১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
এ বার গাছেই তৈরি হবে মাংসের প্রোটিন

প্রতীকী ছবি - Google

এ বার গাছেই তৈরি হবে মাংসের প্রোটিন

লেটুসের পাতা দেখলে মাংসের কথা মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই। সবুজ পাতা, সালোকসংশ্লেষ, জল ও আলো—তার জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। মাংসের ক্ষেত্রে আবার মূল চরিত্র পেশি, প্রোটিন এবং প্রাণীর কোষ। অথচ জিনগত প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এই দুই জগতের মধ্যে তৈরি করেছেন এক আশ্চর্য সেতু। প্রথম বার একটি ভোজ্য উচ্চতর উদ্ভিদের মধ্যে স্থায়ী ভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রাণীর পেশিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন ‘মায়োগ্লোবিন’। অর্থাৎ ভবিষ্যতে মাংসের বিকল্প খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি হতে পারে গাছেই।

গবেষণাটি করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, ক্যামব্রিজের কিয়োমি লিমিটেড, ইউসিএলএ এবং চিনের নানচাং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রিকা Frontiers in Plant Science-এ। গবেষণাপত্রটির নাম ‘Sustainable production of myoglobin meat protein in plant chloroplasts’। গবেষকদের দাবি, উচ্চতর উদ্ভিদের মধ্যে স্থায়ী ভাবে মায়োগ্লোবিন উৎপাদনের এটি প্রথম রিপোর্ট।

মায়োগ্লোবিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মাংসের ‘লাল’ চেহারা এবং তার বিশেষ স্বাদ-গন্ধের সঙ্গে মায়োগ্লোবিনের সম্পর্ক রয়েছে। এটি একটি ‘হিম-প্রোটিন’—অর্থাৎ প্রোটিনটির সঙ্গে হিম নামের লৌহযুক্ত অংশ যুক্ত থাকে। প্রাণীর পেশিতে অক্সিজেন ধরে রাখার ক্ষেত্রে মায়োগ্লোবিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। খাদ্যশিল্পে মাংসের বিকল্প তৈরি করার সময় তাই শুধু উদ্ভিদ থেকে প্রোটিন পাওয়া যথেষ্ট নয়। আসল মাংসের মতো চেহারা, রং ও স্বাদের কাছাকাছি পৌঁছনোর জন্য মায়োগ্লোবিনের মতো প্রাণীজ প্রোটিনের প্রয়োজন হতে পারে।

এই কারণেই গবেষকদের লক্ষ্য ছিল গোটা মাংসকে গাছে তৈরি করা নয়, বরং মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আণবিক উপাদানকে উদ্ভিদে উৎপাদন করা।

গাছের কোন অংশে ঢোকানো হল প্রাণীর জিন?

এখানেই গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত দিক। বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের সাধারণ নিউক্লিয়াসে মায়োগ্লোবিনের জিন ঢোকাননি। তাঁরা লক্ষ্য করেন গাছের ক্লোরোপ্লাস্টকে।

ক্লোরোপ্লাস্ট হল উদ্ভিদ কোষের সেই অঙ্গাণু, যেখানে সালোকসংশ্লেষ হয়। কিন্তু তার আরও একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে—ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব জিনগত ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেখানে জিনের একাধিক কপি উপস্থিত থাকতে পারে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট প্রোটিন বেশি পরিমাণে উৎপাদনের জন্য ক্লোরোপ্লাস্টকে একটি সম্ভাবনাময় ‘বায়োফ্যাক্টরি’ হিসাবে ব্যবহার করা যায়।

গবেষকেরা সেই পথেই মায়োগ্লোবিনের জিন ক্লোরোপ্লাস্টে প্রবেশ করান। লেটুসের পাশাপাশি তামাক গাছেও পরীক্ষা চালানো হয়। তামাক খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার জন্য নয়; উদ্ভিদ-জিন প্রকৌশলের পরীক্ষাগার মডেল হিসাবে তামাক বহু দিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

‘জিন গান’ দিয়ে গাছের কোষে ঢুকল প্রাণীর জিন

শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো হলেও পদ্ধতিটি যথেষ্ট বাস্তব। গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন ‘জিন গান’ প্রযুক্তি। অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণার সাহায্যে কাঙ্ক্ষিত জিনগত উপাদান উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করানো হয়। পরে সেই পরিবর্তিত কোষ থেকে গাছ তৈরি করা হয়।

গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পরিবর্তনটি শুধু সাময়িক ছিল না। ক্লোরোপ্লাস্টে মায়োগ্লোবিনের জিন স্থায়ী ভাবে উপস্থিত রেখে উদ্ভিদকে তা উৎপাদনে সক্ষম করা হয়েছে। এই স্থায়ী উৎপাদনই গবেষণাটিকে আগের কিছু পরীক্ষামূলক উদ্ভিদ-প্রোটিন উৎপাদনের কাজ থেকে আলাদা করে।

কতটা মায়োগ্লোবিন তৈরি হল?

এখানেই গবেষণার ফল আরও গুরুত্বপূর্ণ। তামাক গাছে মোট দ্রবণীয় প্রোটিনের প্রায় ২.৭ শতাংশ পর্যন্ত মায়োগ্লোবিন পাওয়া গিয়েছে। লেটুসে সেই হার প্রায় ১.৫ শতাংশ। তুলনায় সবুজ শৈবাল Chlamydomonas reinhardtii-এ তা ছিল ০.২৫ শতাংশেরও কম।

অর্থাৎ, লেটুসের মতো খাদ্যোপযোগী গাছও প্রাণীজ মায়োগ্লোবিন তৈরির জন্য কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে—এমন সম্ভাবনার প্রমাণ মিলেছে। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, তামাকের ক্লোরোপ্লাস্টে উৎপাদন উদ্ভিদের নিউক্লিয়াস-ভিত্তিক জিন-প্রকাশের তুলনায় বেশি কার্যকর হয়েছে।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় সমস্যা, ‘হিম’

আরও পড়ুন
ডাইনোসরদের বিবর্তনের ইতিহাস এখনও অসম্পূর্ণ!
দূরত্বের সব রেকর্ড ভাঙল ‘ভয়েজার ১’ !
পৃথিবী থেকে মাত্র ২৫ আলোকবর্ষ দূরেই বাসযোগ্য গ্রহ !

মায়োগ্লোবিন তৈরি হলেই কাজ শেষ নয়। মায়োগ্লোবিনকে কার্যকর হতে হলে তার সঙ্গে ‘হিম’ যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পরিবর্তিত উদ্ভিদে মোট হিমের মাত্রা বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত মায়োগ্লোবিনের সঙ্গে হিম যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

তামাক থেকে বিশুদ্ধ করা শূকরের মায়োগ্লোবিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ মায়োগ্লোবিনের সঙ্গে হিম যুক্ত ছিল। একই মায়োগ্লোবিন ব্যাকটেরিয়া E. coli-তে তৈরি করলে হিম-বাঁধার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ গাছ প্রোটিন তৈরি করতে পারছে, কিন্তু সেই প্রোটিনকে পুরোপুরি কার্যকর অবস্থায় নিয়ে যেতে পর্যাপ্ত হিম সরবরাহ এখনও বড় বাধা।

এই ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, গবেষণাটি এখনও ‘মাংসের বিকল্প তৈরি হয়ে গেল’ পর্যায়ে পৌঁছয়নি। বরং বিজ্ঞানীরা একটি সম্ভাব্য উৎপাদন-পদ্ধতির প্রমাণ পেয়েছেন এবং একই সঙ্গে তার প্রধান সীমাবদ্ধতাটিও চিহ্নিত করেছেন।

তা হলে কি বাজারে আসছে ‘মাংসের লেটুস’?

না। অন্তত এখনই নয়।

এই গবেষণার উদ্দেশ্য লেটুসের পাতা খেয়ে স্টেকের স্বাদ পাওয়া নয়। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হল উদ্ভিদকে এমন একটি জৈবিক কারখানা হিসাবে ব্যবহার করা, যেখান থেকে ভবিষ্যতে মাংসের বিকল্প খাবার তৈরির প্রয়োজনীয় প্রাণীজ প্রোটিন সংগ্রহ করা যেতে পারে।

বর্তমানে বিকল্প মাংস শিল্পে প্রাণীজ প্রোটিনের কিছু উপাদান উৎপাদনের জন্য অণুজীব—যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট—ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে সেই কাজের একটি অংশ সরাসরি উদ্ভিদের মাধ্যমে করা সম্ভব হতে পারে।

ভাবনাটা তাই এমন—গাছকে খাওয়ানোর বদলে গাছই হয়ে উঠবে উৎপাদনকারী। জমিতে গাছ বেড়ে উঠবে, আর সেই গাছের কোষে তৈরি হবে খাদ্যশিল্পের প্রয়োজনীয় প্রাণীজ প্রোটিন।

কেন এই গবেষণাকে পরিবেশের সঙ্গে জুড়ে দেখা হচ্ছে?

প্রাণীজ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জমি, জল, পশুখাদ্য এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সেই কারণেই বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদ-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিকল্প প্রোটিনের গবেষণা বাড়ছে।

তবে এই গবেষণা থেকে এখনই বলা যাবে না যে লেটুস-ভিত্তিক মায়োগ্লোবিন প্রচলিত পশুপালনের চেয়ে নিশ্চিত ভাবে বেশি পরিবেশবান্ধব বা সস্তা। গবেষকেরাও মূলত সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছেন। বড় আকারে উৎপাদন, খরচ, জমির প্রয়োজন, জল ব্যবহার, প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্যনিরাপত্তা—সবই ভবিষ্যতের গবেষণায় যাচাই করতে হবে।

মানুষের খাবার হিসাবে কতটা নিরাপদ?

এই প্রশ্নের উত্তরও এখনও চূড়ান্ত নয়। লেটুস একটি খাদ্যশস্য হলেও জেনেটিক ভাবে পরিবর্তিত লেটুসে প্রাণীজ মায়োগ্লোবিন উৎপাদনের বিষয়টি খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের আগে আলাদা নিরাপত্তা মূল্যায়ন চাইবে। প্রোটিনের গঠন, অ্যালার্জির সম্ভাবনা, হিমের মাত্রা, পুষ্টিগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা—সবই খতিয়ে দেখতে হবে।

অর্থাৎ গবেষণাপত্রটি খাদ্যবাজারে ব্যবহারের অনুমোদন নয়; এটি একটি proof of concept—উচ্চতর উদ্ভিদ স্থায়ী ভাবে প্রাণীজ মায়োগ্লোবিন তৈরি করতে পারে, তার পরীক্ষামূলক প্রমাণ।

সামনে কোন দরজা খুলতে পারে?

এই গবেষণার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। আজ মায়োগ্লোবিন, কাল হয়তো অন্য প্রাণীজ প্রোটিন। বিজ্ঞানীরা যদি উদ্ভিদের কোষকে আরও দক্ষ ‘প্রোটিন কারখানা’ বানাতে পারেন, তা হলে ভবিষ্যতের খাদ্যশিল্পে মাঠের ফসল শুধু কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন বা উদ্ভিদ-প্রোটিনের উৎস থাকবে না—প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রাণীজ প্রোটিন তৈরির প্ল্যাটফর্মও হয়ে উঠতে পারে।

তবে সেই ভবিষ্যৎ এখনও দূরে। বর্তমান গবেষণার ফল বরং একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—মাংসের বিকল্প তৈরি করতে গেলে মাংসের মতো গোটা খাবারই কি তৈরি করতে হবে? নাকি তার প্রয়োজনীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অণু গাছের মধ্যেই তৈরি করে নেওয়া সম্ভব?

লেটুসের পাতায় মায়োগ্লোবিন তৈরির গবেষণা সেই দ্বিতীয় পথের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির একটি। মাংসকে গাছে ফলিয়ে দেওয়ার গল্প নয় এটি। বরং গাছকে ‘প্রোটিন কারখানা’ বানানোর বিজ্ঞানের নতুন দরজা খোলার গল্প।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য