৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বাইজির ছেলে বলে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কার!

হিন্দু কলেজ, যা বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি - Google

বাইজির ছেলে বলে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কার!

calender icon 2 ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

রাতে যে বাইজির পায়ে লুটিয়ে থাকত, দিনের আলোয় তারই ছেলের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল কলকাতার বাবুরা

ইংরেজ আমলে কলকাতার তথাকথিত বাবু সমাজের ভণ্ডামির বহু নিদর্শন আছে। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তারা সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাতে যে হীরা বুলবুল বাইজির অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য কার্যত 'সারমেয়' তুল্য হয়ে আকুতি মিনতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন, সেই হীরা বুলবুলের ছেলে হিন্দু কলেজে ভর্তি হলে তাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন এই বাবুরাই। কারণ, বাইজির ছেলের সঙ্গে তাদের মতো উচ্চ বংশের সন্তানরা পড়াশোনা করবে তা তো হতে পারে না!

আসলে দিনের আলো ফুটলে এই বাবুরা হয়ে উঠতেন তৎকালীন কলকাতার হিন্দু সমাজের একজন বড় বড় হোতা। যদিও সূর্য ডুবলে সেই ধর্মবোধ, নৈতিকতা তাদের শৌখিন পাঞ্জাবির পকেটে গিয়ে আশ্রয় নিত!

মূল বিষয়

উনিশ শতকের কলকাতার বাবু সমাজ ছিল ভণ্ডামির আখড়া। বাইরে থেকে আভিজাত্যের মোড়ক দেখে মনে হত, এরাই বুঝি সংস্কৃতির ধ্বজা তুলে ধরে আছে। কিন্তু সেই মোড়কের আড়াল একটু সরলেই বেরিয়ে পড়ত ভণ্ডামির একসে বড়কার এক দৃশ্য।

উনবিংশ শতকের কলকাত্তাইয়া বাবুদের জীবনটা দুটো অদ্ভুত ভাগে বিভক্ত ছিল। দিনের বেলায় তাঁরা ছিলেন সমাজের মাথা এবং হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তা। আর রাতের অন্ধকার নামলেই তাঁদের ঠিকানা বদলে যেত। তখন দেখা মিলত কলকাতার নামিদামি বাইজিদের আসরে। এদিকে বাড়িতে বিবাহিত স্ত্রী'রা বসে চোখের জল ফেলতেন। তাদের এই দ্বিচারিতা বা ভণ্ডামির অন্যতম শিকার হয়েছিল একটি নিষ্পাপ কিশোর। স্রেফ তার মা সেকালের কলকাতার সবচেয়ে ডাকসাইটে বাইজি হীরা বুলবুল হ‌ওয়ায় ভর্তি হয়েও তৎকালীন হিন্দু কলেজ, পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছিল।

হীরা বুলবুলের কলকাতার রাত

হীরা বুলবুল ঠিক কোথা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও উল্লেখ সরকারি নথিতে নেই। তবে ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, উত্তর ভারতের লখনউ বা বারাণসী থেকে তিনি এসেছিলেন। তাঁর আসল নাম কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কলকাতার বুকে তিনি হীরা বুলবুল নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর রূপের ছটা আর শাস্ত্রীয় সংগীতের মূর্চ্ছনায় পাগল ছিলেন সেকালের সমাজের রথী মহারথী বাবুরা। তাঁর আসরে ডাক পাওয়াটা তখন একটা বিশাল স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছিল। যে বাবুরা দিনের বেলায় নীতিবাক্য আওড়াতেন, তারাই রাতে হীরা বুলবুলের একটা ইশারার জন্য কাঙাল হয়ে বসে থাকতেন।

অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন হীরা। কলকাতার বুকে তাঁর নিজস্ব বিশাল অট্টালিকা ছিল। ছিল প্রচুর সোনাদানা আর ভূসম্পত্তি। টাকার জোরে এবং ক্ষমতাবান বাবুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সমাজে তাঁর একটা অলিখিত প্রতিপত্তি তৈরি হয়েছিল। যা সেই সময়কার বহু দেশীয় জমিদারের পর্যন্ত ছিল না।

বাবুদের অন্দরমহলের কান্না

এই বাবুদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে একটা অদ্ভুত অন্ধকার দিক সামনে উঠে আসে। প্রায় প্রত্যেকেরই বাড়িতে বিবাহিত স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সেই স্ত্রীদের বহির সামাজে বা মানসিক কোনও অধিকার ছিল না। তাঁরা তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের রীতি মেনে অন্দরমহলের ঘেরাটোপে বন্দি থাকতেন। আর তাঁদের স্বামীরা বাইরে বাইজি নিয়ে মেতে থাকতেন। এটা শুধু বিনোদন ছিল না। এটা ছিল সেকালের বাবুদের ক্ষমতা আর বিত্ত প্রদর্শনের এক নোংরা প্রতিযোগিতা। কে কত টাকা বাইজির পিছনে ওড়াতে পারে, তার উপর নির্ভর করত বাবুর সামাজিক সম্মান। আবার দিনের বেলায় এরাই নাকি ছিলেন সমাজের রক্ষক!

মায়ের জেদ আর এক নামহীন পুত্র

হীরা বুলবুল জানতেন রাতের এই গ্ল্যামার আর মোহর আসলে মিথ্যে। দিনের আলোয় এই বাবুরা তাঁকে বা তাঁর পরিচয়কে কোন‌ওদিন সম্মান করবে না। কিন্তু একজন মা হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান যেন ভদ্রসমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচে। তার জন্য যে ইংরেজি শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সেটা বুঝেছিলেন। আর‌ তাই নিজের বিপুল অর্থ আর প্রভাব কাজে লাগিয়ে সেই সময়ের বিচারে তিনি এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেন। এই ছেলের আসল নাম কী ছিল তা কেউ জানে না। সেকালের পত্রপত্রিকা বা নথিতে তাকে কেবল নটীপুত্র হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ একজন বাইজির ছেলের কোনও আলাদা পরিচয় স্বীকার করতে চায়নি। তাই তার নামের পরিবর্তে তাকে সবসময়ই বাইজি মায়ের পরিচয়ে পরিচিত করা হয়েছে। ১৮৫৩ সালে হীরা তাঁর এক প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকের সাহায্যে ছেলেকে হিন্দু কলেজের জুনিয়র ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করান। তারপরই দেখা দেয় যত সমস্যা।

"জাত গেল হিন্দু কলেজে"

হিন্দু কলেজ তখন শুধু একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। ছিল কলকাতার তৎকালীন অভিজাত আর উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের অহঙ্কারের চূড়ান্ত প্রতীক। সেখানে শুধু বনেদি পরিবারের ছেলেরাই পড়ার সুযোগ পেত। হীরা বুলবুলের ছেলে যখন সেই কলেজের বেঞ্চে গিয়ে বসল, তখন তার পোশাক বা আচরণে কোনও ত্রুটি ছিল না। কারণ তার মায়ের অগাধ অর্থ ছিল। ফলে সেই দিক থেকে কোন‌ও সমস্যা হয়নি।

কিছুদিন পরেই তার আসল পরিচয় জানাজানি হয়ে যায়। আর তারপরেই কলকাতার বাবু সমাজে আক্ষরিক অর্থে ভূমিকম্প ঘটে।

যে বাবুরা রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে হীরা বুলবুলের পায়ে গিয়ে নিজেদের সঁপে দিতেন, তারাই দিনের আলোয় হিন্দু ধর্মের ত্রাতা হয়ে উঠলেন। খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অভিজাত বাবুরা রে রে করে উঠলেন। একজন পতিতার ছেলের সঙ্গে তাদের কুলীন ঘরের ছেলেরা এক বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করবে? এটা হতেই পারে না। এটা তাদের কাছে হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা এবং অভিজাতদের সামাজিক মর্যাদার চূড়ান্ত অপমান বলে মনে হয়।

বাবুদের চরম ভণ্ডামি

হীরা বুলবুলের ছেলেকে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কারের দাবিতে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছিলেন সেকালের কলকাতার দুই ডাকসাইটে সমাজপতি। একজন হলেন কলুটোলার বিখ্যাত ধনী মতিলাল শীল আর অন্যজন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের রাজেন্দ্র দত্ত। তাঁরা একজোট হয়ে তৎকালীন শিক্ষাকর্তাদের কাছে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দাবি ছিল, অবিলম্বে হীরাব বুলবুলের ছেলেকে কলেজ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে হবে। তা না হলে তারা প্রত্যেকে নিজেদের ছেলেদের হিন্দু কলেজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। ব্রিটিশ শিক্ষাকর্তারা প্রথমে যুক্তি দিয়েছিলেন, ছাত্রটি সমস্ত নিয়ম মেনে ভর্তি হয়েছে। তাকে অকারণে বের করা যায় না।

কিন্তু বাবুরা ছিল নাছোড়বান্দা। নিজেদের জাত আর ইগো মেটাতে তারা এক চরম সিদ্ধান্ত নেয়। তারা নিজেদের ছেলেদের ছাড়িয়ে নিয়ে রাতারাতি হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ নামে আস্ত একটা বিকল্প কলেজ তৈরি করে ফেলেছিল। তীব্র সামাজিক চাপের মুখে পড়ে হীরা বুলবুলের ছেলেকে শেষ পর্যন্ত হিন্দু কলেজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

হীরা বুলবুল হেরে গিয়েছিলেন। তাঁর ছেলের আর কোন‌ওদিন কোনও ভদ্র প্রতিষ্ঠানে সেভাবে পড়া হয়নি। ইতিহাসের পাতা থেকে সে চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু এই একটা ঘটনা কলকাতার বাবুদের ভণ্ডামির মুখোশটা চিরকালের মতো টেনে ছিঁড়ে দিয়েছিল। নিজেদের কামনা চরিতার্থ করতে যে নারীকে তারা মাথায় তুলে রাখত, দিনের আলোয় তার সন্তানের শিক্ষার অধিকারটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিতে তাদের বিবেকে বাঁধেনি।

তবে ইতিহাসের বিচার বড় অদ্ভুত। বাবুদের অহঙ্কারের সেই হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ কয়েক বছরের মধ্যেই লাটে ওঠে। আর এই ঘটনার জেরে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু কলেজকে নিজেদের অধীনে নিয়ে নেয়। জন্ম হয় প্রেসিডেন্সি কলেজের। জাতপাতের বেড়াজাল ভেঙে তার দরজা খুলে যায় সবার জন্য। হীরা বুলবুল নিজে হেরে গিয়েও কলকাতার বাবু সমাজের জাতপাতের ওই মিথ্যে আভিজাত্যটা ঠিক ভেঙে দিয়ে গিয়েছিলেন।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য