The Fourth Axis

শব্দ, সিনেমা ও সংগ্রাম: পি. ভাস্করনের বহুমাত্রিক পৃথিবী

p-bhaskaran-birthday

শব্দ, সিনেমা ও সংগ্রাম: পি. ভাস্করনের বহুমাত্রিক পৃথিবী

শেষ আপডেট: 21 April 2026 13:45

আজ জন্মদিন

দেশভাগের কিছু বছর আগে কেরালার আকাশ যখন নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজছিল, সেই সময়ে, ১৯২৪ সালের ২১ এপ্রিল কোচিনের কোড়ুঙ্গাল্লুরে জন্ম হয় পি. ভাস্করনের – যিনি পরবর্তী সময়ে মালয়ালম সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাস বদলে দেবেন। কবিতা, সাংবাদিকতা, গান, সিনেমা এবং সংগ্রাম – সমস্ত মাধ্যমেকে হাতিয়ার করে যিনি গড়ে তুলবেন এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক দলিল আর নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠবেন জ্বলন্ত কিংবদন্তি।

তিনি পি. ভাস্করন। পুরো নাম –  পুল্লুট্টুপাদাথু ভাস্করন। একজন কবি বা গীতিকার কিংবা চলচ্চিত্র পরিচালক নন, তিনি ছিলেন একাধারে স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজচিন্তক এবং সংস্কৃতির নির্মাতা।

শৈশব থেকেই ভাস্করনের মনে শব্দ আর সুরের প্রতি ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সেই আকর্ষণই ধীরে ধীরে তাকে কবিতার জগতে নিয়ে যায়। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেমের কোমলতা ছিলো তেমনই ছিলো সমাজের কঠিন বাস্তবতার নির্ভীক প্রতিফলন। দারিদ্র্য, বৈষম্য, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম – এই সমস্ত বিষয় তাঁর লেখায় এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠত যে পাঠক তথা শ্রোতা  নিজেকে সেই বাস্তবতার অংশ বলে অনুভব করতো।

ভাস্করনের সাহিত্যজীবন শুরু হয় কবিতা দিয়ে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি শতাধিক কবিতা রচনা করেন।। তাঁর কবিতার সংকলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – “ভায়ালার গর্জন করছে ”,  যা অনন্য সামাজিক ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক রচনা হিসেবে চূড়ান্ত খ্যাতি লাভ করে।

প্রথম জীবনে ভাস্করন কমিউনিস্ট পার্টির মঞ্চশিল্পীদের জন্য গান লিকজতে শুরু করেন। তাঁর গান তৎকালীন ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাঁর প্রথম কবিতার সংকলন ‘ভিল্লালি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।  পুনাপ্পা ভায়ালারে কমিউনিস্ট বিদ্রোহের সময় তিনি ‘রবি’ ছদ্মনামে ‘ভায়ালার গর্জিক্কুন্নু ’ শিরোনামে একটি গান লেখেন যা পরবর্তীকালে কিংবদন্তিতুল্য মর্যাদা লাভ করে। যদিও রাজনইতিক অচলাবস্থার কারণে যে সময়ে গানটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাঁকে ত্রিবাঙ্কুর থেকে নির্বাসিত করা হয়। এরপর তিনি ‘জয়কেরলম’-এর সম্পাদকীয় পর্ষদে যোগ দিতে চেন্নাই (তখন মাদ্রাজ) পৌঁছন এবং সেখানেই তাঁর লেখনী চালাতে থাকেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘আকাশবাণী’-র জন্য গান লিখতে শুরু করেন এবং ‘কোঝিকোড় আকাশবাণী’-তে নেন।

গীতিকার হিসেবে পি. ভাস্করানের আত্মপ্রকাশ করেন একটি তামিল চলচ্চিত্রের জন্য। ‘অপূর্ব সগোধরারগাল’ (1949) চলচ্চিত্রে একটি বহুভাষিক গানের জন্য মালায়ালাম ভাষার কথাগুলি লেখেন। আসলে ভাস্করনের প্রকৃত জাদু যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর গানে। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৩০০-রও বেশি চলচ্চিত্রের জন্য প্রায় ৩০০০ এর অধিক গান লিখেছেন। গীতিকার হিসেবে তাঁর ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু ভাব ছিল গভীর, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছে যেত। মালয়ালম চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে তাঁর লেখা গানগুলো কেবল বিনোদন দেয়নি, বরং মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি বরং মালয়ালম সংগীতের ইতিহাসে ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শুধু তাই নয়, একজন অসাধারণ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

কাহিনীচিত্র ও তথ্যচিত্র মিশিয়ে পরিচালনা করেছেন ৪০টির ও বেশি চলচ্চিত্র। তাঁর পরিচালিত সিনেমাগুলোতে গল্প বলার ধরন, চরিত্র নির্মাণ এবং আবেগের প্রকাশ ছিল তাঁকে অন্য সকলের থেকে আলাদা করে এক স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন, চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজকে প্রতিফলিত করার একটি শক্তিশালী আয়না। তাঁর নির্মিত ‘নীলাকুইল’ দক্ষিণ ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় আর হয়ে ওঠে মালয়ালম সিনেমার এক আস্ত মাইলফলক। এখানেই থেকে থাকেননি অনন্য প্রতিভার অধিকারী ভাস্করন, অভিনয়-ও করেছেন একাধিক সিনেমায়।

একজন সাংবাদিক হিসেবে ভাস্করনের ভূমিকা ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং মেরুদণ্ড সোজা রেখে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তাঁর প্রতিটি লেখা যেন যুক্তির দৃঢ়তায় শান দেওয়া এবং সত্যের খোলা তরবারি।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি পেয়েছেন কেরালা চলচ্চিত্রের অসংখ্য পুরস্কার সহ ‘এশিয়ানেট ফিল্ম অ্যা ওয়ার্ডস’ এবং আজীবন সম্মাননা। সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ কাজের জন্য একাধিক সাহিত্য পুরস্কারের সাথেই ভূষিত হয়েছেন কেরালা সাহিত্য একাডেমী সম্মানে।

২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হলেও, তাঁর সৃষ্টি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। পি. ভাস্করন কেবলমাত্র একজন শিল্পী নন, এক যুগান্তকারী ভাষ্যকার।  যিনি শব্দ,  চিত্র, আদর্শ  ও জীবনবোধের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়েছেন।