

মোবাইল স্ক্রিনের আলোই কি ঘুমের আসল শত্রু? ছবি - Google
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রাত বাড়লেই আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়া। কিন্তু অন্ধকার ঘরে মুখের সামনে জ্বলছে মোবাইলের পর্দা। কখনও খবর, কখনও সমাজমাধ্যম, কখনও ভিডিয়ো! ঘুম আসার অপেক্ষায় চলতেই থাকে স্ক্রল। এত দিন এই অভ্যাসের জন্য কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে মোবাইলের পর্দা থেকে বেরোনো নীল আলোকে। বলা হয়েছে, এই আলো মস্তিষ্ককে দিনের সময়ের মতো সজাগ রাখে, কমিয়ে দেয় ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ। ফলে দেরিতে ঘুম আসে, বিঘ্নিত হয় শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি।
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ছবিটা হয়তো এতটা সাদা-কালো নয়। নীল আলো অবশ্যই শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু ঘুম নষ্ট হওয়ার জন্য শুধু নীল রঙের আলোকে দায়ী করলেই পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। আলো কতটা উজ্জ্বল, কত ক্ষণ চোখে পড়ছে এবং সেই সময়ে মানুষ কী করছে, এই তিনটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের শরীরে ঘুম ও জাগরণের নিজস্ব একটি ঘড়ি রয়েছে- সার্কাডিয়ান রিদম। দিনের আলো শরীরকে সজাগ রাখে, আর রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘুমের প্রস্তুতি তৈরি করে। চোখের বিশেষ কিছু আলোকসংবেদী কোষ আলো শনাক্ত করে মস্তিষ্ককে সংকেত পাঠায়। তারই সঙ্গে জড়িত মেলাটোনিন নামের হরমোন, যা শরীরকে জানান দেয়, এ বার বিশ্রামের সময়।
এই জায়গাতেই নীল আলোর গুরুত্ব। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলো মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমাতে এবং শরীরের ঘড়িকে পিছিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাতের দিকে দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল আলোয় থাকার প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। প্রশ্ন হল, মোবাইলের পর্দা থেকে যে পরিমাণ নীল আলো চোখে পৌঁছয়, তা কি সত্যিই ঘুম নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট?
এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। আগের বেশ কিছু পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় আলোকিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করলে মেলাটোনিনের মাত্রা কমতে পারে এবং ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষের মোবাইল ব্যবহারের ধরন, স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা, ঘরের আলো এবং ব্যবহারকারীর বয়স- সব মিলিয়ে ফলাফল সব সময় এক রকম নয়। সাম্প্রতিক পর্যালোচনাগুলিও বলছে, নীল আলোর প্রভাব বাস্তব, কিন্তু শুধু সেটিকেই রাতের ঘুমের সব সমস্যার একমাত্র কারণ বলা ঠিক হবে না।
ঘুমের আগে কয়েক মিনিট শান্ত ভাবে কিছু পড়া আর উত্তেজক ভিডিয়ো দেখা, তর্কাতর্কির বার্তা পড়া কিংবা সমাজমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করা এক জিনিস নয়। ফোনের বিষয়বস্তু মস্তিষ্ককে উত্তেজিত বা চিন্তিত করে তুললে ঘুম আরও পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু চোখে পড়া আলো নয়, ফোনের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছনো তথ্যও।
সাম্প্রতিক গবেষণায় স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে দেরিতে ঘুমোতে যাওয়া এবং ঘুমের সময় কমে যাওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গিয়েছে। তবে এই ধরনের গবেষণায় সব সময় কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না অর্থাৎ মানুষ কম ঘুমোয় বলে বেশি ফোন ব্যবহার করে, নাকি বেশি ফোন ব্যবহারের কারণেই কম ঘুমোয়, তা সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
তা হলে কি নীল আলো আটকানোর চশমা কিনে ফেললেই সমস্যার সমাধান? বিশেষজ্ঞদের মতে, এতটা নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। নীল আলো আটকানোর চশমা নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু ঘুমের মান উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত করার ক্ষেত্রে ফল এখনও একেবারে একমুখী নয়। ২০২৫ সালের একটি গবেষণাতেও বলা হয়েছে, এই ধরনের চশমা নিয়ে পরীক্ষার ফল এখনও অসঙ্গত এবং আরও শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের সবচেয়ে বাস্তব অংশটি সম্ভবত খুব সহজ, আলো কমান। শোওয়ার সময় যত এগিয়ে আসবে, ঘরের আলো তত মৃদু করা ভাল। মোবাইল ব্যবহার করতেই হলে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দিন। চোখের একেবারে সামনে উজ্জ্বল পর্দা ধরে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকা এড়ান। সম্ভব হলে শোওয়ার আগে কিছুটা সময় ফোন থেকে দূরে থাকুন। অর্থাৎ এত দিনের প্রশ্ন, ‘ঘুমের আগে নীল আলো এড়াব কি না?’ তার উত্তর এখন আরও সূক্ষ্ম।
নীল আলো একেবারে নির্দোষ নয়। কিন্তু ঘুমের সব দোষ তার ঘাড়ে চাপানোও ঠিক নয়। রাতের উজ্জ্বল আলো, স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে এমন বিষয়বস্তু এবং অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস- সব মিলিয়েই তৈরি হতে পারে ঘুমের সমস্যা।
তাই রাতে মোবাইলের ‘ব্লু লাইট’ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে একটি সহজ নিয়ম হয়তো বেশি কার্যকর-ঘুম যত এগিয়ে আসবে, আলো তত কমবে, স্ক্রিন তত দূরে যাবে, আর মস্তিষ্ককে তত বেশি বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে। কারণ ঘুমের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু ‘আলো নীল কি না’ নয়, আলো কতটা উজ্জ্বল, কত ক্ষণ চোখে পড়ছে, আর সেই সময়ে আপনার মস্তিষ্ক কতটা জেগে রয়েছে- সেটাই আসল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
