

রাত দখলের ডাকের আঁচ ছড়িয়ে পড়ল শহর, রাজ্য,দেশ ছড়িয়েও। - নিজস্ব ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
২২শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
ইতিহাসের কিছু আন্দোলনের কোনও নির্দিষ্ট নেতা থাকে না। কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা থাকে না। থাকে শুধু মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের দাবি। আরজি কর-কাণ্ডের পর বাংলায় যে নাগরিক আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিল ‘রাত দখল’ কর্মসূচি। একটি তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যেই পরিণত হয় নারীর নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বৃহত্তর আন্দোলনে।
অগস্টের প্রথম সপ্তাহে ক্ষোভ সীমাবদ্ধ ছিল আরজি কর হাসপাতাল এবং চিকিৎসক সমাজের মধ্যে। জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান, প্রতিবাদ মিছিল এবং সামাজিক মাধ্যমে সরব হওয়ার ঘটনা ক্রমশ জনমত তৈরি করছিল। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে, ততই সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেন যে ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। প্রশ্ন উঠছিল, যদি একজন মহিলা চিকিৎসক নিজের কর্মস্থলে নিরাপদ না হন, তবে সাধারণ মহিলাদের নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি আহ্বান, ‘রাত দখল করো’। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। রাতের শহর শুধু পুরুষদের নয়, নারীদেরও সমান অধিকার রয়েছে। ভয়কে পরাজিত করেই সেই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই বার্তা। কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছিল না, কোনও সংগঠনের একক নিয়ন্ত্রণও ছিল না। কিন্তু মানুষ সাড়া দিতে শুরু করেন অভূতপূর্বভাবে। বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন স্বতঃস্ফূর্ত ডিজিটাল আহ্বান আগে কখনও দেখা যায়নি৷

১৪ অগস্ট রাত। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তা, মোড় এবং চত্বরে জমতে শুরু করেন হাজার হাজার মানুষ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মহিলাদের উপস্থিতি। কলেজছাত্রী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গৃহবধূ, শিল্পী, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী— সমাজের নানা স্তরের মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে পথে নামেন। কারও হাতে লেখা ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, কারও পোস্টারে ছিল ‘রাত আমাদেরও’। কেউ মোমবাতি জ্বালিয়েছিলেন, কেউ নীরব মিছিল করেছিলেন। কিন্তু সবার দাবি ছিল এক— নির্যাতিতার জন্য ন্যায়বিচার। কলকাতা যেন সেই রাতে এক নতুন নাগরিক চেতনার সাক্ষী হয়েছিল।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর চরিত্র। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মিছিল-সমাবেশ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখানে কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না, ছিল না দলীয় স্লোগানও। বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং ক্ষোভই আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠেছিল। অনেক মহিলা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন, রাতের শহরে চলাফেরা করার সময় তাঁরা কতবার ভয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। আরজি কর-কাণ্ড যেন বহুদিনের জমে থাকা অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
কিন্তু যে রাত নাগরিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই রাতেই ঘটে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা। ১৪ অগস্ট গভীর রাতে আরজি কর হাসপাতালের ভিতরে একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর সামনে আসে। ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন উঠতে থাকে— কারা এই হামলার সঙ্গে যুক্ত? উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ অভিযোগ করে, আরজি করের সেমিনার হল থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। যদিও প্রশাসন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। তবু ভাঙচুরের ঘটনাটি জনমনে নতুন সন্দেহের জন্ম দেয়।
আরজি কর তখন আর শুধু কলকাতার ঘটনা নয়। শিলিগুড়ি, বহরমপুর, দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান, মালদহ, মেদিনীপুর— রাজ্যের নানা প্রান্তে শুরু হয় প্রতিবাদ কর্মসূচি। একই সঙ্গে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ এবং চেন্নাইতেও চিকিৎসক সংগঠনগুলি সরব হতে শুরু করে।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত শিরোনাম হতে থাকে আরজি কর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সামাজিক মাধ্যমে সমর্থন জানাতে শুরু করেন।
একটি আঞ্চলিক ঘটনা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
সরকারের উপর বাড়তে থাকে চাপ
গণ আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে জানান, দোষীদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু আন্দোলনকারীদের একাংশ মনে করছিলেন, শুধুমাত্র আশ্বাস যথেষ্ট নয়। তাঁরা চাইছিলেন তদন্তের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ হোক। এই সময় থেকেই আদালতের হস্তক্ষেপের দাবিও জোরালো হতে শুরু করে।
১৪ অগস্টের রাত বাংলার নাগরিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে রয়েছে। কারণ, সেই রাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, আরজি কর-কাণ্ডকে আর প্রশাসনিক বিবৃতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। চিকিৎসকরা আন্দোলনে। নাগরিক সমাজ সরব। আর সেই জনচাপই খুব দ্রুত তদন্তের গতিপথ বদলে দিয়েছিল ৷ আদালতের নির্দেশে ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে মামলার তদন্তভার কলকাতা পুলিশের কাছ থেকে গিয়েছিল সিবিআইয়ের হাতে৷
(চলবে)
জুনিয়র ডাক্তারদের বিদ্রোহ, নবান্নের সঙ্গে সংঘাত এবং সরকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
