

রংপুরে অবস্থিত অহোম রাজপ্রাসাদ। ছবি - Google
২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অষ্টাদশ শতাব্দীর অসম। আজকের থেকে অনেক বড় ছিল আয়তনে। রাজধানী ছিল রংপুরে, যা আজ বাংলাদেশে অবস্থিত। সেই সময় অর্থাৎ ১৭৬৯ সালে রংপুরে এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। 'স্বর্গদেউ'-এর রাজপ্রাসাদের বাইরে (রাজাকে আহোম সাম্রাজ্যে স্বর্গদেউ বলা হতো) বিদ্রোহীদের গগনভেদী উল্লাস, আর অন্দরমহলে ঘনিয়ে উঠেছে এক চূড়ান্ত অবমাননাকর অধ্যায়। পরাক্রমশালী অহোম রাজা বন্দি। সিংহাসন দখল করে বসা এক বিদ্রোহী নেতা ক্ষমতার দম্ভে গায়েরজোরে শয্যাসঙ্গিনী করেছে খোদ মহারানিকে!
সেই নারী ছিলেন মণিপুরের রাজকন্যা কুরঙ্গনয়নী। বাবা অর্থাৎ মণিপুরের রাজা জয় সিংহের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৬০০ বছরে ধরে ক্ষমতায় থাকা অহোম রাজ পরিবারে।
১৭৫৯ সালে বর্মী (আজকের মায়ানমার) সেনার অতর্কিত আক্রমণে মণিপুরের রাজা জয় সিংহ (ভাগ্যচন্দ্র) সিংহাসনচ্যুত হন। নিরুপায় হয়ে তিনি অহোম সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী রাজা রাজেশ্বর সিংহের দ্বারস্থ হন। রাজেশ্বর সিংহ তাঁকে ফেরাননি। তাঁর পাঠানো বিশাল সামরিক বাহিনীর সাহায্যে জয় সিংহ নিজের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। সেই বিপুল উপকারের ঋণ শোধ করতে ১৭৬৮ সালে জয় সিংহ তাঁর পরমা সুন্দরী কন্যা কুরঙ্গনয়নীর বিয়ে দেন অহোম রাজ রাজেশ্বর সিংহের সঙ্গে। এভাবেই অহোম রাজপ্রাসাদে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে প্রবেশ ঘটে কুরঙ্গনয়নীর। তিনি হয়ে ওঠেন অহোম মহারানি।
কিন্তু রাজকীয় আভিজাত্যের এই শান্তি বেশিদিন টেকেনি। বিয়ের মাত্র এক বছর পর ১৭৬৯ সালে রাজেশ্বর সিংহের মৃত্যু হয়। এরপর অহোম রাজবংশের দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী, মৃত রাজার বিধবা পত্নীদের গ্রহণ করার অধিকার বর্তায় পরবর্তী রাজার ওপর। সেই নিয়ম মেনেই রাজেশ্বর সিংহের ভাই লক্ষ্মী সিংহ সিংহাসনে বসে প্রথামাফিক কুরঙ্গনয়নীকে নিজের প্রধান রানি হিসেবে গ্রহণ করেন। কুরঙ্গনয়নী আবারও পেলেন মহারানির স্বীকৃতি। তবে ততদিনে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অর্থাৎ 'বরবরুয়া' কীর্তিচন্দ্রের আচার-আচরণ ও অত্যাচারে ব্যাপক ক্ষুব্ধ প্রজাদের এক বিরাট অংশ।
লক্ষ্মী সিংহের রাজত্বকালে অহোম প্রশাসনের সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিলেন মন্ত্রী কীর্তিচন্দ্র বরবরুয়া। এই ক্ষমতালোভী ও দাম্ভিক মন্ত্রী মরাণ উপজাতির (যাঁরা মূলত বৈষ্ণব ধর্মের মোয়ামরিয়া বা মায়ামরা সত্রের অনুগামী ছিলেন) ওপর চরম অত্যাচার শুরু করেন। বাদ যাননি তাঁদের ঈশ্বরতুল্য ধর্মগুরুরাও। রাজদরবারে ডেকে এনে তাঁদের প্রকাশ্য অপমান করা হয়।
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয়, মোয়ামরিয়ারা ঠিক সেটাই করল। ১৭৬৯ সালে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহীরা নাহর খোঁড়া, রমাকান্ত এবং রাঘ নেওগের (রাঘ মরাণ) নেতৃত্বে এক সর্বগ্রাসী সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহীদের তেজে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে অহোম সেনাবাহিনী। রাজধানী দখল করে রাজা লক্ষ্মী সিংহ সহ রাজ পরিবারের সদস্যদের আটক করে জয়সাগর মন্দিরের কাছে বন্দি করে রাখে বিদ্রোহীরা।
এরপরই ঘটে চরম কেলেঙ্কারি। বিদ্রোহী নেতা রাঘ নেওগ অহোম রাজবংশকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার ছক কষে। সোজা ঢুকে পড়ে রাজপরিবারের অন্দরমহলে (হারেম)। অহোম রাজাদের অহঙ্কার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে তিনি মহারানি কুরঙ্গনয়নীকে জোরপূর্বক নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। খোদ মহারানিকে বাধ্য করা হয় এক সাধারণ বিদ্রোহী নেতার শয্যাসঙ্গিনী হতে। অসমের ইতিহাসে এত বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক কলঙ্ক আর দ্বিতীয়টি ছিল না।
রাঘ নেওগ ভেবেছিলেন তিনি জিতে গেছেন। তবে তিনি বুঝতে পারেননি, এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে তিনি নিজের শোয়ার ঘরে নিয়ে এসেছেন!
মণিপুরের পাহাড়ে বড় হওয়া রাজকন্যা জানতেন, নিশ্ছিদ্র পাহারার মধ্যে সরাসরি আক্রমণ করাটা নিছক বোকামি হবে। তাই শুরু হয় নিখুঁত এক মনস্তাত্ত্বিক মরণখেলা। কুরঙ্গনয়নী এমন ভান করতে থাকেন, যেন তিনি এই নতুন জীবনে অত্যন্ত সুখী। তাঁর আদরে, সেবায় ও আনুগত্যের অভিনয়ে পুরোপুরি গলে যায় রাঘ। তাঁর মনে রানিকে নিয়ে আর কোনও সন্দেহই থাকল না।
এদিকে কড়া পাহারার মধ্যেই রানি অত্যন্ত সন্তর্পণে রামনাথ গোহাঁই নামে এক অহোম অনুগতের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ স্থাপন করেন। ঠিক হয়, ১৭৭০ সালের এপ্রিল মাসে মোয়ামরিয়ারা যখন উৎসব ও বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা থাকবে, ঠিক তখনই মোক্ষম আঘাত হানা হবে।
ঘনিয়ে এল সেই ভয়াল রাত। রাঘ নেওগ তখন কুরঙ্গনয়নীর সঙ্গে নিজের শোয়ার ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাসাদের বাইরে হঠাৎ আক্রমণ শানাল অহোম রাজ পরিবারে অনুগতরা। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসা কোলাহলে ধড়মড় করে উঠে বসে রাঘ।
কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই তাঁর পিছন থেকে কালান্তক রূপে ঝাঁপিয়ে পড়েন রানি কুরঙ্গনয়নী। রানির হাতে তখন দেওয়াল থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অহোমদের ঐতিহ্যবাহী ধারালো তরোয়াল 'হ্যাংডান'। সর্বশক্তি দিয়ে রাঘের উপর কোপ মারেন তিনি। প্রথম আঘাতেই মারাত্মক জখম হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে রাঘ নেওগ। এরপর বাইরে থেকে অহোম অনুগতরা ঘরে ঢুকে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে।
কুরঙ্গনয়নীর তরোয়ালের ওই একটি কোপ অসমের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। রাঘ নেওগের মৃত্যুর খবর ছড়াতেই মোয়ামরিয়াদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে রাজা লক্ষ্মী সিংহকে পুনরায় সিংহাসনে বসানো হয়।
ক্ষমতা ফিরে পেয়ে লক্ষ্মী সিংহ যে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের বিচারে অন্যতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ছিল। হাজার হাজার মোয়ামরিয়া বিদ্রোহীকে জ্যান্ত শূলে চড়িয়ে, হাতির পায়ের তলায় ফেলে অসমের মাটি রক্তে লাল করে দিয়েছিল অহোম প্রশাসন। তবে এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের মাঝেও অহোম সাম্রাজ্যের পুনরুত্থানের প্রধান কারিগরকে প্রাপ্য সম্মান দিতে ভোলেননি রাজা লক্ষ্মী সিংহ। যে রাজবংশ একসময় চরম অপমানে মুখ ঢেকেছিল, স্রেফ এক ভিনদেশী রাজকন্যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অসমসাহসিকতায় তারা তাদের হৃত মর্যাদা ফিরে পায়।
অসমের ইতিহাসে বীরাঙ্গনা কুরঙ্গনয়নী তাই আজও এক কিংবদন্তি, যিনি একা হাতে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো গোটা এক সাম্রাজ্যকে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
