসরাস-এর মতো দীর্ঘ গলা ও বিশাল দেহের সোরোপড। অর্থাৎ, নতুন আবিষ্কৃত এই প্রাণীটি সেই ‘দৈত্যদের পরিবারের’ অনেক প্রাচীন সদস্য। ডাইনোসরটির উচ্চতা ছিল প্রায় দেড় মিটার। ওজন আনুমানিক ৩৯০ কিলোগ্রাম। চার পায়ে হাঁটলেও প্রয়োজনে দ্রুত চলাফেরা করতে পারত বলে ধারণা গবেষকদের।
ডাইনোসরদের নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় রহস্য এখনও তাদের প্রথম দিকের বিবর্তন। প্রায় ২৩ থেকে ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছিল। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বহু প্রাণীর বিলুপ্তির মধ্যেই ডাইনোসরদের উত্থান ঘটে।
তাই ট্রায়াসিক যুগের একটি নতুন ডাইনোসরের সন্ধান পাওয়া মানে শুধু একটি নতুন প্রাণী খুঁজে পাওয়া নয়; বরং বোঝা, কীভাবে ছোট ও অপেক্ষাকৃত সাধারণ সরীসৃপ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রাণীগোষ্ঠীগুলির একটিতে পরিণত হয়েছিল ডাইনোসররা।
এই আবিষ্কারের আরেকটি বড় তাৎপর্য রয়েছে। আজকের ভারত একসময় গন্ডোয়ানা মহাদেশেরই অংশ ছিল। জিম্বাবোয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা এবং ভারতের ভূখণ্ড তখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে ডাইনোসরদের চলাচলে কোনও মহাসাগর বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
নতুন এই প্রজাতির শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও আর্জেন্টিনায় পাওয়া কয়েকটি প্রাচীন ডাইনোসরের মিল রয়েছে। তার অর্থ, তখন গোটা গন্ডোয়ানা জুড়েই ডাইনোসরদের বিস্তার ঘটছিল। এদিকে ভারতের মধ্যপ্রদেশ, তেলঙ্গানা ও গুজরাতে পাওয়া ট্রায়াসিক যুগের জীবাশ্ম নিয়েও নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষক কিম্বার্লি শ্যাপেল-এর মতে, আফ্রিকায় ডাইনোসরের জীবাশ্ম কম পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সেখানে ডাইনোসর কম ছিল। বরং বহু অঞ্চল এখনও পর্যাপ্তভাবে খননই করা হয়নি। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও চীনের তুলনায় আফ্রিকায় জীবাশ্ম অনুসন্ধান অনেক কম হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দশকে এই মহাদেশ থেকেই বহু নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলতে পারে। বিজ্ঞানীদের কথায়, আফ্রিকার মাটির নীচে হয়ত এখনও লুকিয়ে রয়েছে ডাইনোসরদের বিবর্তনের এমন সব অধ্যায়, যা পৃথিবীর ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে।
একটি উরুর হাড়, একটি গোড়ালির হাড় কিংবা কয়েকটি ভাঙা জীবাশ্ম- সাধারণ মানুষের চোখে এগুলি হয়ত পাথরের টুকরো। কিন্তু একজন জীবাশ্মবিদের কাছে সেগুলিই সময়ের ভাষা।
২১ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কেমন প্রাণী ঘুরে বেড়াত, তারা কীভাবে চলত, কী খেত, কীভাবে বিবর্তিত হত- সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে এই নিঃশব্দ হাড়গুলির মধ্যে। জিম্বাবোয়ের নতুন এই আবিষ্কার তাই শুধু একটি নতুন ডাইনোসরের নাম যোগ করল না। এটি আবারও মনে করিয়ে দিল- পৃথিবীর ইতিহাস এখনও অসম্পূর্ণ। আর সেই ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায় হয়ত এখনও আফ্রিকার লাল মাটির নীচেই ঘুমিয়ে রয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
