পহেলগামে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ জঙ্গি হামলার আজ এক বছর পূর্ণ হল। গত বছরের এই দিনে লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গিরা উপত্যকায় যে রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার ক্ষত আজও টাটকা দেশবাসীর মনে। এই বিশেষ দিনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে এক আবেগঘন পোস্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
“আমরা ভুলব না, আমরা হার মানবো না”
বুধবার সকালে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘X’-এ প্রধানমন্ত্রী লেখেন, পহেলগাম হামলায় প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষগুলোকে দেশ কোনোদিন ভুলবে না। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদী চক্রান্তই সফল হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “একটি জাতি হিসেবে আমরা আজ শোকাতুর, কিন্তু আমাদের সংকল্প অটুট। ভারত কোনো পরিস্থিতিতেই সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করবে না।”
ফিরে দেখা সেই কালো দিন
২০২৫ সালের ২২শে এপ্রিল কাশ্মীরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র পহেলগামে অতর্কিতে হামলা চালায় পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবা। সেই হামলায় ২৬ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে জঙ্গিদের বুলেটে তাঁদের প্রাণ যায়।
পাল্টা আঘাত ও ‘অপারেশন সিঁদুর’
পহেলগাম হামলার ক্ষত যেমন গভীর ছিল, ভারতের পাল্টা জবাবও ছিল ঠিক ততটাই শক্তিশালী। এই নারকীয় ঘটনার পরপরই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী শুরু করেছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’। নিয়ন্ত্রণরেখা পার হয়ে পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) জঙ্গিদের লঞ্চপ্যাড এবং পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ভারতীয় সেনা। আজকের দিনে প্রধানমন্ত্রী সেই বীরত্ব ও লড়াইয়ের মানসিকতাকেই আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন।
নিরাপত্তায় আপসহীন কেন্দ্র
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পহেলগাম হামলার বর্ষপূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া বার্তা সরাসরি সীমান্তপারের মদতদাতাদের উদ্দেশ্যে। দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার যে কতটা অনড়, তা আরও একবার স্পষ্ট করতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী।
আজকের দিনটি কেবল শোকের নয়, বরং সন্ত্রাসমুক্ত এক ভারতের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার প্রতিজ্ঞার দিন হিসেবেই দেখছে নয়াদিল্লি। পহেলগামের শহিদদের স্মরণে দেশজুড়ে আজ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
সময়ের প্রান্তিক অন্ধকারে জন্ম নিয়েও আলোকে এক্কেবারে নিজের করে নেওয়ার গল্পই কানন দেবী-র জীবন। ১৯১৬ সালের ২২ শে এপ্রিল, হাওড়ায় জন্ম নেওয়া কাননবালা খুব অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন—জীবন মানে সংগ্রাম। পিতৃহীনতা, দারিদ্র্য, অন্যের বাড়িতে কাজ করা অন্নের অনিশ্চয়তা – এসবই ছিল তাঁর শৈশবের অনিবার্য অংশ। তবুও এই অন্ধকারই তাঁর ভিত গড়ে দেয় আর রচিত হয় শিল্প, সাহস ও নারীস্বাধীনতার এক অনন্য ইতিহাস।
মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ১৯২৬ সালে ম্যাডান থিয়েটারের প্রযোজনায় ও জ্যোতিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’-এ একটি ছোট চরিত্রে তাঁর প্রথম অভিনয়। সেই সময় ভারতীয় সিনেমা ছিল নির্বাক থেকে সবাক যুগে রূপান্তরের পথে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে- সৌন্দর্য, প্রতিভা আর ব্যক্তিত্ব – এই তিনের সম্মিলনে কানন দেবী হয়ে ওঠেন এক বহুমুখী শিল্পী।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় নিউ থিয়েটার্স-এ। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে এই প্রতিষ্ঠান ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৩৫ সালে নির্মিত জ্যোতিশ বন্দোপাধ্যায়ের ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ তাঁকে অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ১৯৩৭ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে অভিনেত্রী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন তারকা, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘সিংগিং স্টার’। প্রায় ৭০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কানন দেবী। এর মধ্যে রয়েছে – ‘ঋষির প্রেম’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘কংসবধ’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘মা’, ‘কণ্ঠহার’, ‘বাসবদত্তা’, ‘পরাজয়’, ‘যোগাযোগ’, ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাথী’, ‘পরিচয়’, ‘শেষ উত্তর’, ‘মেজদিদি’ – এর মতো একাধিক চলচ্চিত্র।
কানন দেবী। গ্রাফিক্স: দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
রাস্তাটা যদিও এতটা সহজ ছিল না। অভিনয়ের জন্য আপত্তি থাকা সত্বেও বেশ এমন কিছু দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়েছে, যা তৎকালীন সময়ে ছিল ‘অশালীন’। অনেক সময়ই পাননি সঠিক পারিশ্রমিক। তবু বারবার নিয়মের বেড়াজাল টপকে সমাজের চোখ রাঙানিকে স্রেফ পরোয়া না করে এক নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেছেন। এমনটাও বলা হয় যে, পর্দায় চুমু খাওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় নারীকে সাবালিকা হতে সাহায্য করেছেন কানন দেবী। শুধুমাত্র তাই-ই নয়, কলকাতার রাস্তায় চট বিছিয়ে তাঁর ফটোগ্রাফ বিক্রি হতো, মহিলাদের কাছে তিনি ছিলেন জ্বলন্ত ফ্যাশন আইকন।
কানন দেবীর কাছে সংগীতচর্চা নিছক পেশা নয়, বরং এটি ছিল তাঁর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তিনি ওস্তাদ আল্লারাখা, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, অনাদি দস্তিদার ও পঙ্কজ কুমার মল্লিক দের মতো পণ্ডিত মানুষদের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। আধুনিক গান ও রবীন্দ্রসংগীতেও তাঁর দক্ষতা ছিল অপূর্ব। অভিনয় ছাড়াও অসংখ্য সিনেমায় তিনি প্লেব্যাক করেছেন। ‘তুফান মেইল যায়’, ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন’, ‘কথা কইবো না বউ’, ‘ঘর যে আমাকে ডাক দিয়েছে’, ‘তোমারে ভুলতে পারিনা’, ‘ফেলে যাবে চলে যাবে তুমি জানি’ ; অথবা রবীন্দ্রসংগীত ‘আজ সবার রঙ্গে’ – গানগুলি অপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আজও যদি কোন রেডিও, এম এম চ্যানেল, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল ফোনের রিংটোনে – ‘আমি বনফুল গো… ‘ গানটি বেজে ওঠে, কানন দেবীর ব্যতিক্রমী কণ্ঠের মায়াজাদু আমাদের একটা আস্ত ইতিহাস স্মরণ করায় আর এক অদ্ভুত মোহময়তায় আকৃষ্ট হয় হৃদয়।
যখন সমাজে অধিকাংশ নারী অবগুণ্ঠিত আর চলচ্চিত্র জগতে পর্দার সামনে সীমাবদ্ধ, সেখানে কানন দেবী পা রাখেন প্রযোজনার জগতে। ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন – নারী কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, সৃষ্টির নিয়ন্ত্রকও হতে পারে। শুধু তাই নয়, আরো দুজন সাথীকে নিয়ে গড়ে তোলেন পরিচালনার একটি দল, নাম দেন – সব্যসাচী।
সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধে কানন দেবী নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয় -এটি এক যুগের সামাজিক ইতিহাস।
১৯৪১ সালে নীতিন বসু পরিচালিত ‘পরিচয়’ এবং এই ছবির-ই হিন্দি সংস্করণ ‘লগন’-এ নায়িকার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য বিএফজেএ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মানে ভূষিত হন কানন দেবী। ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান। এছাড়াও সারাজীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মান। তাঁর মৃত্যুর পর ২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ডাক বিভাগ তাঁর নামে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
সকলের অন্তরালে ১৯৯২ সালের ১৭ই জুলাই তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর স্বপ্নের উত্তরাধিকার আজও জীবন্ত। কানন দেবী কেবল একজন শিল্পী নন – এক রূপান্তরের প্রতীক। তিনি তাঁর জীবনের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা কোনো উপহার নয় – এটি অর্জনের বিষয়। আর সেই অর্জনের পথে দরকার সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের স্বরকে শোনানোর ক্ষমতা। কারণ তিনি শুধু পথ দেখাননি – তিনি নিজেই পথ তৈরি করেছিলেন। আর তাই কানন দেবী এক নাম নয়, এক নির্ভীক উচ্চারণ – যেখানে প্রতিটি নারী নিজের সম্ভাবনাকে নতুন করে চিনতে শেখে…!
বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যজুড়ে কার্যত ‘অদৃশ্য’ হতে বসেছে যাত্রীবাহী বাস। নির্বাচন দফতরের অধিগ্রহণের জেরে মঙ্গলবার থেকেই পরিষেবায় টান পড়েছে, আর ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল ভোট ঘিরে সেই সঙ্কট চরমে উঠবে বলেই আশঙ্কা। বাস মালিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই সময় গণপরিবহণের ওপর নির্ভর না করাই ভালো।
নির্বাচনের কাজে পোলিং পার্টি, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ কর্মীদের যাতায়াত নিশ্চিত করতে হাজার হাজার বাস ইতিমধ্যেই অধিগ্রহণ করেছে প্রশাসন। ফলে একদিকে যেমন শহর, তেমনই জেলায় জেলায় বাসের সংখ্যা হু হু করে কমে গেছে। বিশেষ করে প্রথম দফার ভোটকে সামনে রেখে ২১, ২২ ও ২৩ এপ্রিল কার্যত হাতে গোনা কয়েকটি বাস ছাড়া রাস্তায় কিছুই দেখা যাবে না।
শুধু প্রথম দফাই নয়, দ্বিতীয় দফার প্রস্তুতিতেও একই ছবি। ২৯ এপ্রিল ভোট রয়েছে একাধিক জেলায়, যার জন্য ২৭, ২৮ ও ২৯ এপ্রিলও বাস পরিষেবা প্রায় স্তব্ধ থাকার আশঙ্কা। নির্বাচন দফতরের নির্দেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বাস পাঠানো হচ্ছে, ফলে স্থানীয় রুটগুলিও ফাঁকা হয়ে পড়ছে।
বাস মালিক সংগঠনের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, যাত্রী পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ না রাখতে প্রতিটি রুটে দু’-একটি বাস রাখার চেষ্টা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলির সময়সূচি অনিশ্চিত। কখন বাস পাওয়া যাবে, আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যাত্রীদের মধ্যে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে এই কারণে যে, শুধু বাস নয়—বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক চারচাকা গাড়িও নির্বাচনের কাজে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়ছে। অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে নিত্যযাত্রী—সবাইকেই পড়তে হচ্ছে বিপাকে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন এলেই এই সমস্যা নতুন নয়, তবে এবারের মতো এত বড় আকারে বাস সঙ্কট সচরাচর দেখা যায় না। কারণ একাধিক দফায় ভোট ও বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেক বেশি।
তবে আশার কথা, ভোটপর্ব মিটলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা। বাস মালিকদের দাবি, ৩০ এপ্রিলের পর ধীরে ধীরে রাস্তায় নামবে সব বাস, ফিরবে আগের ছন্দ। ততদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে পরিকল্পনা করে বেরোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জরুরি কাজ না থাকলে বাড়িতে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ, এমনটাই মত সংশ্লিষ্ট মহলের ৷
বিধানসভা ভোটের মুখে ‘ভয়মুক্ত নির্বাচন’ নিশ্চিত করতে আরও একধাপ এগোল লোক ভবন। নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি পৌঁছে দিতে চালু হল ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন পরিষেবা। রাজভবনের তরফে জারি করা প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভোটের আগে ও পরে সম্ভাব্য হিংসা, ভয়ভীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
রাজ্যপাল আরএন রবির নির্দেশে চালু হওয়া এই পরিষেবাকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে বাড়ছে প্রত্যাশা । এর আগে পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনের সময় ‘শান্তিকক্ষ’ চালু করে নজর কেড়েছিল রাজভবন। সেই অভিজ্ঞতাকেই এবার আরও বিস্তৃত আকারে সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত, সাম্প্রতিক সময়ে ভোট ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। অতীতে একাধিক নির্বাচনে বুথ দখল, ভোটারদের ভয় দেখানো, এমনকি প্রতিবাদ করায় হেনস্থার অভিযোগ সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই এই বিশেষ হেল্পলাইন—যেখানে কোনও নাগরিকই সরাসরি নিজের সমস্যা বা আশঙ্কার কথা জানাতে পারবেন।
যদিও কমিশন ইতিমধ্যেই রাজ্যে নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন-সহ একাধিক পদক্ষেপ করেছে, তবুও নাগরিকদের জন্য আলাদা একটি নির্ভরযোগ্য অভিযোগ মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা ছিল বলেই মনে করছে প্রশাসন। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই এই উদ্যোগ।
রাজভবনের দাবি, প্রতিটি অভিযোগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও গোপনীয়তা বজায় রেখে খতিয়ে দেখা হবে। শুধু অভিযোগ গ্রহণেই সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ, এই হেল্পলাইন কেবল তথ্য জানানোর জায়গা নয়—বরং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার এক সক্রিয় মাধ্যম হিসেবেই কাজ করবে।
এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য, ভোটের দিন যেন কোনও ভোটারই ভয় বা চাপে পড়ে বুথমুখো হওয়া থেকে বিরত না থাকেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনাই রাজভবনের প্রধান বার্তা। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই উদ্যোগ ভোট প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
রাজভবনের আবেদন, “গণতন্ত্রের এই উৎসবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিন। নির্ভয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।” ভোটের আগে এই বার্তা ভোটারদের কতটা ভরসা জোগাতে পারে, এখন সেদিকেই নজর সবার।
ডায়াবেটিস—নামটা শুনলেই অনেকের মনে ভয়, উদ্বেগ আর অসংখ্য প্রশ্ন। কিন্তু এই রোগকে ঘিরে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক ভুল ধারণা বা ‘মিথ’। এই ভুল ধারণাগুলিই অনেক সময় রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সচেতনতা বাড়াতে জরুরি সত্যিটা জানা।
১) ডায়াবেটিস খুবই সাধারণ অসুখ?
অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস একটি সাধারণ সমস্যা। বাস্তবে এটি একটি জটিল মেটাবলিক রোগ, যা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদযন্ত্র, কিডনি, স্নায়ু এমনকি চোখেরও ক্ষতি করতে পারে।
২) চিনি কম খেলেই ডায়াবেটিস সেরে যায়?
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ডায়াবেটিস কখনও পুরোপুরি সারে না। চিনি কম খাওয়া রোগ নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ মাত্র, এর সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক ডায়েট, ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ।
৩) সুগার ঠিক থাকলে ওষুধ বন্ধ করা যায়?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে সুগার স্বাভাবিক হলেই ওষুধ বন্ধ করা যাবে। কিন্তু সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে ওষুধের কারণেই। হঠাৎ বন্ধ করলে তা ফের বেড়ে যেতে পারে।
৪) ইনসুলিন ইনজেকশন খুব ক্ষতিকর?
এই ধারণাও ভুল। ইনসুলিন আসলে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি হরমোন। ইনজেকশনের মাধ্যমে এটি দ্রুত সুগার নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাধারণত এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম।
৫) ইনসুলিন নিলে আর ওষুধ লাগে না?
বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইনসুলিনের পাশাপাশি মুখে খাওয়ার ওষুধও চালিয়ে যেতে হয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকই ঠিক করেন কীভাবে চিকিৎসা চলবে।
৬) টাইপ ২ ডায়াবেটিস শুধুই বয়স্কদের হয়?
আগে এই ধারণা কিছুটা সত্যি হলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে ৩০-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যেও টাইপ ২ ডায়াবেটিস বাড়ছে।
৭) বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়?
শুধুমাত্র বেশি খাওয়া ডায়াবেটিসের একমাত্র কারণ নয়। জিনগত কারণ, স্থূলতা, কম শারীরিক পরিশ্রম—সব মিলিয়েই ঝুঁকি বাড়ে।
৮) ডায়াবেটিসের সঙ্গে চোখের সম্পর্ক নেই?
এটি মারাত্মক ভুল ধারণা। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত সুগার চোখের রেটিনায় ক্ষতি করে, যা ‘ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি’ নামে পরিচিত এবং অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।
৯) বাবা-মায়ের থাকলে সন্তানের হবেই?
ডায়াবেটিস বংশগত হলেও, তা নিশ্চিত নয়। তবে ঝুঁকি বেশি থাকায় নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।
১০) গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস মানেই শিশুরও হবে?
অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় সাময়িকভাবে সুগার বাড়ে, যা পরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে শিশুর ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত নয়।
ডায়াবেটিস নিয়ে ভয় না পেয়ে সচেতন হোন। নিয়মিত পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললেই এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সচেতনতা-ই এই ‘নীরব ঘাতক’-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
“স্মার্ট সিটির কথা শুনি, কিন্তু গরমের দিনে ফ্যানই যদি না ঘোরে, তাহলে সেই স্মার্টনেস কোথায়?”
একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বিপ্লব, স্মার্ট সিটির স্বপ্ন— অন্যদিকে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে দাঁড়িয়েও কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের একাংশে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, উন্নয়নের দাবি আর বাস্তবের মধ্যে ব্যবধান কতটা?
রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের চাহিদা অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলেই পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা ১০,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, যা আগে সাধারণত গ্রীষ্মের চূড়ান্ত সময়ে দেখা যেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়তি এসি, শিল্পের প্রসার এবং শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ নির্ভরতা বাড়াই এই চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
কিন্তু চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর সামনে আসছে ক্রমেই। কলকাতার অনেক এলাকাতেই সাম্প্রতিক সময়ে মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। কখনও ঝড়-বৃষ্টি, কখনও ট্রান্সফর্মারের সমস্যা— আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে পাড়া। এমনকি মেট্রো পরিষেবাও ট্রান্সফর্মার সমস্যায় ব্যাহত হওয়ার নজির রয়েছে।
শুধু শহর নয়, জেলা ও গ্রামাঞ্চলেও সমস্যা আরও প্রকট। বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলির উপর চাপ বাড়ছে ক্রমাগত। রাজ্যে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ব্যয় এবং ভর্তুকি সত্ত্বেও চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে প্রশাসনিক মহলেরই স্বীকারোক্তি।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। গ্রামাঞ্চলে তো বটেই খাস কলকাতার বহু এলাকাতেও গরমের সময় লোডশেডিং নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ বহু বাসিন্দার দাবি, সামান্য ঝড় বা মেঘ করলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কসবার সঞ্জয় রাউতের কথায়, “এখন প্রায় রোজকার ব্যাপার— হালকা হাওয়াতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। একদিনে ২-৩ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কোনও আগাম খবর নেই।”
যদিও প্রশাসনের দাবি, প্রকৃত ‘লোডশেডিং’ নয়— অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণ বা অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সাময়িক বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে। বাস্তবে, বাড়তি লোডের চাপ সামলাতে পুরনো পরিকাঠামো বারবার সমস্যায় পড়ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— এআই, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে দাঁড়িয়ে যদি বিদ্যুতের মতো মৌলিক পরিষেবাই নিরবচ্ছিন্ন না হয়, তবে সেই উন্নয়ন কতটা বাস্তব? কলকাতার এক বাসিন্দার কথায়, “স্মার্ট সিটির কথা শুনি, কিন্তু গরমের দিনে ফ্যানই যদি না ঘোরে, তাহলে সেই স্মার্টনেস কোথায়?”
সব মিলিয়ে, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও চাহিদা বৃদ্ধির এই টানাপোড়েনে স্পষ্ট— শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পরিষেবাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গে।
দেশভাগের কিছু বছর আগে কেরালার আকাশ যখন নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজছিল, সেই সময়ে, ১৯২৪ সালের ২১ এপ্রিল কোচিনের কোড়ুঙ্গাল্লুরে জন্ম হয় পি. ভাস্করনের – যিনি পরবর্তী সময়ে মালয়ালম সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাস বদলে দেবেন। কবিতা, সাংবাদিকতা, গান, সিনেমা এবং সংগ্রাম – সমস্ত মাধ্যমেকে হাতিয়ার করে যিনি গড়ে তুলবেন এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক দলিল আর নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠবেন জ্বলন্ত কিংবদন্তি।
তিনি পি. ভাস্করন। পুরো নাম – পুল্লুট্টুপাদাথু ভাস্করন। একজন কবি বা গীতিকার কিংবা চলচ্চিত্র পরিচালক নন, তিনি ছিলেন একাধারে স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজচিন্তক এবং সংস্কৃতির নির্মাতা।
শৈশব থেকেই ভাস্করনের মনে শব্দ আর সুরের প্রতি ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সেই আকর্ষণই ধীরে ধীরে তাকে কবিতার জগতে নিয়ে যায়। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেমের কোমলতা ছিলো তেমনই ছিলো সমাজের কঠিন বাস্তবতার নির্ভীক প্রতিফলন। দারিদ্র্য, বৈষম্য, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম – এই সমস্ত বিষয় তাঁর লেখায় এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠত যে পাঠক তথা শ্রোতা নিজেকে সেই বাস্তবতার অংশ বলে অনুভব করতো।
ভাস্করনের সাহিত্যজীবন শুরু হয় কবিতা দিয়ে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি শতাধিক কবিতা রচনা করেন।। তাঁর কবিতার সংকলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – “ভায়ালার গর্জন করছে ”, যা অনন্য সামাজিক ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক রচনা হিসেবে চূড়ান্ত খ্যাতি লাভ করে।
প্রথম জীবনে ভাস্করন কমিউনিস্ট পার্টির মঞ্চশিল্পীদের জন্য গান লিকজতে শুরু করেন। তাঁর গান তৎকালীন ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাঁর প্রথম কবিতার সংকলন ‘ভিল্লালি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পুনাপ্পা ভায়ালারে কমিউনিস্ট বিদ্রোহের সময় তিনি ‘রবি’ ছদ্মনামে ‘ভায়ালার গর্জিক্কুন্নু ’ শিরোনামে একটি গান লেখেন যা পরবর্তীকালে কিংবদন্তিতুল্য মর্যাদা লাভ করে। যদিও রাজনইতিক অচলাবস্থার কারণে যে সময়ে গানটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাঁকে ত্রিবাঙ্কুর থেকে নির্বাসিত করা হয়। এরপর তিনি ‘জয়কেরলম’-এর সম্পাদকীয় পর্ষদে যোগ দিতে চেন্নাই (তখন মাদ্রাজ) পৌঁছন এবং সেখানেই তাঁর লেখনী চালাতে থাকেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘আকাশবাণী’-র জন্য গান লিখতে শুরু করেন এবং ‘কোঝিকোড় আকাশবাণী’-তে নেন।
গীতিকার হিসেবে পি. ভাস্করানের আত্মপ্রকাশ করেন একটি তামিল চলচ্চিত্রের জন্য। ‘অপূর্ব সগোধরারগাল’ (1949) চলচ্চিত্রে একটি বহুভাষিক গানের জন্য মালায়ালাম ভাষার কথাগুলি লেখেন। আসলে ভাস্করনের প্রকৃত জাদু যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর গানে। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০০-রও বেশি চলচ্চিত্রের জন্য প্রায় ৩০০০ এর অধিক গান লিখেছেন। গীতিকার হিসেবে তাঁর ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু ভাব ছিল গভীর, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছে যেত। মালয়ালম চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে তাঁর লেখা গানগুলো কেবল বিনোদন দেয়নি, বরং মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি বরং মালয়ালম সংগীতের ইতিহাসে ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শুধু তাই নয়, একজন অসাধারণ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
কাহিনীচিত্র ও তথ্যচিত্র মিশিয়ে পরিচালনা করেছেন ৪০টির ও বেশি চলচ্চিত্র। তাঁর পরিচালিত সিনেমাগুলোতে গল্প বলার ধরন, চরিত্র নির্মাণ এবং আবেগের প্রকাশ ছিল তাঁকে অন্য সকলের থেকে আলাদা করে এক স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন, চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজকে প্রতিফলিত করার একটি শক্তিশালী আয়না। তাঁর নির্মিত ‘নীলাকুইল’ দক্ষিণ ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় আর হয়ে ওঠে মালয়ালম সিনেমার এক আস্ত মাইলফলক। এখানেই থেকে থাকেননি অনন্য প্রতিভার অধিকারী ভাস্করন, অভিনয়-ও করেছেন একাধিক সিনেমায়।
একজন সাংবাদিক হিসেবে ভাস্করনের ভূমিকা ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং মেরুদণ্ড সোজা রেখে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তাঁর প্রতিটি লেখা যেন যুক্তির দৃঢ়তায় শান দেওয়া এবং সত্যের খোলা তরবারি।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি পেয়েছেন কেরালা চলচ্চিত্রের অসংখ্য পুরস্কার সহ ‘এশিয়ানেট ফিল্ম অ্যা ওয়ার্ডস’ এবং আজীবন সম্মাননা। সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ কাজের জন্য একাধিক সাহিত্য পুরস্কারের সাথেই ভূষিত হয়েছেন কেরালা সাহিত্য একাডেমী সম্মানে।
২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হলেও, তাঁর সৃষ্টি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। পি. ভাস্করন কেবলমাত্র একজন শিল্পী নন, এক যুগান্তকারী ভাষ্যকার। যিনি শব্দ, চিত্র, আদর্শ ও জীবনবোধের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়েছেন।
ভোটের আগে কড়াকড়ি আরও এক ধাপ বাড়াল নির্বাচন কমিশন। মদের দোকানে ৪৮ ঘণ্টার‘ড্রাই ডে’-র পর এবার কমিশনের নিশানায় মোটরসাইকেল! আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যে বাইক চলাচল ও র্যালির উপর একাধিক কড়া বিধিনিষেধ জারি করল মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের দফতর। লক্ষ্য একটাই—ভোট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও হিংসামুক্ত রাখা।
কীসে নিষেধাজ্ঞা
সোমবার প্রকাশিত নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, ভোটের দু’দিন আগে থেকেই এই কড়াকড়ি কার্যকর হবে। ওই সময় থেকে কোনওভাবেই মোটরবাইক র্যালি করা যাবে না। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রশাসনের মতে, রাতের অন্ধকারে অবাঞ্ছিত জমায়েত বা দুষ্কৃতী কার্যকলাপ ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত।
শুধু র্যালি বা রাতের নিষেধাজ্ঞাই নয়, দিনের বেলাতেও রয়েছে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ। ভোটের দু’দিন আগে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মোটরসাইকেলের পিছনে কোনও আরোহী বসানো যাবে না। ফলে কার্যত ‘এক বাইক, এক আরোহী’ নিয়ম চালু হচ্ছে। তবে চিকিৎসা পরিষেবা, স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াত বা অন্য জরুরি পরিস্থিতিতে এই নিয়মে ছাড় রাখা হয়েছে।
ভোটের দিন কিছুটা শিথিলতা মিললেও নজরদারি থাকবে কড়া। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পারিবারিক প্রয়োজনে বা ভোট দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাইকের পিছনে আরোহী বসানো যাবে। নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে, ভোটারদের বুথে পৌঁছনো যাতে কোনওভাবে ব্যাহত না হয়, সেই কারণেই এই ছাড়। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনেও এই সুবিধা বহাল থাকবে।
নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ, বিশেষ ছাড়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট থানার কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করতে। পাশাপাশি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
পূর্বে ঘোষিতনিষেধাজ্ঞা
এদিকে, ভোটকে কেন্দ্র করে মদ বিক্রির উপরেও কড়া নিয়ন্ত্রণ জারি রয়েছে। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে যে ১৫২টি কেন্দ্রে নির্বাচন হবে, সেখানে ২১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ‘ড্রাই ডে’ কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ ভোটের আগে টানা ৪৮ ঘণ্টা মদ বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। দ্বিতীয় দফার ভোটের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম—২৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাকি ১৪২টি কেন্দ্রে এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হবে।
বিতর্ক
কমিশনের এই যুগপৎ কড়াকড়িতে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। একাংশের মতে, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের স্বার্থে এই পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে পারে। তবে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট, নির্বাচনের মর্যাদা রক্ষায় কোনও রকম ঝুঁকি নেওয়া হবে না।
প্লাস্টিকের বোতলে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ লেখা, রাসায়নিক মিশ্রিত প্রসাধনীতে ‘হার্বাল’ ট্যাগ— চারদিকে যেন সবুজের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বড় প্রতারণা!
পরিবেশবান্ধবতার নামে মিথ্যা প্রচার— এই প্রবণতারই নাম গ্রিনওয়াশিং। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গবেষণায় উঠে এসেছে, বাজারে পরিবেশবান্ধব বলে দাবি করা বহু পণ্যই আসলে বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে।
গ্রিনওয়াশিং কী এবং কেন বিপজ্জনক? গ্রিনওয়াশিং হল এমন এক বিপণন কৌশল, যেখানে কোনও সংস্থা বা ব্র্যান্ড নিজেদের পরিবেশবান্ধব বলে তুলে ধরে, অথচ বাস্তবে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া বা পণ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এই প্রবণতা বিপজ্জনক কারণ, এটি ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে, প্রকৃত পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে পিছনে ঠেলে দেয়, পরিবেশ দূষণ কমানোর লড়াইকে দুর্বল করে৷
গবেষণায় কী উঠে এসেছে? ইউরোপীয় কমিশনের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পরিবেশবান্ধব দাবি করা পণ্যের প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে তথ্য বিভ্রান্তিকর বা অসত্য। ভারতেও একই চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ‘গ্রিন’ ট্যাগের অপব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, “সবুজ শব্দটি এখন বিক্রির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, বাস্তবের সঙ্গে যার সম্পর্ক অনেক সময়ই নেই।”
কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি গ্রিনওয়াশিং? ১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি: ‘সাস্টেইনেবল’ বা ‘অর্গানিক’ পোশাকের নামে দ্রুত উৎপাদন (fast fashion), যা পরিবেশের উপর মারাত্মক চাপ ফেলে। ২. প্রসাধনী শিল্প: ‘ন্যাচারাল’ বা ‘হার্বাল’ দাবি করা হলেও অধিকাংশ পণ্যে থাকে কৃত্রিম রাসায়নিক। ৩. খাদ্য ও প্যাকেজিং: প্লাস্টিক মোড়কে ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ বা ‘রিসাইক্লেবল’ লেখা থাকলেও বাস্তবে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়। ৪. গাড়ি ও জ্বালানি ক্ষেত্র: কম দূষণকারী প্রযুক্তির নামে অতিরঞ্জিত দাবি, যা প্রকৃত নির্গমন কমায় না ততটা।
গ্রিনওয়াশিং ডিটেকটর। ছবি: Google
কীভাবে বোঝা যাবে গ্রিনওয়াশিং? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন— অস্পষ্ট শব্দ: “ইকো-ফ্রেন্ডলি”, “গ্রিন”, “ন্যাচারাল” (প্রমাণ ছাড়া) নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব স্বীকৃত সার্টিফিকেশন না থাকা প্যাকেজিং ও বাস্তবের মধ্যে অসামঞ্জস্য
আইনি কাঠামো কতটা শক্ত? ভারতে ভোক্তা সুরক্ষা আইন ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলি কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলেও, গ্রিনওয়াশিং রুখতে নির্দিষ্ট ও কড়া আইন এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে ২০২৪-২৫ সালের পর থেকে পরিবেশবান্ধব দাবির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি নতুন গাইডলাইন আনার পথে।
সাধারণ মানুষ কীভাবে সচেতন হবেন? * পণ্যের লেবেল ভালো করে পড়ুন * ‘১০০% ন্যাচারাল’ বা ‘কেমিক্যাল ফ্রি’ দাবিতে সন্দেহ রাখুন * সার্টিফিকেশন (যেমন ISO, FSC ইত্যাদি) যাচাই করুন * ব্র্যান্ডের পরিবেশ নীতির খোঁজ নিন
UNEP-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অনেক বড় কোম্পানি Net Zero প্রতিশ্রুতি দিলেও তার প্রায় ৩০–৪০% ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য রোডম্যাপ নেই। ২০২৩-২৪ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, কর্পোরেট ক্লাইমেট ক্লেইমগুলির একটি বড় অংশে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। UNEP সতর্ক করেছে, কার্বন অফসেটিং-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা (বাস্তব নির্গমন না কমিয়ে) গ্রিনওয়াশিংয়ের বড় লক্ষণ। রিপোর্টে উল্লেখ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে ১.৫°C লক্ষ্যমাত্রা রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রায় ৪২% কমাতে হবে—কিন্তু বর্তমান প্রতিশ্রুতি সেই লক্ষ্যের অনেক পিছনে।
কলকাতার বায়ুদূষণ: Kolkata-এ শীতকালে AQI প্রায়শই ২০০–৩৫০-এর মধ্যে থাকে (যা ‘Poor’ থেকে ‘Very Poor’ স্তর)। PM2.5 (সূক্ষ্ম দূষণ কণা) এর বার্ষিক গড় প্রায় ৬০–৯০ µg/m³! যা WHO-র নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (৫ µg/m³)-এর তুলনায় ১০–১৫ গুণ বেশি। শহরের মোট বায়ুদূষণের উৎসের মধ্যে আনুমানিক: যানবাহন: ৩০–৪০% নির্মাণের ধুলো: ২০–৩০% শিল্প ও ইটভাটা: ২০–২৫% শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে ও বাতাস স্থির থাকলে দূষণ জমে গিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কিছু দিনে PM2.5-এর মাত্রা ১৫০–২০০ µg/m³ ছাড়িয়ে যায়, যা ‘Severe’ পর্যায়ের কাছাকাছি।
সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন এখন বাজারের বড় হাতিয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যদি থাকে প্রতারণা, তবে ক্ষতি শুধু ক্রেতার নয়, পুরো পরিবেশের। ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই প্রয়োজন কঠোর আইন, স্বচ্ছ ব্যবসা এবং সর্বোপরি সচেতন নাগরিকের নজরদারি। না হলে ‘সবুজ’ শব্দটাই একদিন বিশ্বাস হারাবে, আর তার মাশুল দেবে প্রকৃতি নিজেই।