

ছবি - AI
২১শে আগস্ট, ২০২৬
পৃথিবীতে তখনও মানুষের অস্তিত্বের কোনও প্রশ্নই নেই। সূর্যের জন্মও হয়নি। পৃথিবী নামে যে গ্রহ এক দিন তৈরি হবে, তার কোনও চিহ্নও মহাবিশ্বে নেই। সেই সময়, আজ থেকে প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন বছর আগে, মহাবিশ্বের এক প্রান্তে ঘটে গিয়েছিল এক বিরাট মহাজাগতিক ঘটনা। সদ্য বেড়ে উঠতে শুরু করা আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কি ওয়ে নিজের মহাকর্ষের টানে একটি ছোট ছায়াপথকে নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। কোটি কোটি বছর পেরিয়ে সেই ঘটনারই চিহ্ন এ বার খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া মিশনের তথ্য মিলিয়ে মিল্কি ওয়ের শৈশবের সেই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের সন্ধান মিলেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Astronomy পত্রিকায়।
আজ যে আকাশগঙ্গাকে আমরা বিশাল এক ছায়াপথ হিসেবে দেখি, তখন তার চেহারা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। বয়সে সে তখন একেবারেই তরুণ। আর সেই সময়েই তার পথে এসে পড়ে একটি ছোট ছায়াপথ। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন LKH: Low-energy-Kraken-Heracles। আকারে ছোট হলেও সেই ছায়াপথে ছিল প্রায় ৫০ কোটি সূর্যের সমান নক্ষত্রের ভর।
কী ভাবে বিজ্ঞানীরা এত পুরনো একটি ঘটনার হদিস পেলেন? কোনও ক্যামেরায় তো ১১.৮ বিলিয়ন বছর আগের সেই সংঘর্ষের ছবি তোলা সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীরা খুঁজেছেন ঘটনার ‘ছাপ’। সেই সূত্র লুকিয়ে ছিল মিল্কি ওয়ের কয়েকটি অত্যন্ত প্রাচীন নক্ষত্রগুচ্ছে।
গবেষকেরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের প্রায় ২০ হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ৩৯টি প্রাচীন গ্লোবুলার ক্লাস্টার বা গোলাকার নক্ষত্রগুচ্ছ পরীক্ষা করেন। হাবলের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় তাদের বয়স ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। আর গাইয়া মিশনের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয় নক্ষত্রগুলির গতিবিধি।
নক্ষত্রগুচ্ছগুলিকে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তিন ধরনের আলাদা গোষ্ঠীর সন্ধান পান। কিছু নক্ষত্রগুচ্ছ মিল্কি ওয়ের নিজের। কিছু এসেছে প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে ঘটে যাওয়া আর একটি বড় ছায়াপথ-সংযুক্তির সময়। কিন্তু তৃতীয় একটি গোষ্ঠীর নক্ষত্রগুচ্ছের বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং গতিপথ কোনওটির সঙ্গেই মেলেনি।
সেই অমিলই বিজ্ঞানীদের নিয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া LKH ছায়াপথটির কাছে। তাঁদের ধারণা, ওই নক্ষত্রগুচ্ছগুলি এক সময় LKH-রই অংশ ছিল। পরে ছোট ছায়াপথটি মিল্কি ওয়ের সঙ্গে মিশে যায়। তার সঙ্গে তার নক্ষত্রগুলিও আকাশগঙ্গার অংশ হয়ে যায়। অর্থাৎ, আজও মিল্কি ওয়ের ভিতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন কিছু নক্ষত্র, যাদের আসল বাড়ি ছিল অন্য একটি ছায়াপথে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এত দিন পর্যন্ত মিল্কি ওয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো বড় ধরনের ছায়াপথ-সংযুক্তির অন্যতম প্রমাণ হিসেবে প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগের Gaia-Sausage-Enceladus ঘটনাকে ধরা হত। নতুন গবেষণা সেই ইতিহাসকে আরও প্রায় ১.৮ বিলিয়ন বছর পিছিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, মিল্কি ওয়ে যখন নিজেই সদ্য তৈরি হওয়া এক তরুণ ছায়াপথ, তখনই তার বৃদ্ধির পথে শুরু হয়েছিল ‘গিলে খাওয়ার’ প্রক্রিয়া।
আর এখানেই মিলছে আকাশগঙ্গার জন্মের এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। ছায়াপথের এই ধরনের সংযুক্তিতে শুধু নক্ষত্র নয়, গ্যাস এবং ডার্ক ম্যাটারও এক ছায়াপথ থেকে অন্য ছায়াপথে চলে যেতে পারে। ফলে অন্য ছায়াপথ থেকে আসা পদার্থও আজকের মিল্কি ওয়ের কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা নিয়েছে।
ভাবলে বিস্ময় লাগে, যে সময় সূর্যের অস্তিত্বই ছিল না, সেই সময়ের একটি ছায়াপথের নক্ষত্র আজও আমাদের আকাশগঙ্গার অংশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা তার কোনো এক ধরণের অস্তিত্ব আছে এখানে।
মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। তার মাত্র কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ছায়াপথগুলির এই সংঘর্ষ, সংযুক্তি এবং পুনর্গঠনের খেলা। সেই সুদূর অতীতের ক্ষীণ চিহ্নই এত দিন পরে পড়তে পারছেন বিজ্ঞানীরা। হাবল তাই শুধু দূরের মহাকাশের ছবি তুলছে না। মিল্কি ওয়ের নক্ষত্রগুলির বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং গতিপথ পড়ে সে যেন খুলে দিচ্ছে আমাদের নিজেদের ছায়াপথের পুরনো ইতিহাসের পাতা।
আর সেই ইতিহাসের একটি পাতায় লেখা, পৃথিবীতে মানুষ আসার বহু বহু আগে, সূর্যের জন্মেরও আগে, অন্য একটি ছায়াপথকে নিজের মধ্যে মিশিয়ে নিয়েই বড় হতে শুরু করেছিল আমাদের আকাশগঙ্গা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
