৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বাংলায় ধর্মীয় উৎসবের রূপান্তর ও প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, নাকি রাজনীতির ধর্মীয়করণ- কোন পথে হাঁটছে বাংলা? ছবি - Google

বাংলায় ধর্মীয় উৎসবের রূপান্তর ও প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা

calender icon 2 ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

উৎসব ও প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা

স্বাধীনতার পর বাংলায় বামপন্থীদের শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখতে সফল হলেও, ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা দখল এবং কেন্দ্রে বিজেপির উত্থানের পর সেই চিত্রপট বদলেছে। রাম নবমী বা গণেশ পূজার মতো উত্তর-ভারতীয় আগ্রাসী উৎসব আমদানি, পেশিশক্তি ও উগ্র পৌরুষের মহড়া, এবং ক্লাবগুলোকে সরকারি-বেসরকারি বিপুল অনুদান দিয়ে অনুগত বাহিনী তৈরির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী মাতৃতান্ত্রিক ও সমন্বয়ী সংস্কৃতি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। ফলে সার্বজনীন সম্প্রীতি হারিয়ে ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে রাজ্যে দ্রুত তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ ও ফ্যাসিবাদের ছাঁচে তৈরি লুম্পেন সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে।

মূল বিষয়

বাংলায় একটি চিরন্তন প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে—'বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ'। এই প্রবাদের পেছনে লুকিয়ে ছিল বাঙালির উৎসবমুখর স্বভাব, ধর্মনিরপেক্ষ মিলনের ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য ইতিহাস। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মীপূজা কিংবা জগদ্ধাত্রী ও বিশ্বকর্মা পূজার মতো ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি ঈদুল ফিতর, মহররম কিংবা বড়দিনের মতো পরবগুলোতেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই ভূখণ্ডের চিরচেনা রূপ। উনিশ শতকের নবজাগরণ থেকে পুষ্ট হওয়া এই সমন্বয়ী সংস্কৃতির ঐতিহ্য দেশভাগের প্রবল ক্ষত সত্ত্বেও বাংলার মনন থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ২০১১ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজ্যের উৎসবের বিন্যাসে এবং এর পেছনের রাজনৈতিক সমীকরণে এমন কিছু গুণগত পরিবর্তন চোখে পড়ছে, যা এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

ঐতিহ্যের রূপান্তর ও 'বহিরাগত' সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ

দেশভাগের সময় চরম সাম্প্রদায়িক হিংসার সাক্ষী থেকেছিল এই রাজ্য। এরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ শরণার্থীর আগমন দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারত। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বামপন্থীদের নেতৃত্বে শ্রমিক ও কৃষককেন্দ্রিক শ্রেণি রাজনীতি এই ধারাকে প্রতিহত করে। জাতপাত কিংবা ধর্মের প্রশ্নকে পেছনে ঠেলে বামপন্থীরা শ্রেণিসংগ্রামকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ফলস্বরূপ, ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কাঠামোয় থেকেও রাজ্য রাজনীতি ও ধর্মাচরণের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদ বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছিল।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার পর থেকে চিত্রপট বদলাতে থাকে। বাঙালির পরিচিত পার্বণগুলির পাশাপাশি এমন কিছু ধর্মীয় আচারের বিস্তার চোখে পড়ে, যা ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে কখনোই মূলধারার জনসংস্কৃতি ছিল না। রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী কিংবা গণেশ চতুর্থীর মতো উৎসবগুলোর বাড়বাড়ন্ত আজ দৃশ্যমান। কলকাতা পুরসভার তথ্যানুযায়ী, কেবল কলকাতাতেই গণেশ পূজার সংখ্যা কয়েক  হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তলোয়ার, ত্রিশূল কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মিছিল, স্লোগান ও শক্তিমত্তার মহড়া বাংলার নিজস্ব দুর্গাপূজা বা কালীপূজার আবহের চেয়ে একেবারেই বিপরীত এক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করছে।

অনুদান রাজনীতি ও ক্লাব সংস্কৃতির দখলদারি

উৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নতুন আবহে অনুদান রাজনীতি এক বিতর্কিত মাত্রা যোগ করেছে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যের হাজার হাজার ক্লাবকে কয়েক লক্ষ টাকা করে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে রাজ্যের প্রায় ২৮ হাজারেরও বেশি দুর্গাপূজা কমিটিকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণ করদাতার অর্থের অপব্যবহার এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পাশাপাশি ইমাম-মোয়াজ্জিন ভাতা চালু করা এবং বিভিন্ন ধরণের নতুন মেলার আয়োজন রাজনীতির আঙিনায় নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

এই অনুদানকে ক্রীড়া বা সংস্কৃতির বিকাশের উপায় বলে দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলির সিংহভাগই কোনো স্বচ্ছ অডিট রিপোর্ট দাখিল করে না। অভিযোগ ওঠে, এই বিপুল অঙ্কের সরকারি অনুদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূল স্তরের যুবসমাজ ও ক্লাবগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভোটের রাজনীতিতে তাদের অনুগত বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা।

আরও পড়ুন
ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্রের জেরে বঙ্গে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ!
দশভুজার বাংলায় রাজনীতির টানাপোড়েন ও দুর্গাপুজোর শাশ্বত রূপ
বঙ্গের এক স্ক্যান্ডাল থেকে জন্ম সিংহলের?

একই সময়ে দক্ষিণপন্থী দল বিজেপিও পিছিয়ে নেই। বর্তমানে সদ্য তারা ক্ষমতায় এসেছে। নিজেদের প্রভাবাধীন এলাকায় তারাও ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দখল নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের হিড়িক লাগিয়েছে।  যদিও দুর্গাপূজা অনুদানে অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে তারা। আগের তৃণমূল সরকারের খুল্লামখুল্লা ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়ায় আপাতত লাগাম টানা হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ায় কোনো রাখঢাক রাখেনি তারা। যদিও বর্তমানে তৃণমূল ভেঙে দু'টুকরো কিন্তু অতীতে দুই দলই মুখে 'জনসংযোগ' বা 'উন্নয়নের রাজনীতি'র কথা বললেও, বাস্তবে মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে ভোটের অঙ্কে কাজে লাগাতে গিয়ে রাজ্যে দীর্ঘদিনের লালিত শ্রেণি রাজনীতি ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

পৌরুষের 'তেজ' বনাম মাতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সংঘাত

বাঙালির চিরাচরিত ধর্মীয় ভাবনায় মাতৃতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্য বরাবরের। দুর্গা, কালী কিংবা সরস্বতীর আরাধনায় যে শক্তি দৃশ্যমান, তা ধ্বংসাত্মক আগ্রাসনের চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টিশীল, মমতাময়ী (ব্যানার্জি নয়!) ও সার্বজনীন সামাজিক উৎসবের প্রতীক। কিন্তু সম্প্রতি আমদানি করা রাম, গণেশ বা হনুমান বন্দনায় প্রকাশ্য পেশিশক্তি ও আগ্রাসী পৌরুষের (masculine power) প্রদর্শন স্পষ্ট।

ঐতিহাসিকভাবে বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে গণেশ উৎসব ও শিবাজী উৎসবকে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার অস্ত্র হিসেবে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছিলেন। তবে আজকের উত্তর-ভারতীয় ধারার এই আগ্রাসী উৎসব আমদানি করার পেছনে কাজ করছে সমাজকে মেরুকৃত করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস। উগ্র স্লোগান, অস্ত্রের ঝনঝনানি ও শক্তিপ্রদর্শন আসলে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির 'পৌরুষোচিত' বীরত্বের ধারণার সঙ্গেই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমাজে এক ধরনের উগ্র বা 'লুম্পেন' সংস্কৃতি তৈরি হলে তবেই দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে, যা বাংলার চিরাচরিত মেলবন্ধনের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

মতাদর্শহীন জনমোহিনী রাজনীতি ও ধর্মীয় মেরুকরণ

২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব বাড়ে, তা থেকে পশ্চিমবঙ্গও মুক্ত থাকেনি। ২০১৯ সালের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপির প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বাঙালি ভোটারদের বড় অংশ রাজনৈতিক মতাদর্শের বদলে ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে ভোটদান করেছেন। বর্তমানে তো রাজ্যে তারা স্বয়ং ক্ষমতায়।

তৃণমূল কংগ্রেসের একটি সুস্পষ্ট বাম বা ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শগত কাঠামোর অভাব থাকায়, তারা দক্ষিণপন্থী আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে পাল্টা জনমোহিনী (populist) পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কখনো নরম হিন্দুত্বের সুর, কখনো মুসলিম তোষণের অভিযোগ—এই দুই বিপরীতমুখী কৌশল রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ে আরও বেশি বিভক্ত করেছে- বিশিষ্ট নৃতত্ববিদ অধ্যাপক সুমন নাথ যাকে "সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শাসকদল ও মূল বিরোধী দলের এই দ্বিমুখী টানাপোড়েনে তৃণমূল স্তরের প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও বিকল্প চিন্তাভাবনার রাজনীতি কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যে উগ্র যুবসমাজকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তারাই পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রের মিছিলে অংশ নিয়ে বা দাঙ্গার আবহ তৈরি করে ধর্মীয় হিংসার পথ প্রশস্ত করেছে।

বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণ একসময় ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ উদযাপনের আশ্রয় ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং মদত, অনুদানের রাজনীতি এবং ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে ধর্মের এই আগ্রাসী ব্যবহার সেই সংস্কৃতির শিকড়েই আঘাত হানছে। বহিরাগত উগ্র পেশিশক্তি ও ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে বাংলার উদার, প্রগতিশীল এবং বহুত্ববাদী চরিত্রকে রক্ষা করাই আজ রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য