৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বঙ্গভঙ্গ রদের দুঃখে অকালেই জীবন প্রদীপ নিভে যায় ঢাকার নবাবের?

ঢাকার নবাব ও মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠাতা খাজা সলিমুল্লাহ। ছবি - Google

বঙ্গভঙ্গ রদের দুঃখে অকালেই জীবন প্রদীপ নিভে যায় ঢাকার নবাবের?

calender icon 2 ১লা অক্টোবর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

বঙ্গভঙ্গ রদের আঘাতেই কি মর্মান্তিক মৃত্যু ঢাকার নবাবের?

বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগের বিরুদ্ধে যাওয়ার অপরিণামদর্শী রাজনীতির অভিঘাতকে ব্যক্তিগত পরাজয় হিসাবে নিয়েছিলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ। সেইসঙ্গে ব্রিটিশদের মদতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে গিয়ে জলের মতো অর্থ খরচ করে একসময় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মানসিক ও আর্থিক এই আঘাত আর সামলে উঠতে পারেননি আবেগপ্রবণ নবাব।

মূল বিষয়

দিনটা ছিল ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি। শীতের চাদরে মোড়া কলকাতার রাজপথ। হঠাৎই একটা খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। মারা গেছেন ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ। যদিও তখন তিনি নামেই নবাব ছিলেন। সবকিছু ক্রোক করে নিয়েছে ব্রিটিশরা। বয়স মাত্র ৪৩ বছর। ব্রিটিশ সরকারের সরকারি নথিতে নবাবের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হল হৃদরোগ।

কিন্তু কলকাতার অভিজাত মহল থেকে শুরু করে ঢাকার অলিগলি পর্যন্ত সব জায়গায় তখন অন্য গুঞ্জন। অনেকেই বলাবলি শুরু করলেন, নবাব স্বাভাবিকভাবে মারা যাননি। তিনি বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন!

কেন এমন জল্পনা?

ঢাকার নবাবের মৃত্যু নিয়ে এমন জল্পনার উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পিছনের দিকে হাঁটতে হবে। বুঝতে হবে একজন প্রবল প্রতাপশালী নবাবের চূড়ান্ত পতন ও মানসিক যন্ত্রণার ইতিহাস। ইংরেজদের কূটচালে মাত হয়ে গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে ভ্যালিডেশন দেওয়ার মূল কাণ্ডারী ছিলেন এই সলিমুল্লাহ। সেই সময় বাংলার বেশিরভাগ মানুষ বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটা বড় অংশ এই বিভাজনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন। কিন্তু ঢাকার নবাব হেঁটেছিলেন ঠিক উল্টো পথে। তিনি বৃহত্তর বাংলার আবেগের বিরুদ্ধে গিয়ে বঙ্গভঙ্গের দাবির পক্ষে নিজের সবকিছু বাজি ধরেছিলেন।

ভেবেছিলেন পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য একটি আলাদা প্রদেশ হলে তাদের সার্বিক উন্নতি হবে। তাঁর এই চিন্তায় হয়ত কোনও খাদ ছিল না। কিন্তু তিনি ব্রিটিশদের আসল কূটকৌশলটা একেবারেই বুঝতে পারেননি। ইংরেজরা আসলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে নিজেদের শাসন চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল। আর সেই রাজনৈতিক দাবা খেলায় নবাবকে তারা স্রেফ একটা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। নবাব ব্রিটিশদের কথায় অন্ধের মতো বিশ্বাস করে নিজের সামাজিক অবস্থান আর জনপ্রিয়তা দুটোই বিপন্ন করে তোলেন।

স্বপ্নের অপমৃত্যু এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতা

আরও পড়ুন
বাংলায় ধর্মীয় উৎসবের রূপান্তর ও প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা
দশভুজার বাংলায় রাজনীতির টানাপোড়েন ও দুর্গাপুজোর শাশ্বত রূপ
ধর্মীয় ব্যঙ্গচিত্রের জেরে বঙ্গে ১৮,০০০ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ!
বঙ্গের এক স্ক্যান্ডাল থেকে জন্ম সিংহলের?

ইংরেজরা ঢাকার নবাবকে বারবার কথা দিয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ কোনভাবেই রদ করা হবে না। এটা নাকি একটি মীমাংসিত বিষয়। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনের চাপে যখন ব্রিটিশ সরকার কোণঠাসা হতে শুরু করল, তখন তারা
ভোজবাজির মতো নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলেছিল। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে খোদ সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ করার কথা ঘোষণা করেন।

ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহের কাছে এই খবরটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ব্রিটিশদের তিনি সবচেয়ে কাছের বন্ধু ভাবতেন। অথচ এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা নবাবের সঙ্গে একবার আলোচনা করারও প্রয়োজন মনে করেনি। এই ঘটনার জেরে নবাবের আত্মসম্মান একেবারে ধুলোয় মিশে যায়। পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছেও তিনি চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন ঘোর আবেগী একজন মানুষ। ব্রিটিশদের এই চরম বেইমানি তাঁর মনকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।

দেউলিয়া দশা

নবাব সলিমুল্লাহর পতনের আরেকটা বড় কারণ ছিল তাঁর ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কট। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে তিনি জলের মতো টাকা খরচ করেছিলেন। ১৯০৬ সালে নিজের উদ্যোগে এবং বিপুল খরচে তৈরি করেছিলেন মুসলিম লিগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশাল অঙ্কের অনুদান থেকে শুরু করে নবাবী জৌলুস বজায় রাখতে গিয়ে তিনি ঋণের পাহাড়ে ডুবে যান।
একসময় অবস্থা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছায় যে ব্রিটিশ সরকার তাঁর জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। নবাবের বিশাল এস্টেট চলে যায় কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের অধীনে। এর মানে হল, নিজের সম্পত্তির উপর নবাবের আর কোনও অধিকার রইল না। ব্রিটিশরাই তাঁর এস্টেট চালাবে, বদলে মাসে মাসে তাঁকে একটা হাতখরচ বা ভাতা দেবে।

যাঁকে দেখে একসময় গোটা পূর্ববঙ্গ কুর্নিশ করত, সেই নবাবকে সামান্য হাতখরচের জন্য ইংরেজদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত। দিনরাত মহাজনদের তাগাদা আর ভিখারির মতো ভাতা পাওয়ার অপমান তাঁকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল।

১৯১৫-এর সেই রহস্যময় রাত

বঙ্গভঙ্গ রদের ঠিক চার বছর পর কলকাতায় নবাবের মৃত্যু হয়। ইতিহাসবিদদের মতে এই মৃত্যুর পেছনে কেবল শারীরিক অসুস্থতা ছিল না। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশা ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহকে গ্রাস করেছিল। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ভাতা নিয়ে এক ইংরেজ আধিকারিকের সঙ্গে তাঁর তীব্র বচসা হয়েছিল বলেও শোনা যায়।

এদিকে নবাবের মৃত্যু নিয়ে ব্রিটিশদের সরকারি নথিতে বিষপানের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু কিছুটা আশ্চর্যজনকভাবেই তাঁর মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে মৃতদেহ বিশেষ ট্রেনে কলকাতা থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কোনও ময়নাতদন্তের রিপোর্টও জনসমক্ষে আসেনি। আর এটাই মৃত্যু নিয়ে সন্দেহকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

ইতিহাসের পাতায় ঢাকার নবাবের সরাসরি বিষপানের অকাট্য প্রমাণ না মিললেও, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদই কার্যত তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ইংরেজরা তাঁকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলেছিল। সেই ধাক্কা তিনি সহ্য করতে পারেননি।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য